মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পে চাকরি চান স্থানীয়রা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক , জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৮:৪৫ এএম, ১৭ জানুয়ারি ২০২১

কক্সবাজারের মহেশখালীতে বাস্তবায়নাধীন ‘২x৬০০ মেগাওয়াট আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল-ফায়ার্ড পাওয়ার প্রোজেক্ট' প্রকল্পে স্থানীয়দের চাকরি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন মাতারবাড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দারা। তাদের দাবি, প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের সময় বলা হয়েছিল এখানে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কিন্তু পুরোদমে কাজ শুরু হলেও স্থানীয়দের কাজ দেয়া হচ্ছে না। বাইরে থেকে লোক এনে কাজ করানো হচ্ছে।

তারা বলছেন, প্রকল্পের মধ্যে যাদের জমি পড়েছে তারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। কিন্তু চাকরি দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়েছে।

ক্ষতির কারণ হিসেবে তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, প্রকল্পের মধ্যে যে জমি চলে গেছে, সেখানে আগে লবণ ও মাছ চাষ হতো। ফলে বছরে এই জমি থেকে মোটা অঙ্কের আয় হতো। কিন্তু জমির মালিকানা হারানোর কারণে এখন সেই আয় বন্ধ। আর ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে টাকা পেয়েছিলেন তাও খরচ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে।

আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, তারা ক্ষতিপূরণের টাকা সঠিকভাবে পাননি। তাদের যে টাকা দেয়ার কথা ছিল, প্রকৃতপক্ষে দেয়া হয়েছে তারচেয়ে কম। স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাদের টাকায় ভাগ বসিয়েছেন।

jagonews24

এদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয়দের চাকরি নয়, জীবিকা নির্বাহে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। অনেকে বিভিন্ন ট্রেনিংও নিয়েছেন। কিন্তু তারা তা কাজে লাগাতে পারেননি। এখনো ট্রেনিং নেয়ার সুযোগ আছে। স্থানীয়রা চাইলেই প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি প্রতিটি জমির মালিককে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও দেয়া হয়েছে।

মাতারবাড়ির মাইজপাড়ার বাসিন্দা মো. করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকল্পের মধ্যে আমাদের দুই কানি (৪৭ কাঠা) জমি ছিল। ক্ষতিপূরণ বাবদ কানিপ্রতি ২৭ লাখ টাকা করে ৫৪ লাখ টাকা পেয়েছি। ক্ষতিপূরণের এ টাকা দালালের মাধ্যমে তুলতে হয়েছে। কারণ আমাদের অফিসে ঢুকতে দেয়নি। টাকা তুলে দেয়ার জন্য দালালকে ১০ শতাংশ কমিশন দিতে হয়েছে।’

কমিশনের টাকা কারা নিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেসব দালাল টাকা নিয়েছেন তাদের অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালীরাও তাদের সঙ্গে আছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্পে আমাদের চাকরি দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমার পরিবারের কেউ চাকরি পাননি। আমার একটা ছেলেকেও যদি প্রকল্পে চাকরি দিত অনেক উপকার হতো।’

jagonews24

সাইরার ডেইলের বাসিন্দা ওসমান আলী বলেন, ‘বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে আমাদের কোনো লাভ হয়নি, আবার ক্ষতিও হয়নি। তবে প্রকল্পে আমার ছেলেদের কাজ দিলে উপকার হতো। প্রথমে শুনেছিলাম প্রকল্পের কাজে আমাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কিন্তু পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখিনি। অবশ্য প্রকল্পের মধ্যে যাদের জমি ছিল তারা অনেক টাকা পেয়েছেন।’

