নোয়াম চমস্কির সঙ্গে রিপনের লাইভ নিয়ে আলোচনার ঝড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:০৫ এএম, ২৪ জুন ২০২১ | আপডেট: ১০:৩০ এএম, ২৪ জুন ২০২১

চট্টগ্রামের তরুণ তানভীরুল মিরাজ রিপন। সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে। সাক্ষাৎকার নেন দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। ২০১৬ সালে কাজ শুরুর পর এ পর্যন্ত তিনি দুই শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

সর্বশেষ বুধবার (২৩ জুন) সকাল ১০টায় তার সঙ্গে লাইভে আসার কথা আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনক ও প্রখ্যাত দার্শনিক নোয়াম চমস্কির। এ নিয়ে খবরও প্রচার হয় দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সেই কথা মতো নোয়াম চমস্কি লাইভে আসেন নির্দিষ্ট সময়ে। কিন্তু ভুল করে বসেন রিপন। ৯২ বছর বয়সী চমস্কি লাইভে আসার দীর্ঘক্ষণ পর তিনি এতে যুক্ত হন। শেষমেশ মাত্র পাঁচ মিনিটে আয়োজনের সমাপ্তি টানতে হয়। তারপর থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনার ঝড়।

জানা গেছে, ই-মেইল চালাচালি করে আমেরিকান দার্শনিক নোয়াম চমস্কিকে বাংলাদেশের লাইভ প্রোগ্রামে অংশ নিতে রাজি করান রিপন। ‌‘টি কাপ’ নামে একটি ফেসবুক পেজে বুধবার সকাল ১০টায় চমস্কি লাইভে আসবেন বলে ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু নোয়াম চমস্কিকে তিনি সময় দিয়েছেন আরও এক ঘণ্টা আগেই। বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সময়ের পার্থক্য না বুঝে তিনি এ ভুল করে বসেন। যথাসময়ে বুধবার ৯টায় লাইভে চলে আসেন নোয়াম চমস্কি। অন্যদিকে রিপন থাকেন অনুপস্থিত। দীর্ঘক্ষণ পেরোলেও তিনি উপস্থিত না হওয়ায় নোয়াম চমস্কিই মেইল করেন তাকে।

অনেক সময় পেরোনোর পর অনেকটা অপ্রস্তুতভাবে লাইভে হাজির হন রিপন। লাইভে এসেই নিজের মতো ভূমিকা টেনে নোয়াম চমস্কির কোনো কথা না শুনেই একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় বসে থাকা চমস্কি আয়োজক রিপনকে শুরুতেই বলেন, আজকে তার সময় নেই, অন্যসময় প্রোগ্রামের শিডিউল করতে। কিন্তু সেদিকে কর্ণপাত না করে প্রশ্ন করতে থাকেন রিপন। প্রায় পাঁচ মিনিটের সাক্ষাৎকারে চমস্কি বেশ কয়েকবার তার অসুবিধার কথা জানিয়ে লাইভ শেষ করেন।

সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় রিপন মোট তিনটি প্রশ্ন করার সুযোগ পান চমস্কিকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দুটির প্রশ্নের পর রোহিঙ্গা শরণার্থীবিষয়ক অপর প্রশ্নটি করেন রিপন। প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় বারবারই বিনয়ের সঙ্গে সময়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন চমস্কি। আলাপচারিতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে তাকে বলতে শোনা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বেইজিংয়ে গোপন সফরের পরিকল্পনা করেছিলেন, যেটাকে নিজের বড় সাফল্য হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি পাকিস্তানের ওপর নির্ভর হয়ে পড়েন, সে কারণেই তাদের অপরাধকেও মেনে নেন এবং (সপ্তম) নৌবহর পাঠানো হয় (যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে)।

তবে তার মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এই আয়োজনে এমন অব্যস্থাপনার সমালোচনা করে কেউ কেউ বলছেন, কোনোরকম পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছাড়া রিপন অনেকটা আবেগের বশে এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন। চমস্কিকে ফেসবুক লাইভে এনে তিনি চমক দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাটি হিতের বিপরীত হয়েছে। আবার তার বাচনভঙ্গি ও লাইভ চলাকালীন (হোস্টের) রুমের পরিবেশ নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন আলোক ব্যবস্থাপনা নিয়েও। এ ঘটনায় দেশের মানসম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও দাবি একাধিক ফেসবুক ব্যবহারকারীর।

এ লাইভ নিয়ে মহিউদ্দিন মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে লেখেন, ‘এই কাণ্ডটা দেখে খুব মন খারাপ হয়েছে। বাঙালির সময়জ্ঞান যে এত কুৎসিতভাবে ফুটে উঠবে তা ভাবিনি। ছেলেটি, নোয়াম চমস্কির একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, সৌজন্যতা ও ভদ্রতা আমাদের জন্য নয়। চমস্কি হয়তো নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে ছেলেটিকে সময় দিয়েছিলেন। কিন্তু চমস্কি অনুষ্ঠানে সঠিক সময়ে হাজির হলেও বাঙালি হাজির হয়েছে দেরিতে!

