গ্যারেজে রিকশার স্তূপ, সংসার চালাতে গরু বন্ধক

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৮ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০২১

গ্যারেজে শ'খানেক রিকশা। কিন্তু কয়েক দিন ধরে রাস্তায় বের হয় মাত্র ২০-২৫টি। বাকিগুলো গ্যারেজেই পড়ে থাকছে। ভাড়া না পাওয়ায় চালকরা রিকশা নিয়ে বের হচ্ছেন না। অনেক চালকই খাবারের টাকাও জোগাড় করতে পারছেন না। সে কারণে বেশিরভাগ রিকশা চালকই গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন।

বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর বাড্ডার একটি রিকশা গ্যারেজের তত্ত্বাবধায়ক মো. আমিনুল। রিকশাচালকদের কেউ কেউ বলছেন, অভাবের তাড়নায় এখন গ্রামের বাড়িতে থাকা গরু বন্ধক রাখতে হচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সামনে হয়তো জমিও বন্ধক রাখতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে গ্যারেজটির দায়িত্বে থাকা এই ব্যক্তি বলেন, ‘চালকদের মতো গ্যারেজের কর্মী এবং মালিকরাও বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ সমস্যার মধ্যে আছেন। স্বাভাবিক সময়ে একটি রিকশার জন্য দুজন চালক থাকে। লকডাউনের আগেও প্রায় দুশ চালক ছিল আমাদের গ্যারেজে। এখন কাজ করছেন সাকুল্যে ২০-২৫ জন।’

তিনি আরও বলেন, ‘একশ রিকশার মধ্যে মাত্র ২০-২৫টা রিকশা চালকরা নিয়ে যায়। চালকরা রিকশা নিয়ে বের হয়, কিন্তু ঠিকমতো ভাড়া পায় না। আবার রাস্তায় নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। রিকশা উল্টে রেখে দেয়। হাওয়া ছেড়ে দেয়। তারপরও তারা পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বের হয়।’

jagonews24

আমিনুল বলেন, ‘ঠিকমতো ভাড়া না পাওয়ায় চালকরা জমাও কম দেয়। কেউ ২০-৩০ টাকা কম দেয়, আবার কেউ অর্ধেক টাকা জমা দেয়। প্রতিদিন যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে গ্যারেজের খরচই ওঠে না। আবার গ্যারেজে পড়ে থেকে রিকশাগুলোও নষ্ট হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা রিকশার পেছনে দিনে ৩০ থেকে ৫০ টাকা খরচ আছে। পানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতিদিন গ্যারেজের পেছনে ৫০০ টাকার মতো খরচ হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই খরচের টাকাও উঠছে না। মালিক গ্যারেজের পেছনে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন, তাই বন্ধ করেও দিতে পারছেন না। লোকসান টেনে যাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘এখন রিকশাচালকদের ইনকাম নেই। খাওন ঠিকমতো হয় না। এ জন্য সব দেশে চলে গেছে। লকডাউন উঠে তখন আবার তারা আসবেন। পুরোনোদের পাশাপাশি তখন নতুনরাও আসবে।’

শুধু বাড্ডার এই গ্যারেজটি না, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজধানীর প্রায় সব গ্যারেজেরই একই অবস্থা। মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করার পর থেকেই নগরীতে রিকশা চলাচল কমে গেছে।

jagonews24

বিভিন্ন গ্যারেজের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা শহরে প্রায় পাঁচ লাখের মতো রিকশা চলাচল করে। প্রতিটি রিকশার জন্য দুজন করে চালক। সে হিসাবে রিকশার ওপরই ঢাকা শহরের ১০ লাখ মতো মানুষের আয় নির্ভর করে।

চলমান বিধিনিষেধের কারণে ঢাকা শহরে চলাচল করা রিকশার সংখ্যা কমে ৪০-৫০ হাজারে নেমে এসেছে। এখন একটি রিকশার জন্য একজন করেই চালক রয়েছেন। সে হিসেবে ৯ লাখের ওপরে রিকশাচালক বেকার হয়ে গেছেন অথবা অন্য পেশায় গেছেন।

