চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বদলে যাওয়ার গল্প

১৮ জানুয়ারি ২০২১। চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে প্রভাবশালী কোতোয়ালি থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে পদায়ন করা হয় মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিনকে। তিনি তখন বাকলিয়া থানার ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার আগে নিজেই জানতেন না ওসি হিসেবে তিনি কোতোয়ালি থানার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। অথচ এক সময় নগরের এসব থানাতে পদায়নের জন্য বিশেষ তদবিরের প্রয়োজন হতো বলেও শোনা যায়।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আল্লাহকে শপথ রেখে বলছি- প্রজ্ঞাপনের আগে জানতাম না, ওসি হিসেবে আমি কোতোয়ালি থানার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছি। আবার আমি নিজে জানি না, কখন আমাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমার কাজে অসন্তুষ্ট হলেই কমিশনার স্যার সরিয়ে দেবেন কিংবা আমার জায়গায় অন্য কাউকে ভালো মনে করলে তাকেই তিনি দায়িত্ব দেবেন।’

শুধু নেজাম উদ্দিন না চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) ১৬ থানায় যোগ্যতার ভিত্তিতেই ওসি পদায়ন করেছেন বর্তমান কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। অনেকটা নবীন-প্রবীণের মিশেলে তিনি থানাগুলোতে ওসি পদায়ন করে বিশেষভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন। প্রায়ই ওসি নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তার সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ওসির পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি একবারও। আবার কারও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাকে ছাড় দেয়া হয়নি এক চুলও। তার আমলে একেবারে আটজন যেমন নতুন ওসি হওয়ার স্বাদ পেয়েছেন। আবার রদবদলও হয়েছেন ১২ জন।

jagonews24

এছাড়া সিএমপির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফাঁড়ি ইনচার্জ নিয়োগে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। কমিশনার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ফাঁড়ি ইনচার্জ নিয়োগে পরীক্ষা চালু করেন। এজন্য তিনি একটি প্যানেল মনোনীত করেন। মনোনীত প্যানেল পরীক্ষার মাধ্যমে ইনচার্জ নিয়োগ করেন। আবার প্রতি ইনচার্জের মেয়াদও নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

বন্ধন অ্যাপ

সিএমপির ডিজিটালাইজেশনের মাইলফলক বন্ধন অ্যাপ। থানায় আগত সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি নিরসনে যুগান্তকারী এই পদক্ষেপ নেন সিএমপি কমিশনার। থানায় জিডি কিংবা মামলা করে এখন আর থানায় থানায় কিংবা তদন্ত কর্মকর্তার পেছনে ঘুরতে হয় না। মামলা এবং জিডির সর্বশেষ তথ্য এই অ্যাপেই চলে আসে। আর সিএমপি কমিশনার নিজেই এটি তদারকি করেন। কোনো মামলা বা জিডির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়।

পেট্রল কার সংযোজন

চট্টগ্রামেই সর্বপ্রথম যুক্ত হয়েছে সর্বাধুনিক পেট্রল কার। কোনো ঘটনা ঘটলেই শাঁ শাঁ সাইরেন বাজিয়ে ছুটে যায় এসব পেট্রল কার। বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি চালু করেছেন ‘হ্যান্ডস ফ্রি পুলিশিং’। আর সেই অপারেশনাল গিয়ার মাঠ পর্যায়ে সফল বাস্তবায়ন করেছেন সিএমপি কমিশনার। এছাড়া নিউইয়র্ক পুলিশের আদলেই অফিসারদের দেয়া হচ্ছে ‘বডি অন’ ক্যামেরা। উন্নত বিশ্বে যেভাবে পুলিশ কর্মকর্তাদের শরীরে ক্যামেরা সংযুক্ত থাকে, সিএমপিতেও শুরু হচ্ছে সে যুগ। এজন্য ইতোমধ্যে প্রতিটি থানায় ১০টি করে ক্যামেরা দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে কর্মকর্তাদের। শিগগিরই মাঠ পর্যায়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে বলে জানা গেছে।

jagonews24

সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম

পুরো চট্টগ্রাম শহরকে এখন নিয়ন্ত্রণ করা হবে এক কক্ষ থেকে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ৮০০টি স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ৪০০ ক্যামেরা স্থাপন শেষ হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে সেগুলো দিয়েই বর্তমানে নজরদারি করা হচ্ছে। বাকিগুলো স্থাপনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম উদ্বোধন করা হবে বলে জানা গেছে। এসব ক্যামেরা পুলিশের চোখ হয়েই নিরাপত্তায় সহায়তা দেবে চট্টগ্রামবাসীকে।

থানার ডিজিটালাইজেশন ও বিট পুলিশিং শক্তিশালীকরণ

সিএমপি কমিশনার থানার আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনে গুরুত্বারোপ করেছেন। ডিজিটালাইজেশন করতে প্রতিটি থানাতেই একটি করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি থানার কার্যক্রম তদারকি করতে থানার অভ্যন্তরেই স্থাপন করা হয়েছে আইপি ক্যামেরা। সিএমপি কমিশনার নিজ কার্যালয়ে বসেই থানার কার্যক্রম মনিটরিং করেন। এই মনিটরিংয়ের মাধ্যমেই দায়িত্ব অবহেলার জন্য বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছেন। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে অপরাধ নির্মূল করতে তিনি বিট পুলিশিংকে শক্তিশালী করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণ করেই বিট পুলিশিংয়ের প্রতি আলাদা নজর দিয়েছেন।

