পঙ্গুতে রোগী এলেই দালালরা ভাগিয়ে নিয়ে যায় প্রাইভেট ক্লিনিকে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩০ পিএম, ২৭ জুলাই ২০২১

বাড়িতে পা পিছলে পড়ে কোমরে আঘাত পান দাদি। তাকে নিয়ে সোমবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে আসেন নাতি জসিম।

হাসপাতালে এসেই দালালের খপ্পর পড়ে দাদিকে নিয়ে যান ক্রিসেন্ট হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি করতে না করতেই পকেট থেকে খসানো হয় ১২ হাজার টাকা। পরিচিত এক আনসার সদস্যের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারেন, তিনি দালালের খপ্পড়ে পড়ে ভুল জায়গায় গেছেন।

ঢাকার ধামরাইয়ের মধুডাঙ্গা থেকে আসা ভুক্তভোগী জসিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেও দালালদের খপ্পর থেকে দাদিকে নিয়ে পঙ্গুতে ভর্তি করাতে পারছিলাম না। পরে বাধ্য হয়ে র‌্যাবকে জানিয়েছিলম।’

মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) বিকেল থেকে র‌্যাব-২ এর সহযোগিতায় জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু। অভিযানকালে হাতেনাতে নয় দালালকে গ্রেফতার করা হয়।

rab-4.jpg

গ্রেফতাররা হলেন—মো. নাহিদুল ইসলাম (২৫), মো. সজিব (৩২), তমাল বাড়ৈ (২৪), মাসুদ রানা (৩৫), মো. হাসান (২৪), মো. শরিফ (২২), মো. রোমান (৩০), মানিক মিয়া (৩০) এবং মো. কামাল হোসেন (৪৫)। আদালত তাদের প্রত্যেককে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

দালালদের খপ্পরে পড়া সুলতান জানান, তার বড় ভাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন জেনে তিনি ওমান থেকে দেশে ফেরেন। চট্টগ্রামে নেমেই তিনি সরাসরি ঢাকায় আসেন।

অন্যদিকে, গাজীপুর থেকে নিয়ে আসা হয় তার আহত বড় ভাই জুয়েলকে। কিন্তু তিনি রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের পঙ্গু হাসপাতালে এসেই পড়েন দালালের খপ্পরে। হাসপাতালের আয়ারা তাকে জানান, এখানে ডাক্তার নেই। দালালদের দেখিয়ে বলেন- ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, কাজ হবে।

ভুক্তভোগী সুলতান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দালালরা পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করতে হলে ১০ হাজার টাকা লাগবে বলে জানায়। কিন্তু আমি সরাসরি ওমান থেকে আসায় কাছে টাকাও ছিল না। বাধ্য হয়ে পরিচিত এক স্টাফের শরনাপন্ন হই। তিনি এক ডাক্তারের সহযোগিতায় ভাইকে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করেন।’

rab-4.jpg

এমন সব সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) বিকেল থেকে পঙ্গু হাসপাতালে অভিযান শুরু করে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

অভিযান শেষে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, ‘র‌্যাব-২-এর গোয়েন্দা তথ্য ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পঙ্গু হাসপাতালে সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আমরা দালাল চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।’

পলাশ কুমার বসু বলেন, ‘এখানে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের নানাভাবে ভুল বোঝানো হয়। দালালচক্রের সদস্যরা জানায়- এখানে ভাল চিকিৎসা হবে না। সিট পাবেন না, সিট না পেলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হবে। এসব কথার ফাঁদে ফেলে সাধারণ রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে নামসর্বস্ব হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। যেখানে ভালো চিকিৎসাও হয় না। উল্টো মোট অঙ্কের টাকা খরচ হয়।’

কিছু দিন পর পর র‌্যাব অভিযান চালালেও দালাল চক্রকে নির্মূল করা যাচ্ছে না কেন- এমন প্রশ্নে পলাশ কুমার বসু বলেন, ‘অনেক দালালই গ্রেফতারের পর শাস্তিভোগ করে ফের একই কাজে জড়াচ্ছে। যদিও নিয়মিত র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করে আসছে।’

পলাশ বসু আরও বলেন, ‘চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। কেউ তাদের সেই অধিকার ক্ষুণ্ন করলে তা বরদাশত করার সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাকেই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’

rab-4.jpg

হাসপাতালের কারও সঙ্গে দালাল চক্রের যোগসাজশ র‌্যাব পেয়েছে কি-না জানতে চাইলে পলাশ বসু বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত হাসপাতালের কারো সংশ্লিষ্টতা পাইনি। তবে পঙ্গুর আশপাশের অনেক নামসর্বস্ব প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার প্রমাণ পেয়েছি। আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেসব নামসর্বস্ব হাসপাতালেও অভিযান পরিচালনা করব।’

‘হাসপাতালের কেউ দালাল চক্রে জড়ালে ছাড়া নয়’

এদিকে, পঙ্গু হাসপাতালের সহযোগী রেজিস্ট্রার ডা. মুহাম্মদ রাকিব হুসাইন বলেছেন, হাসপাতালে দালালদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত যতবারই অভিযান হয়েছে, তাতে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কাউকে পাওয়া যায়নি। দালালরা সবাই বহিরাগত। এদেরকে বারবারই ধরা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পঙ্গু দেশের সবচেয়ে বড় ট্রমা হাসপাতাল। আমরা এখানে রোগী নিয়ে যে পরিমাণ ব্যস্ত থাকি, তাই বাইরে কী হচ্ছে, তা দেখা সম্ভব হয় না।

ডা. মুহাম্মদ রাকিব হুসাইন বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচালনায় নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, এতে আমরা সাধুবাদ জানাই।

হাসপাতালের আয়া ও নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বাইরে থেকে দালালরা রোগীদেরকে বলছে চিকিৎসক নেই। কিন্তু হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখতে পারবেন চিকিৎসকরা সবাই রোগী নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। হাসপাতালের আয়া, বুয়া ও নার্সদের দালাল চক্রের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যদি হাসপাতালের কেউ জড়িত থাকে, তাহলে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না।

টিটি/এএএইচ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]