২৫ হাজার বিনিয়োগে কোটি টাকার অফার দিত ভুয়া বিজ্ঞানী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩২ পিএম, ১৬ জুন ২০২১ | আপডেট: ০৮:৪২ পিএম, ১৬ জুন ২০২১

জলবায়ু পরিবর্তন প্রজেক্ট, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন, পরিবেশবান্ধব যানবাহন, ডায়াবেটিস নিরাময় প্রতিষেধক, হৃদরোগ নিরাময় প্রতিষেধক প্রজেক্ট, করোনা নিরাময় কয়েল টেকনিক প্রজেক্টের বিনিয়োগে প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাইফুল ইসলাম ওরফে বিজ্ঞানী সাইফুল ওরফে সায়েন্টিস্ট সাইফুল।

এসব প্রজক্টের কথা বলে সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে কোটি টাকার অফার দিতেন প্রতারক সাইফুল। এ ছাড়া জমি প্রদানে প্রজেক্টের মালিকানা শেয়ার অফার দিতেন। অল্প শিক্ষিত ধনী ব্যবসায়ী ও সম্পত্তির মালিকদের তিনি টার্গেট করতেন।

এসব অভিযোগে গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত র‍্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা ও র‍্যাব-১ এর আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে টাঙ্গাইল ও রাজধানী ঢাকার উত্তরা এলাকার প্রতারক সংগঠন ‘রাজা-বাদশা’ গ্রুপের নতুন কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে ১৬ প্রতারককে গ্রেফতার করা হয়।

বুধবার (১৬ জুন) বিকেলে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব কথা বলেন।

গ্রেফতাররা হলেন- প্রতারক চক্রের মূলহোতা মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে বিজ্ঞানী সাইফুল ওরফে সায়েন্টিস্ট সাইফুল (৫৪) ও তার স্ত্রী মোছা. বকুলি ইয়াসমিন (৪৬), মো. ইমরান রাজা (২৫), মোছা. কাকুলী আক্তার (১৯), মো. রোমান বাদশা (১৮), মো. আনিসুজ্জামান সিদ্দীকী (৫৩), মো. নাজমুল হক (৩০), মো. তারেক আজিজ (৪০), মো. বেল্লাল হোসেন (৬১), মো. আব্দুল মান্নান (৫০), মো. শিমুল মিয়া (২৪), মো. নুরনবী (৪৫), মো. আবুল হাশেম (৪২), মো. আলী হোসেন (৩৮), মো. শওকত আলী (৫০) ও মো. রোকনুজ্জামান (৫০)।

jagonews24

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানীর ভুয়া পরিচয়ে নিজের উদ্ভাবিত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-প্রতিকার, পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রজেক্ট, করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকা ও জমি আত্মসাৎ করেছেন সাইফুল ইসলাম।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রতিকার বিশ্বব্যাপী একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই তথ্য পুঁজি করে চক্রটি ভুয়া বিজ্ঞানী পরিচয়ে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করে। ভুয়া বিজ্ঞানী পরিচয়ে জ্বালানীবিহীন জেনারেটর তৈরি ও পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন, জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর গবেষণা এবং প্রভাব প্রতিকার প্রজেক্ট, করোনাকে পুঁজি করে করোনা প্রতিরোধক কয়েল উদ্ভাবনসহ অন্যান্য অভিনব আবিষ্কারের ভুয়া প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে প্রতারণা করে। চক্রটি দেশি-বিদেশি সংস্থা ও নেতাদের সহায়তা ও ফান্ড প্রাপ্তির কথা বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করে।’

‘গ্রেফতার সাইফুল ইসলাম ‘রাজা-বাদশা গ্রুপ’ নামে একটি ভুয়া সংগঠন তৈরি করে ২০১১ সাল থেকে প্রতারণা শুরু করে। তিনি নিজেকে রাজা-বাদশা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলে পরিচয় দেন। এই চক্রের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভুয়া বিজ্ঞানী সাইফুলের স্ত্রী বকুলী ইয়াসমিন, ছেলে মো. ইমরান রাজা ও মো. রোমান বাদশা ও পুত্রবধূ মোছা. কাকুলী আক্তার ভুয়া সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।’

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘ভুয়া বিজ্ঞানী সাইফুলের সঙ্গে বিদেশি বিজ্ঞানী, গবেষক ও নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করতেন। যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে রাজি রয়েছেন বলে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করতেন। ভিকটিমদের বিশ্বাসযোগ্যাতা অর্জন করতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, তুরস্ক প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়ের এরদোয়ান ছাড়াও সৌদি আরবের তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সাইপ্রাস ও জাপানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করতেন। এ ছাড়াও ইরাকের এক আইনজীবি তার উদ্ভাবিত প্রজেক্টে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছেন। এভাবে তিনি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য উপস্থাপন করে প্রতারিত করতেন।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘প্রতারক সংগঠনের মূল কার্যলয় উত্তরায় অবস্থিত। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের বেপারীপাড়ায় একটি শাখা অফিস রয়েছে। তার অফিসের ১৫ জন সহযোগী কর্মরত। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে আরও ৩০ জনের অধিক নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছেন। মাঠ পর্যায়ে এজেন্টরা প্রাথমিক আলোচনা করে টার্গেট নির্ধারণ করতেন। এরপর গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাত। পরে সাইফুল ভিকটিমদের বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদে ফেলতেন।’

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রজেক্টের আওতায় নোয়াখালীতে প্রায় ৪৫০ বিঘা জমি ছাড়াও লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংয়ের ভালুকায় আরও সহস্রাধিক বিঘা জমি সাইফুলদের প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ কার্যক্রম চলমান। এ ছাড়া পাহাড়ি এলাকায়ও জমি জালিয়াতি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলেও তিনি জানান। কয়েক শতাধিক ভিকটিম তার দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

পুলিশের এলিট ফোর্সের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেফতার সাইফুল ইসলাম বিএসসি পাস। তিনি প্রথমে টিউশনি ও পরবর্তীতে পোল্ট্রি ফিড ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বিভিন্ন প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। তার নামে বিভিন্ন থানায় ৫টি প্রতারণার মামলা রয়েছে। তিনি নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভিকটিমদের প্রলুব্ধ করতেন।’

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘ভুয়া বিজ্ঞানী সাইফুলের বিদেশে বিভিন্ন আবিষ্কার ও গবেষণা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে বলে সাধারণ মানুষকে বলতেন। এ ছাড়া তার সঙ্গে বিদেশি বিজ্ঞানী, গবেষক ও নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করতেন। যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে রাজি।’

অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড গোলাবারুদ, দুই বোতল বিদেশি মদ, ছয়টি সিল, নগদ ৪৫ হাজার ৪৬০ টাকা, ২০টি মোবাইল ফোন, ১৪টি চেকবই, ১২টি ভিজিটিং কার্ড, ছয়টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চিঠি, বিভিন্ন মূল্যের ১২১টি জাল স্ট্যাম্প, তিনটি চুক্তিনামা দলিল, তিনটি বই ও ৯টি স্বাক্ষরিত চেক ও বিদেশি নেতাদের সঙ্গে পত্রালাপের ভুয়া কপি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

টিটি/ইএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]