অত্যাধুনিক স্কুল

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন স্কুল সিএমপি স্কুল অ্যান্ড কলেজ। জরাজীর্ণ এই স্কুলে একসময় পুলিশ কর্মকর্তাদের স্বজনরাই পড়তেন না। কিন্তু এখন সেই স্কুলে রীতিমতো ভর্তিযুদ্ধ হয়। চট্টগ্রামের অন্যতম সেরা স্কুলের মর্যাদা পেয়েছে এই স্কুল। নতুন কমিশনার দায়িত্ব গ্রহণের পর এই স্কুলের আধুনিকায়নে চারটি অত্যাধুনিক নতুন ল্যাব, প্রায় ২০ হাজার বইয়ের আধুনিক পাঠাগার, ডিজিটাল লাইব্রেরিসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা হয়।

jagonews24

ভেঙে গেছে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট

দীর্ঘদিন ধরে নগর পুলিশে অঞ্চলভিত্তিক ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব বিরাজমান ছিল। কমিশনারের জিরো টলারেন্সে ভেঙে এ সিন্ডিকেট। গড়ে ওঠেছে একটি শক্তিশালী চেইন অব কমান্ড। যখনই যার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠেছে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন সঙ্গে সঙ্গেই। এছাড়া প্রত্যেককে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে।

সিএমপি বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন হাসপাতাল

করোনায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে হাসপাতাল চালু করেছে সিএমপি। সেন্ট্রাল অক্সিজেন, হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলাসহ করোনায় দেশে বিদ্যমান সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেয়া হয় এই হাসপাতালে। করোনা চিকিৎসায় লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও এই হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয় বিনামূল্যে। ওষুধও বিনামূল্যে। করোনায় দিশেহারা চট্টগ্রামবাসীকে আশার আলো দেখিয়েছে এই হাসপাতাল।

অক্সিজেন ব্যাংক

করোনায় সাধারণ মানুষের অক্সিজেন ঘাটতি মেটানোর জন্য সিএমপিতেই সর্বপ্রথম অক্সিজেন ব্যাংক করা হয়। যে কেউ ফোন করলে বিনামূল্যে পুলিশই বাসায় অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। সিএমপির ১৬ থানাতেই এই কার্যক্রম চলমান আছে।jagonews24

এছাড়া পুলিশ সদস্যদের জন্য নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা, সেন্ট্রাল মেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, করোনায় নিম্নবিত্ত ও মধবিত্তদের ঘরে ঘরে গিয়ে খাদ্য সহযোগিতা, টিকা নিবন্ধন সহযোগিতা, কুইক রেসপন্স শেড, পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠাসহ তার নানা উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে নগর পুলিশে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পুলিশ উত্তর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আবু বক্কর সিদ্দিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুধু ওসি না নগর পুলিশের প্রতিটি পদে কমিশনার স্যার স্বচ্ছতার সঙ্গে যোগ্যতার মাপকাঠিতে নিয়োগ দিচ্ছেন। সময় তার বড়ো স্বাক্ষী। পদায়ন করা ওসিসহ সবাই উনার উদ্যোগের যোগ্য প্রতিদান দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে প্রত্যেকটি থানা থেকে তার পজিটিভ ফলাফল আসতে শুরু করেছে। প্রমাণ নিতে চান, আপনি থানায় সাধারণ মানুষ হিসেবে যান। দেখবেন তাদের ব্যবহারে কিন্তু পরিবর্তন হয়েছে। আর যারা ভালো ব্যবহার করছেন না, তাদের বিষয়ে অভিযোগ পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘বন্ধন অ্যাপ স্যারের অন্যতম একটি উদ্যোগ। যার মাধ্যমে তিনি নগরের সব মামলা ও জিডির তদারকি করছেন।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ টিম আছে। আমি নিজে তাদেরকে দিয়ে মাঠপর্যায়ের সার্বিক বিষয় তদারকি করি। ওসি নিয়োগে তথ্যের ভিত্তিতে যোগ্য লোকদের পদায়নের চেষ্টা করি। কতটুকু সফল সেটা সেবাপ্রার্থীরা বিবেচনা করবেন। তবে যে কর্মকর্তা যে কাজের যোগ্য তাদেরকে সেখানে পদায়ন করা হচ্ছে। অনেক চৌকস কর্মকর্তা আগে থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তাদেরকে এখন ওসির চেয়ে আরও বড়ো কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নবীন কর্মকর্তাদের দিয়েও থানার দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মাঠ পুলিশ প্রশাসনে কাজের ভারসাম্য আনা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় কয়েকটি শিল্পগ্রুপের সহযোগিতায় প্রতিটি থানায় অক্সিজেন ব্যাংক গড়ে তোলা হয়েছে। যেখান থেকে বিনামূল্যে সাধারণ মানুষ অক্সিজেন পাচ্ছেন। গতকালও (মঙ্গলবার) রাতে বাকলিয়া এবং ডবলমুরিং থানা থেকে বিনামূল্যে অক্সিজেন পেয়েছেন। জনগণ পুলিশি সেবা পাওয়ার জন্য আমি সব উদ্যোগ নিয়েছি।’

মিজানুর রহমান/এমআআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]