পুলিশের বিনামূল্যের দোকান থেকে ঈদসামগ্রী পেলেন সহস্রাধিক মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১২ এএম, ১৩ মে ২০২১

চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানার রঙ্গীপাড়া এলাকার একটি বস্তিতে বসবাস করেন নিলুফার আক্তার। বিয়ের সাড়ে চার বছর পর সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর থেকে তিন সন্তানের এই জননী সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে কাজ করেন মানুষের বাসায় বাসায়।

সরকারঘোষিত লকডাউনের আগে কাজ করতেন তিনটি বাসায়। লকডাউনে ছাত্ররা বাসা ছেড়ে দিলে দুটি ব্যাচেলর বাসায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি ফ্যামিলি বাসায় কাজ করে আড়াই হাজার টাকা পান। আর তাতে সংসার যেন চলেও চলছে না। স্বামী চলে যাওয়ার পর দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া এই নারীর সন্তানরা রোজা শুরুর কয়েকদিন পর থেকে বায়না ধরেছে নতুন কাপড়ের। মাত্র কয়েক বছরের অবুঝ এসব শিশুর বায়না কীভাবে পূরণ করবে- ভাবতেই মা নীরবে ফেলেছেন চোখের পানি। মনে মনে দোয়া করেছেন, কোনোভাবে যদি সন্তানদের কাপড়ের ব্যবস্থা করা যায়।

jagonews24

তিনদিন আগে এক পুলিশ কর্মকর্তা তার এলাকায় যান। খোঁজ-খবর নিয়ে তাকে একটি টোকেন দিয়ে জানান- বুধবার (১২ মে) আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল এলাকায় পুলিশ একটি বিনামূল্যে দোকান দেবে। সেখান থেকে কাপড় আর ঈদের সেমাই, ন্যুডলস সবকিছু বিনামূল্যে নেয়া যাবে। বিষয়টি যেন কোনোভাবেই বিশ্বাস হচ্ছিল না তার। তারপরও নির্ধারিত দিনে সকাল সকাল হাসপাতাল এলাকায় আসেন কাপড় কিনতে। কেনাকাটা শেষে বের হয়ে এই প্রতিবেদককে এসব বিষয়ে বলতেই চোখ ছলছল করছিল ওই নারীর।

নিলুফার আক্তার বলেন, ‘বাজি পুলিশ ফ্রি দোয়ান দিইয়ে। আর পোয়া-মায়া তিনজনল্লাই হঅর আর নুডুস সেমাই লইয়ি।’

jagonews24

শুধু নিলুফার আক্তার না। বুধবার ডবলমুরিং থানা পুলিশ ও লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং সিটির এমন মানবিক উদ্যোগে উপকৃত হয়েছেন হাজারেরও বেশি মানুষ। এখানে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত। যারা কারও কাছে হাত পাততে পারছেন না। এসেছেন মুক্তিযুদ্ধে পা-হারা আব্দুর রহিম। রণাঙ্গনের এই সৈনিক নিজের ও পরিবারের জন্য কাপড় নেয়ার পাশাপাশি নিয়েছেন সেমাই, ন্যুডলস ও চিনি।

আরও এসেছেন গতবছরে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিহারা কুতুবউদ্দিন। তার মেয়ে পড়েন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে। চাকরি হারানোর পর মেয়ের টিউশনিতে সংসার চলে। ঈদে কাউকে কোনো কিছু দিতে না পারা কুতুব পুলিশের দোকান থেকে ঈদসামগ্রী নিয়ে পরিবারের সবাইকে খুশি করেছেন।

jagonews24

পুলিশের এমন মহতী উদ্যোগে কাজ করা ডবলমুরিং থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অর্ণব জাগো নিউজকে বলেন, ‘তিনদিন আগে থেকে কর্মযজ্ঞ শুরু করেছি। মামলার তদন্তের মতো এলাকায় ঘুরে ঘুরে এক হাজারের মতো পরিবার বাছাই করেছি। বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত, যারা কারও কাছে কোনো কিছু চাইতে পারছেন না। তাদের দেয়ার চেষ্টা করেছি। যাচাই-বাছাই করে নিম্নবিত্তও অনেককে দিয়েছি। সবমিলিয়ে বুধবার হাজারের অধিক মানুষ থানা পুলিশের উদ্যোগে ঈদসামগ্রী পেয়েছেন।’

পুলিশের এই কর্মসূচি উদ্বোধন করতে এসে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার মো. আব্দুল ওয়ারিশ বলেন, ‘আমরা ঈদের আনন্দ বিলাতে চাই। ভাগাভাগি করে নিতে চাই সবার সঙ্গে। আর্থিক কারণ যাতে এই আনন্দে ভাটা না ফেলে, তাই আমাদের এই উদ্যোগ। সমাজের সবাই যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে এলেই ঈদের আসল তাৎপর্য ও অর্থবহ হবে।’

jagonews24

এ উদ্যোগের উদ্যোক্তা ও ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিনামূল্যের ঈদবাজারে মোট সাতটি কর্নার খোলা হয়েছে। করোনায় চট্টগ্রামে শহীদ হওয়া সাত পুলিশ সদস্যের স্মৃতিতে উনাদের নামে কর্নারগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিটি কর্নারেই পৃথকভাবে শাড়ি, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, বাচ্চাদের পোশাক, টি-শার্ট, টুপি, সেমাই, ন্যুডলস সাজানো হয়েছে। ক্রেতারা ইচ্ছেমতো বাজার করছেন। মনের মতো বাছাই করছেন। শেষে নিজেদের পছন্দের পোশাক ও ঈদসামগ্রী নিয়ে গেছেন বিনামূল্যে।’

মিজানুর রহমান/বিএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]