বাড্ডা থানার পাশেই বেশ পরিচিত একটি রিকশার গ্যারেজ ‘বশির মিয়ার গ্যারেজ’। এই গ্যারেজটিতে গিয়ে দেখা যায় লাইন ধরে একটার পর একটা রিকশা পড়ে রয়েছে। গ্যারেজের ভিতরে কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন রিকশার মিস্ত্রি শ্রী রাম।

jagonews24

তিনি বলেন, ‘আমি দৈনিক মজুরিতে এখানে কাজ করি। প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে পাই। বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু কম পাচ্ছি। এ টাকা দিয়েই কোনোরকমে চলছি। কেউ আমাদের জন্য সাহায্য নিয়ে আসে না। আমরাও সাহায্যের জন্য কোথাও যাই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে আমাদের একটা রিকশাও গ্যারেজে পড়ে থাকে না। বরং চালকরা রিকশার জন্য অনেক সময় গ্যারেজে এসে বসে থাকে। এখন প্রায় সব রিকশা পড়ে আছে, চালক নেই।’

‘রিকশা নিয়ে বের হলে চালকরা ভাড়া পায় না। অনেক সময় রাস্তার রিকশা আটকে রাখে। হাওয়া ছেড়ে দেয়। এমনকি মারধর করে বলেও চালকরা এসে অভিযোগ করেন। আয় না থাকায় চালকরা এখন রিকশা চালাচ্ছে না। এদের বেশিরভাগই গ্রামে চলে গেছেন। হয়তো লকডাউন উঠলে তারা আবার ফিরে আসবেন।’

এই গ্যারেজের পাশে আরও বেশ কয়েকটি রিকশার গ্যারেজ দেখা যায়। প্রতিটি গ্যারেজেই রিকশা পড়ে থাকতে দেখে গেছে। এর একটি গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায় তিনজন বিছানা পেতে শুয়ে আছেন। পাশেই স্তুপ করে রাখা রিকশার ভিতরে বসে ছিলেন এক যুবক।

উজ্জ্বল হোসেন নামে ওই যুবক বলেন, ‘আমি ৭-৮ বছর ধরে রিকশা চালাই। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। এই গ্যারেজেই থাকি। এখন আয় নেই। যাত্রী পাই না, খুব কষ্টে আছি। আমাদের কেউ সাহায্য করতে আসে না।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘এই গ্যারেজে ৫০-৬০টি রিকশা আছে। ড্রাইভার নেই। দিনে ৫-৭টি রিকশা গ্যারেজ থেকে বের হয়। স্বাভাবিক সময়ে একটি রিকশার জন্য দিনে জমা দিতে হয় এক'শ টাকা। এখন ৫০-৭০ টাকা জমা দেয়। কোনোরকমে এখন খেয়ে আমরা জনটা বাঁচাচ্ছি। একশো টাকা জমা দেব কীভাবে?’

তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকে। একটা টাকাও পাঠাতে পারছি না। তারা এখন চলবে কী করে? বাড়িতে গরু-বাছুর আছে, তাই বন্ধক দিয়ে কোনোরকমে চলছে। কী করব? কিছু তো করার নেই। এরপর জমি বন্ধক দিয়ে চলতে হবে।’

একই তথ্য জানান মধুবাগের একটি গ্যারেজের তত্ত্বাবধায়ক মো. আফসার।

তিনি বলেন, ‘শুধু আমার গ্যারেজ না এ অবস্থা সব গ্যারেজের। আমাদের হিসেবে ঢাকা শহরে পাঁচ লাখের ওপরে রিকশা আছে। একটা রিকশার জন্য দুই জন করে চালক। সে হিসেবে অনন্ত ১০ লাখ লোক ঢাকায় রিকশা চালায়। এদের মধ্যে এখন রিকশা চালাচ্ছেন ৩০ থেকে ৪০ হাজারের মতো। যারা রিকশা চালাচ্ছেন তারও ঠিকমতো ভাড়া পাচ্ছে না। ফলে জমার টাকাও কম দিচ্ছেন।’

গ্যারেজটির রিকশাচালক মো. লিটন বলেন, ‘পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হই। পুলিশ ধরে মাঝে মধ্যে রিকশা উল্টে রেখে দেয়, হাওয়া ছেড়ে দেয়। আজ (বৃহস্পতিবার) তো আমাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে। কিছু টাকা পেলে গ্রামের বাড়ি চলে যেতাম। এভাবে ঢাকায় থাকা যায় না।’

এমএএস/এসএস/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]