ভুয়া কোম্পানির নামে ঋণ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ পিকে হালদারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫৩ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২১

প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) ভুয়া নামে প্রতিষ্ঠান খুলে লোপাট করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টাকা। এসব অপকর্মে তিনি ব্যবহার করেছেন নিজের পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে এসব তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অর্থ আত্মসাৎ করতে পি কে হালদার তার ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রী এবং তার বান্ধবী অবন্তীকা বড়াল মিলে প্রথমে ‘সুখদা’ নামে একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন। পরে ‘সুখদা’র শেয়ার দিয়ে খোলেন ‘হাল’ ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি কোম্পানি। সুখদা’র পক্ষে হাল’র ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হন পি কে হালদারের বান্ধবী অবন্তীকা বড়াল। হাল ক্যাপিটালের ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানায় থাকে হাল ইন্টারন্যাশনাল। বাকি ১০ ভাগ রাখা হয় হাল ক্যাপিটালের দুই কর্মচারীর নামে। তারাই কোম্পানিটির নামে আগে থেকে বিদ্যমান মাইক্রোটেকনোলজি নামে একটি কোম্পানির শেয়ার কেনেন। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেড নামে আরেক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে ২০০ কোটি লোপাট করেন পি কে হালদার।

এছাড়া তিনি পি অ্যান্ড এল ইন্টারন্যাশনাল, পি অ্যান্ড এল ভেঞ্জার, হাল ট্রাভেল সার্ভিস, হাল টেকনোলজি, হাল এন্টারপ্রাইজ, আনান কেমিক্যাল, মুন ইন্টারন্যাশনাল, হাল ট্রিফ টেকনোলজি, হাল ইন্টারন্যাশনাল, উইন্টাল ইন্টারন্যাশনাল, সুখদা সার্ভিস, এসএ এন্টারপ্রাইজ, সন্দীপ ইন্টারন্যাশনাল নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে।

এসব ভুয়া কোম্পানির নামে মা লীলাবতী হালদারের হিসাবে ২০০ কোটি, ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহার নামের কোম্পানিগুলোতে ৫০০ কোটি টাকার বেশি জমা হয়। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে পি কে হালদার নিজেই ২ হাজার কোটি টাকা বের করে নেন। এসব কোম্পানির প্রায় প্রতিটিই ভুয়া বা নামসর্বস্ব ও কাগুজে।

পি কে হালদারের এক সহযোগী অনিন্দিতা মৃধা উইন্টেল ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির নামে দুই মেয়াদে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ভুয়া ঋণ দেখিয়ে ৬৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা গ্রহণ করলেও তা পরিশোধ করেননি। এছাড়া এফএএস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ কোটি টাকা ভুয়া ঋণ দেখিয়ে গ্রহণ করলেও তা পরিশোধ করেনি।

পি কে হালদারের আরেক সহযোগী তার মামাতো ভাই শংখ ব্যাপারীর প্রতিষ্ঠান মুন এন্টারপ্রাইজ। সেখানে আইএলএফএসএল নামের আরও একটি প্রতিষ্ঠান ঋণ মঞ্জুর করে ৮৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এই অর্থের ২১ কোটি ২৪ লাখ টাকা রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের মার্কো ট্রেডার্সের ঋণ পরিশোধ করা হয়। ২০১৬ সালে মার্কো ট্রেডার্স থেকে তিন কোটি টাকা পাচার হয় পি কে হালদারের অ্যাকাউন্টে।

পি কে হালদারের মালিকানাধীন হাল ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক ছিলেন স্বপন কুমার মিস্ত্রি। আইএলএফএসএল’র পরিচালকও ছিলেন স্বপন কুমার মিস্ত্রি। তার স্ত্রী ছিলেন এমটিবি মেরিনের চেয়ারম্যান। এই কোম্পানির নামে ৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ২০১৬ সালে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টাকা ট্রান্সফারের মাধ্যমে লোপাট করেন পি কে হালদার।

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, পি কে হালদারের সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। অনেক কোম্পানির কাগজপত্র জোগাড় করা হয়েছে, যা বের হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে অনেক কোম্পানি ভুয়া।

এসব বিষয়ে দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, পি কে হালদার ভুয়া ঋণ দেখিয়ে অবৈধভাবে অর্জিত প্রায় ২০০ কোটি টাকা তার মা লীলাবতি হালদারের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে রেখেছেন বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তার অবৈধ সম্পদ সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, পি কে হালদার বিদেশে পালানোর পর আইনজীবী সুকুমার ও তার মেয়ে অবৈধ সম্পদ দেখভাল করতেন। পি কে হালদারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশকিছু প্রতিষ্ঠান সুকুমার মৃধার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২১ জানুয়ারি) জিজ্ঞাসাবাদের পর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ায় পি কে হালদারের সহযোগী সুকুমার মৃধা ও তার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধাকে গ্রেফতার করে দুদক।

এর আগে আদালত পি কে হালদারের সহযোগী হিসেবে পরিচিত ২৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন উচ্চ আদালত। এ তালিকায় সুকুমার মৃধা ও তার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধাও রয়েছেন। পরে এ দুজনসহ ৬২ জনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে দুদক।

প্রশান্ত কুমার হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকা অবস্থায় বিভিন্ন ব্যক্তিকে ব্যবহার করে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই পাচার হয়েছে বিদেশে।

এসএম/এসজে/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]