মৃত্যুকূপে বসবাস : দায় কার?

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৩:২১ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০২১

ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ আগুন, আগুন চিৎকারে ঘুম থেকে জেগে উঠি। চারিদিকে শুধু কালো ধোঁয়া আর আগুনের লেলিহান শিখা। প্রচণ্ড তাপে ফ্লোরে পা রাখতে পারছিলাম না। পরিবারের সবাইকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে ঘর থেকে ছুটোছুটি করে ছাদে উঠে যাই। ধোঁয়ায় বার বার শ্বাস আটকে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এখনই মারা যাব। এমন সময় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা মই দিয়ে ছাদ থেকে আমাদের নামিয়ে আনে। আরেকটু দেরি হলে পরিবারের ছয় সদস্যের সবাই মারা যেতাম।

বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) দিবাগত রাত সোয়া ৩টায় রাজধানীর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানসনের বহুতল ভবনের ছয় তলার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন এভাবেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের বর্ণনা দিচ্ছিলেন।

jagonews24

ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- ওই ভবনের নিরাপত্তারক্ষী ওলিউল্লাহ, দোকান কর্মচারী রাসেল মিয়া, ভবনের চারতলার বাসিন্দা শিক্ষার্থী সুমাইয়া এবং ওলিউল্লাহর কাছে বেড়াতে আসা কবীর নামে আরেক ব্যক্তি।

আহত অবস্থায় আরও ২১জনকে রাজধানীর শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে গুরুতর দগ্ধ চারজনকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে।

jagonews24

হাসপাতালটির সমন্বয়ক ডা. সামন্তলাল সেন বলেছেন, অন্যান্যরা বাহ্যিকভাবে ভালো মনে হলেও আগুনের ধোঁয়ায় সবারই শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২১জনের কেউই শঙ্কামুক্ত নন।

গতরাত সোয়া তিনটায় ৯/১১ আরমানিটোলা স্ট্রিটের ছয় তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুণ নিয়ন্ত্রণ আনতে সক্ষম হয়। কারণ অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এ ভবনের নিচতলা ও দোতলার কেমিক্যালের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত।

jagonews24

শুক্রবার সকালে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলা ও দোতলায় উচ্চ দাহ্য রাসায়নিক কেমিক্যালের কন্টেইনার আগুনে গলে পড়ে আছে। ভবনটির ছয়তলা পর্যন্ত কালো ধোঁয়ার ছাপ স্পষ্ট। ভবনের সামনের বারান্দার প্রতিটি গ্রিল কাটা। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে গ্রিলগুলো কেটে ভবনটির বাসিন্দাদের উদ্ধার করেন।

বাসিন্দারা বলছেন, তারা কেউ তিন বছর কেউ পাঁচ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন। কিন্তু তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি এ ভবনের নিচতলা ও দোতলায় এমন দাহ্য কেমিক্যালের দোকান ও গোডাউন রয়েছে।

jagonews24

ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগুন নেভানোর তারা এমন সব দাহ্য কেমিক্যাল পেয়েছেন যা সেখানে বিক্রি হওয়ার কথা নয়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের অনেক বহুতল ভবনেরই নিচতলা কিংবা দোতলায় কেমিক্যালের দোকান বা গোডাউন এবং ওপরে ফ্ল্যাটে মানুষ বসবাস করেন।

মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত বসবাস করলেও দুর্ঘটনার আগে কারও হুঁশ ফেরে না।

পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০১০ সালের জুনে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে রাসায়নিকের কারখানায় আগুন ধরে ১২৪ জন নিহত হয়েছিলেন।

jagonews24

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। রাত পৌনে ১১টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। জানা যায়, সেখানে কেমিক্যালের গোডাউন থাকায় আগুন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ অগ্নিকাণ্ডে ৭০ জন নিহত হন। আহত হন অনেকেই। এছাড়াও প্রায়ই কেমিক্যালের গোডাউনগুলোতে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে।

নিমতলীর ঘটনার পর থেকেই পুরান ঢাকার রাসায়নিক কেমিক্যাল গোডাউন ঢাকার আশেপাশে সরিয়ে নেয়ার কথা উঠলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

আরমানিটোলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চারজনের মৃত্যু ও ২১ জন হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে উচ্চ দাহ্যজাতীয় রাসায়নিক কেমিক্যাল থেকেই আগুনের সূত্রপাত।

jagonews24

তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের পরিচালক নুরুল আক্তারের দাবি, এ ভবনটিতে কোনো দাহ্য পদার্থ ছিল না। দাহ্য পদার্থ থাকলে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু তা ঘটেনি।

তিনি জানান, তারা সরকারের নির্দেশনা মেনে ব্যবসা করছেন। অথচ কোনো ঘটনা ঘটলেই তাদের দোষারোপ করা হয়। মিটফোর্ড ও আরমানিটোলা এলাকার ১২শ’ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে শিল্প পার্কে জায়গা চেয়ে আবেদন শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা রয়েছে। কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও তারা জায়গা বরাদ্দ পাননি।

আরেক ব্যবসায়ী জানান, কেমিক্যালের ব্যবসা এক সময় খুব সম্মানজনক ব্যবসা ছিল। কিন্তু এখন মানুষ এটা ভিন্ন চোখে দেখে। ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার আবেদন জমা দিলেও তাতে সরকার সাড়া দেয়নি।

এমইউ/এসএস/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]