কারাগারে শিল্পপতিপুত্রের ব্যবসায়িক সভা করার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৪:৩৫ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২১

বহুল আলোচিত ভারতীয় নাগরিক জিবরান তায়েবি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি শিল্পপতিপুত্র ইয়াসিন রহমান টিটুর বিরুদ্ধে কারাগারের ভেতরেই কেডিএস গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কেওয়াই স্টিলের ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারণী সভা করার অভিযোগ উঠেছে। এই সভা চলাকালে প্রতিষ্ঠানের সাবেক ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে কারাগারের ভেতরেই মারধরের অভিযোগও তোলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এই সভা আয়োজন করা হলেও সেদিন ‘মারধরের শিকার’ কেডিএস গ্রুপের কেওয়াই স্টিলের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মুনির হোসেন খান প্রায় দুই বছর পর মঙ্গলবার (১৯ জানুয়ারি) সংবাদ সম্মেলন করে সেই ঘটনা জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের এস রহমান হলে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট এলাকায় একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে খুন হন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা টিএ খানের ছেলে জিবরান তায়েবি। সে সময় এ ঘটনায় মামলা করেন তার স্ত্রী তিতলী নন্দিনী। অভিযুক্ত করা হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেডিএস গ্রুপের মালিকের ছেলে পুত্র ইয়াসিন রহমান টিটুকে। ২০০২ সালের ১২ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামি ইয়াসিন রহমানকে বেকসুর খালাস দিয়ে অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে উচ্চ আদালত ২০০৭ সালের ২৮ মার্চ ইয়াসিনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা করেন। পরে ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাজ্য থেকে এসে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। আত্মসমর্পণের পর অসুস্থতার অজুহাতে ইয়াসিন এক বছর আড়াই মাস হাসপাতালে ছিলেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সেই সভায় অংশগ্রহণ ও মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে মুনির হোসেন খান বলেন, ‘২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল একটি গাড়িতে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। একটি ব্যবসায়িক সভায় আমরা ১১ জন কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলাম। তাদের অনেকেই এখনো কোম্পানিতে কর্মরত। বাট আমার ঘটনার পরে হয়তো তারা আর মুখ খুলবেন না, কিন্তু ওপরে আল্লাহ আছেন। ডিএমডি সাহেব (ইয়াসিন রহমান টিটু) সেখানে কিছু অন্যায় ব্যবহার করেছেন, খারাপ ব্যবহার করেছেন। আমার জানা নেই এমন সভা আইনসম্মত কিনা; তবে আমরা সভায় ছিলাম। যেটা হয়েছে সেটা আপনাদের বললাম, আইনি না বে-আইনি সেটা কর্তৃপক্ষ বুঝবেন। আমাদের যেতে বলেছেন, আমরা গিয়েছি। এই ঘটনার পরে তিনি নিজেই আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছেন, আমিও চাকরি করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।’

২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম কারাগারের জেল সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন বর্তমানে ময়মনসিংহ কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার হিসেবে দায়িত্বে থাকা ইকবাল কবীর। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ইকবাল কবীর এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘কারাগারে এ ধরনের কোনো মিটিং সম্পর্কে আমার জানা নেই, এ ধরনের মিটিং হয়-ই নাই।’

মুনির হোসেন খানের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর থেকেই নানা ধরনের হয়রানির মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন তিনি। সেসময় বিষয়টি কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের বড় ছেলে ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম রহমানকে অবহিত করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে অপমানবোধ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন তিনি। পরে ২০১৯ সালে তিনি ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। এরপর থেকেই তার নামে একের পর এক মামলা করা হয়।

jagonews24

ইয়াসিন রহমান টিটু

মুনির হোসেন খান বলেন, ‘আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা শেষে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব আমেরিকা ফ্লোরিডায় চাকরি করি। ২০০৭ সালে বাল্যবন্ধু কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমানের ডাকে দেশে এসে অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কেওয়াই স্টিল মিলের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগদান করি। ২০১৮ সালের জুনের কেডিএস গ্রুপ থেকে চাকরি ছাড়ার পর প্রায় দেড় বছর বেকার থেকে পরে অ্যাপোলো স্টিলের পরামর্শক হিসেবে যোগ দেই। এরপর থেকে আমার বিরুদ্ধে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় পাঁচটি এবং ঢাকার গুলশান থানা ও আদালতে গত বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ২৬টি মামলা হয়েছে।’

তার দাবি, সবক’টি মামলার এজাহার অভিন্ন। শুধু সময় ও অর্থের পরিমাণ ভিন্ন। মুনিরের বাবা, ছোট ভাই ও স্ত্রীর নামেও মামলা করা হয়েছে। মুনির এক বছর কারাগারে থেকে সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের ২৫ নভেম্বর প্রথমে চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানায় একটি গাড়ি চুরির মামলা করা হয়। মামলায় যে সময়টার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেসময় আল্লাহর রহমতে আমি ঢাকায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ছিলাম। ওই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ স্কুল থেকে সংগ্রহ করে আদালতে জমা দেয়া হয়। তবু এই মামলায় আমাকে গ্রেফতার করে তিন বার রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এরপর একে একে আরও ২৬টি মামলা করা হয়। একটি মামলা থেকে জামিন নেয়ার আগে আরেকটি মামলা হয়। আজ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে বায়েজিদ থানায় পাঁচটি, ঢাকার গুলশান থানায় একটি এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমানের কোর্টে ১৯টি মামলা করে কেডিএস গ্রুপ। গাড়ি চুরির মামলা ছাড়া বাকি সব মামলায় প্রায় একই রকমের অভিযোগ।’

মুনির হোসেন খান বলেন, ‘বিভিন্ন মামলায় প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ করার কথা বলা হয়েছে। এই ঘটনায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আমেরিকান দূতাবাস তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। মামলায় আমার বিরুদ্ধে ফ্যাক্টরির জন্য কাঁচামাল আমদানির সময় রফতানিকারক থেকে কমিশন নেয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাকে ওইসব কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে দেখিয়ে একটি কাল্পনিক চুক্তিও তারা আদালতে উপস্থাপন করছে। কিন্তু আপনারা খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন আমি ওইসব কোম্পানির কোনো এজেন্ট নই। তারা যে চুক্তিপত্র দেখাচ্ছে তা ভুয়া।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কেওয়াই স্টিলের আইনজীবী আহসানুল হক হেনা তাদের সাবেক কর্মকর্তা মুনির হোসেন খানের বিরুদ্ধে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেন।

এর আগে, ২৫ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে কারাগারে থাকা মুনির হোসেন খানকে ‘মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির’ অভিযোগ আনেন তার বাবা চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন খান।

আবু আজাদ/এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]