‘এই বয়সের একটা মানুষ, এ রকম একটি ফালতু ছেলেকে (ছেলেটির প্রশ্নের ধরন শুনলেই আপনারা বুঝবেন, কেন আমি তাকে ফালতু বলছি) সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য সঠিক সময়ে উপস্থিত হয়ে অপেক্ষা করে আছেন। আর ছেলেটি ঘুমোচ্ছে, তা ভাবতেই আমার গা ঘিনঘিন করে উঠছে’—লেখেন মহিউদ্দিন।

‘অনুষ্ঠানের শুরুতেই চমস্কি বলেছেন যে আপনি দেরি করে ফেলেছেন, অনুষ্ঠানটি আরেকদিন করেন, কিন্তু ছেলেটি বারবার তাকে জবরদস্তি করতে লাগলো। বাঙালি সবসময় বাঙালির মতো চিন্তা করে। সে ভেবেছে, পরে যদি চমস্কি আর হাজির না হন! চমস্কি হয়তো রিশিডিউল করার কথা বলে আমাকে ফাঁকি দিতে চাইছে’—যোগ করেন তিনি।

হাসনাত এ কালাম নামের একজন ফেসবুকে লেখেন, ‘৫ মিনিট যাবত আজাইরা কিছু প্রশ্ন করসে, খাতা দেখে দেখে। তাও ভুলভাল ইংরেজিতে, ভালোমতো বাক্য গঠন না কইরাই। সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে—এই যে জোরপূর্বক ৫ মিনিটে যে কয়েকটা প্রশ্ন করসে- ওই সময় অনুষ্ঠানের স্ক্রলে লিখে রাখসে- ‘‘Sponsor by Mohur Fashion House’’. এই ফ্যাশন হাউস আবার ওই আয়োজক উপস্থাপকের দোস্তের অনলাইন শপ।’

অবশ্য অনেকে এই ঢালাও সমালোচনা মানতে নারাজ। তারা বলছেন, রিপন ভুল হয়তো করেছেন, তবে এভাবে আক্রমণের শিকার হওয়ার মতো অপরাধ করেননি।

সাংবাদিক পারমিতা হিম তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘...ডে লাইট সেভিং সম্পর্কে না জানা কোনো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ না। বন্ধুর কাপড়ের দোকান স্পনসর লেখা কোনো অপরাধই না। পুরা ঘটনাটা কৌতুককর বটে, তাও দুই সেকেন্ডের বেশি হাসবার মত না।
#ভুল মানুষের হতেই পারে। তার উপর সে একটা বাচ্চা ছেলে। আপনাদের এত অ্যাটেনশন পাবে সেটা সে বোধহয় ভাবে নাই। তাই জানেও না আপনাদের অ্যাটেনশন আসলে কত ভয়ংকর।
তার চেষ্টাকে আমার স্যালুট।
যে সমাজে ভুলের জায়গা নাই, সেটা ভয়ংকর সমাজ। সে সমাজের অংশ হইয়েন না। ভুলকে জায়গা দিতে শিখেন।’

পুরো বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তানভীরুল মিরাজ রিপন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করছি। তবে নোয়াম চমস্কি আমাকে ১০টার দিকে সময় দিয়েছিলেন। হয়তো আমার ভুল বা অন্য কোনো কারণে তিনি ৯টায় লাইভে চলে এসেছেন। আমি ৯টা ১৮ মিনিটে জয়েন করেছি। নোয়াম চমস্কির সঙ্গে ৫ মিনিট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আজকে উনার সময় ছিল না। তবে উনি আবারও লাইভে আসবেন। ঘটনার পর আমার সঙ্গে উনার কথা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রোগ্রামটি করছি এ জন্য আমাকে অনেকে হুমকি দিয়েছেন। তারপরও আমি প্রোগ্রাম করেছি। আমি ব্যর্থতা থেকে শিখছি। আমি মনে করি, আজকের (বুধবার) দাগ থেকে দারুণ কিছু হবে।’

মিজানুর রহমান/এইচএ/এমআরএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]