সাতঘর পাড়ার বাসিন্দা আয়ুব বলেন, ‘বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাইরের অনেক মানুষ কাজ করছেন। কিন্তু আমাদের কেউ কাজ পাচ্ছেন না। অথচ প্রকল্পের জমি নেয়ার সময় বলা হয়েছিল প্রকল্পের কাজের জন্য অর্ধেক লোক মাতারবাড়ি থেকে নেয়া হবে। কাজ না পেয়ে আমার তিন ছেলে বেকার ঘুরছেন। তাদের যদি প্রকল্পে কাজ হতো আমাদের কষ্ট লাঘব হতো।’

মাতারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ প্রকল্পে যারা কাজ করছেন তার ৯৫ শতাংশই বাইরের লোক। তবে আমাদের এমপি (সংসদ সদস্য) চেষ্টা করছেন, যতদূর সম্ভব অনুনয়-বিনয় করে কিছু লোক ঢুকিয়েছি। ইদানীং কোল পাওয়ার কর্তৃপক্ষ স্থানীয়দের চাকরি দেয়ার জন্য সিরিয়াস হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে যেসব বিদেশি আছেন তাদের সঙ্গে একজন করে বাংলাদেশি কর্মকর্তা আছেন। তারা সেখানে চাকরি করেন, সেই সঙ্গে তারা ব্যবসাও করেন। ম্যান পাওয়ার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ম্যাটেরিয়াল সাপ্লাই দেয়াসহ হরেক রকমের ব্যবসা করেন তারা। তাদের নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। আমাদের মাতারবাড়ির লোকজনকে তারা ‘বেয়াদব’ বলেন। বলেন, ‘এরা কাজ করে না’। যার ফলে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।’

‘মাতারবাড়ি আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল-ফায়ার্ড পাওয়ার প্রকল্পের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকল্পে চাকরি দেয়ার কথা না, আমরা তাদের ট্রেনিং দিয়ে দিয়েছি। যারা ট্রেনিং নিতে চান, তাদের জন্য এখনো ট্রেনিংয়ের দরজা খোলা। আমরা জমির দাম এবং এক বছরের হারানো ফসলের দাম দিয়েছি। এছাড়া প্রতিটি জমির মূল মালিককে দুই লাখ টাকা করে দিয়েছি।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘ধরুন এখানে পাঁচ হাজার লোক, আমরা সবাইকে চাকরি দেব কীভাবে? আবার ওই প্রকল্পে তো ১০ হাজার লোক লাগবে না, এটা অত্যাধুনিক প্রকল্প। এমনও আছে, একজন লোক কম্পিউটার দিয়ে একটি অংশ চালাবেন; সেক্ষেত্রে আমি এত লোক নিয়ে কী করবো? তাছাড়া দক্ষতার বিষয় আছে।’

আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, ‘দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আমরা ট্রেনিং দিচ্ছি। এর মধ্যে একটা ট্রেনিং খুব কাজে লাগছে, তা হলো সেলাই প্রশিক্ষণ। আর বাকি যারা আসেন, তারা তা খুব একটা কাজে লাগান না। ট্রেনিংয়ে আসেন, টাকা নিয়ে চলে যান। আমরা ১২০ জনকে কম্পিউটার ট্রেনিং দিয়েছিলাম। ট্রেনিং দেয়ার এক মাস পর তাদের আবার ডাকা হয় এবং কম্পিউটার খুলে এক পাতা লিখতে বলা হয়। কিন্তু তারা কম্পিউটার খুলতেই পারেন না।’

প্রকল্প সূত্র জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে মোট খরচ হচ্ছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তার মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ঋণ হিসেবে দিচ্ছে ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি তিন লাখ টাকা। বাকি সাত হাজার ৪৫ কোটি দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার ও সিপিজিসিবিএল। প্রকল্পটি ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) আওতায় বাস্তবায়নাধীন এই বিদ্যুতের প্রকল্পে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট এবং জুলাইয়ে দ্বিতীয় ইউনিট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ওয়ারেন্টি পিরিয়ড সমাপ্তির লক্ষ্য নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে।

এমএএস/পিডি/ইএআর/সায়ীদ আলমগীর/ইএ/এইচএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]