বিআরটিএতে ‘তালাবন্দি’ সেবা, দালালদের খপ্পরে সেবাপ্রার্থীরা

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন মুরাদ হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:০৮ পিএম, ০৯ মে ২০২১

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মিরপুর অফিসের সামনে গেলেই ভাই কী করবেন বলে তিন-চারজন লোক কাছে আসেন। কেউ কেউ আবার সেবাপ্রত্যাশীদের হাতে থাকা কাগজ টেনে নিয়ে বলছেন, ‘দেন করে দেই, বেশি দিতে হবে না, পাঁচ মিনিটে কাজ হয়ে যাবে, খুশি হয়ে দিয়েন।’

চলমান বিধিনিষেধের কারণে সীমিত আকারে জরুরি সেবা কার্যক্রম চালু থাকলেও বিআরটিএতে প্রবেশের সব গেট বন্ধ রাখা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীরা বন্ধ গেটের সামনে ভিড় জমাচ্ছেন। সেখানে স্বাস্থ্যবিধির বালাই থাকছে না। এ সুযোগে দালালদের উৎপাত বেড়ে গেছে।

রোববার (৯ মে) মিরপুর-১৩ নম্বর বিআরটিএ অফিসে সরেজমিনে গিয়ে এসব ঘটনা চোখে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট মাধ্যমে জানা গেছে, লকডাউনের কারণে দীর্ঘদিন বিআরটিএর সব সেবা বন্ধ থাকার পর শনিবার (৮ মে) সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। সেখানে আজ থেকে সীমিত আকারে গ্রাহকসেবা নিশ্চিতের নির্দেশনা দেয়া হয়। মন্ত্রণালয় থেকে এমন নির্দেশনার পরও মূল প্রবেশ গেটে তালা ঝুলিয়ে সব কার্যক্রমকে স্থবির করে রাখতে দেখা গেছে।

দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা শত শত সেবাপ্রত্যাশী গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার দালালদের খপ্পরে পড়ে চুক্তিভিত্তিক জাল সিল-স্বাক্ষর লাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ আবার টাকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে গিয়ে কাজ করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

jagonews24.com

ব্যক্তিগত প্রাইভেটকারের মালিকানা পরিবর্তন করেন আবুল হাসান নামে এক ব্যক্তি। ফিঙ্গার প্রিন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেটি বাড়াতে বিআরটিএতে আসেন তিনি। এসে গেট বন্ধ দেখে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। সেবা পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার পর এক দালাল এসে কাজ করে দেয়ার নাম করে ৫০০ নিয়ে জাল সিল-স্বাক্ষর দিয়ে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে কেটে পড়েছেন।

এই ভুক্তভোগী জানান, ফিঙ্গার প্রিন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হতে পারছেন না, সার্জেন্ট ধরলে মামলা করে দেবেন। এ কারণে কয়েক দিন ধরে বিআরটিএর সামনে এসে গেট বন্ধ থাকায় চলে গেছেন।

তিনি বলেন, ‘আজ দীর্ঘ সময় গেটের সামনে দাঁড়ালে এক দালাল কাজ করিয়ে দেয়ার কথা জানায়। তাকে ৫০০ টাকা দিলে আমাকে নিয়ে একটি স্থানে দাঁড়িয়ে রেখে জাল সিল-স্বাক্ষর দিয়ে এনে আমার হাতে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে কেটে পড়ে।’

রাজিব নামে এক ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স ডেলিভারির জন্য ৮ মের মধ্যে সময় দেয়া হলেও বারবার এসে ফিরে যাচ্ছেন তিনি। এই সময় বাড়াবে নাকি লাইসেন্স দেবে তা জানতে এসে এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও কেউ সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। তার মতো এমন অনেককে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ভিড় করতে দেখা গেছে।

আশরাফুল, হৃদয় মাহবুব, আলতাফ হোসেনসহ অনেকের ভাড়ায়চালিত গাড়ির রোড পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। রাস্তায় বের হলে সার্জেন্ট মামলা দেবে ভয়ে সকাল থেকে বিআরটিএর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কাজ হবে না বলে গেটে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা জানিয়ে দিয়েছেন। তারপরও আশা নিয়ে অনিশ্চিতভাবে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে তাদের।

ভুক্তভোগীরা জানান, সীমিত আকারে সার্ভিস দেয়া হচ্ছে বলা হলেও জরুরিসেবা পাচ্ছেন না। তাদের মধ্যে অনেকের পিকআপ রয়েছে। সেগুলোতে জরুরি খাদ্যপণ্য আনা-নেয়া করেন। বর্তমানে রোড পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ায় গাড়ি রাস্তায় বের করতে পারছেন না।

আনোয়ার হোসেন নামে এক শিক্ষক তার মোটরসাইকেলের মেয়াদোত্তীর্ণ রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ বাড়াতে আসেন। নিজে সেবা নিতে না পেরে দালালকে ১০০ টাকা চুক্তিতে কাজ সেরেছেন।

bata3

তিনি বলেন, ‘দায়িত্বরত আনসার বলছেন বন্ধ অথচ দালালদের টাকা দিলেই সব কাজ হচ্ছে। একদিকে সব পরিবহন চালু করা হয়েছে। অথচ মেয়াদোত্তীর্ণ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মেয়াদ বাড়াতে এলে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।’

গেটে দায়িত্বরত আনসার সদস্য আশরাফুলের কাছে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় ১ হাজারের ওপর মানুষ বিভিন্ন সেবা নিতে আসছেন। তার মধ্যে রোড পারমিটের মেয়াদ বৃদ্ধি, মালিকানা পরিবর্তন, নতুন রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ট্যাক্স টোকেনের টাকা জমা দেয়াসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে আসছেন। বিআরটিএতে সব সার্ভিস বন্ধ থাকায় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গেট বন্ধ রাখা হচ্ছে। গেট বন্ধ থাকায় শত শত মানুষ এসে গেটের সামনে ভিড় করছে। এ কারণে গেটের বাইরে স্বাস্থ্যবিধির বালাই থাকছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেসব সেবা চালু রয়েছে তেমন ১০ জনের কাগজ নিয়ে জমা দেয়া হচ্ছে, কাজ হলে তা এনে ডেকে ডেকে দেয়া হচ্ছে। কাউকে গেটের ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।’

গেটের বাইরে ভিড় থাকায় দালালরা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে কাজ করিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে নানাভাবে প্রতারণা করছে, অনেকে তাদের খপ্পরে পড়ছেন বলেও জানান এই আনসার সদস্য।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর মিরপুর জোনের সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. শফিকুল আলম সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘লকডাউনের কারণে জরুরিসেবা হিসেবে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও নতুন রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস চালু রাখা হয়েছে। তার সঙ্গে পণ্য পরিবহনকারী পরিবহনের রোড পারমিট শেষ হলে তা বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্ত এলে সব সেবা চালু করা হবে।’

দালাল ধরলে সব কাজ হচ্ছে উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা পারবো না তা দালাল কীভাবে পারবে। তারা জাল-জালিয়াতি করে মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। আমাদের নজরে এলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

ফাইবার আইটির সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ায় ২০১৯ সালের জুলাই থেকে নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ রয়েছে উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি হয়েছে তারা পাইলটিং হিসেবে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও দিনাজপুর জেলার কিছু স্থানে এ কার্যক্রম শুরু করেছে।’

আগামী জুলাই-আগস্ট থেকে নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।

এমএইচএম/এমআরআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]