করোনাকে পুঁজি করে অ্যাম্বুলেন্সে বাড়তি ভাড়া আদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:০৯ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০২১

সেবার নামে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স এবং লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ির চালকরা। রোগী ও মৃত ব্যক্তির স্বজনরা বাড়তি ভাড়া গুনে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। করোনাকে পুঁজি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের।

তবে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের দাবি, ঢাকার ভেতরে কিছুটা কম ভাড়া নেয়া হলেও বাইরে যেতে ফেরি ও ব্রিজ টোল থাকায় যাত্রীদের কাছে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে হচ্ছে। এসব বাড়তি ফি মওকুফ করে এ সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালা জারি করলে বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধ হবে।

দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে প্রাণঘাতী এ মহামারি প্রতিদিন শতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। মরদেহ দাফন করতে প্রতিদিন কবরস্থানের শ্রমিকদের ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। এরইমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বা মৃত ব্যক্তির স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ির অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি ভাড়া নিতে এসেছিলেন শহিদুল এক ব্যক্তি। করোনায় আক্রান্ত শ্বশুরকে এক সপ্তাহ আগে এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার সকালে তিনি মারা যান। দাফনের জন্য তাকে বরিশালে নিয়ে যেতে গাড়ি খোঁজা হচ্ছিল।

শহিদুল বলেন, আমার শ্বশুরের মরদেহ বরিশালে দাফন করা হবে। সেখানে নিতে ফ্রিজিং গাড়ির খোঁজ করছি, ১০ হাজার টাকা ভাড়া চাচ্ছে। অপেক্ষা চার্জ ঘণ্টায় ৫০০ টাকা দিতে হবে। অনেক চেষ্টা করেও কিছুটা কমাতে না পেরে বাধ্য হয়ে এ ভাড়ায় গাড়ি নিয়ে যেতে হবে।

অসুস্থ রহিমা বেগমকে রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা। কল্যাণপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এই অ্যাম্বুলেন্স চালক ভাড়া চান দুই হাজার টাকা। অনেক দর কষাকষির পর মাত্র ৫-৬ কিলোমিটার পথের ভাড়া ঠিক হয় এক হাজার ৬০০ টাকা।

অসুস্থ রোগীর এক স্বজন বলেন, ‘কল্যাণপুর থেকে ঢাকা মেডিকেলে এসেছি এক হাজার ৬০০ টাকায়। বেশি হলে কিছু করার নেই। আসতে-তো হবেই।’

কেউ কেউ নেন এর চেয়েও বেশি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও অক্সিজেন সুবিধা থাকার ওপর, অ্যাম্বুলেন্সের মান নির্ধারণ হলেও যেকোনো অ্যাম্বুলেন্স ১ কিলোমিটার পথের জন্যও আদায় করছে সর্বনিম্ন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। ঢাকার বাইরে গেলে এই ভাড়া হয়ে যায় লাগামহীন।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে রোজিনা বেগম নামে এক রোগীর স্বজন জানান, ‘এখানে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া অনেক বেশি। কোনো নিয়ম-নীতি নেই। যে যার ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করেন। যাত্রাবাড়ী থেকে শ্যামলী ঢাকা শিশু হাসপাতাল আসতে আড়াই হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দিতে হয়েছে।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি ভাড়া কাউন্টারের ইনচার্জ বিশ্বাস রাজু সোমবার জাগো নিউজকে জানান, বর্তমানে করোনাভাইরাসের কারণে অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ির চাহিদা অনেক বেশি। লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি নিয়ে এ হাসপাতাল থেকে ঢাকার মধ্যে যেকোনো জায়গায় ৩ হাজার টাকা, অতিরিক্ত সময় ব্যয়ে ঘণ্টায় ৫০০ টাকা, ঢাকার উপজেলাগুলোর মধ্যে ৫ থেকে ৬ হাজার আর জেলা পর্যায়ে ন্যুনতম ১০ হাজার টাকা ভাড়া নিয়ে থাকেন। তবে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া কিছুটা কম আদায় করা হয়ে থাকে।

jagonews24

বিভিন্ন হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালকরা বলেন, ‘আমাদের ভাড়ার কোনো চার্ট নেই। সেজন্য চুক্তিভিত্তিক ভাড়া আদায় করা হয়ে থাকে। ঢাকার মধ্যে রোগী অথবা লাশ নিতে এসি অ্যাম্বুলেন্স ১ থেকে ৩ হাজার টাকা, ননএসিতে ১ থেকে আড়াই হাজার টাকা নেয়া হয়। আর ঢাকার বাইরে দূরত্ব অনুযায়ী ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা নেয়া হয়ে থাকে।’

তারা জানান, করোনার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চালকদের রোগী ও লাশ বহন করতে হচ্ছে। লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ির ভাড়া অ্যাম্বুলেন্সের চাইতে কিছুটা বেশি নেয়া হয়ে থাকে। রাজধানীর মধ্যে নূন্যতম ২ থেকে ৩ হাজার, আর ঢাকা জেলার মধ্যে ৬ থেকে ৮ হাজার আর জেলা পর্যায়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়ে থাকে। এর বাহিরে অপেক্ষামানের জন্য ঘন্টায় ৫০০ টাকা নেয়া হয়ে থাকে।

জানতে চাইলে অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি সাধারণ সম্পাদক বাদল বলেন, ভাড়ার কোনো নীতিমালা না থাকায় কেউ কেউ ইচ্ছেমতো চলছেন। তবে, সরকার যদি আমাদের সঙ্গে বসে একটা চার্ট তৈরি করে দেয় তাহলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়া যেত না।

তিনি বলেন, লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকার বাহিরে যেতে ন্যূনতম ২ হাজার থেকে ২৩০০ টাকা ফেরি টোল পরিশোধ করতে হয়। যেসকল রাস্তায় ফেরি না থাকে সেখানে ব্রিজ টোল দিতে হয় হচ্ছে। চালকের বেতনসহ সবকিছু সমন্বয় করে গাড়ি ভাড়া আদায় করতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেও এখনো লাশবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স থেকে টোল মওকুফ করা হয়নি।

এছাড়াও, অ্যাম্বুলেন্সে বছরে ৩৫ হাজার টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। যাত্রীদের কাছে এ অর্থ আদায় করতে হচ্ছে বলে ভাড়ার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে একটি নীতিমালার মাধ্যমে ভাড়ার তালিকা তৈরি করে সব ধরনের টোল ও ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ করলে স্বল্প ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে দাবি করেন বাদল।

এমএইচএম/এসএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]