বাইরে গিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন মুরাদ হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:১৮ পিএম, ৩১ জুলাই ২০২১

বাসা-বাড়ি পরিষ্কার থাকলেও শিশুরা বাইরে খেলতে গিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করা অভিভাবকরা। সন্তানের এমন ব্যাধিতে পরিবারে মধ্যে নেমে এসেছে বিপর্যয়। জমানো সব অর্থ ব্যয় করে এখন অনেকে ধারদেনা করে সন্তানের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত হাসপাতালে বসে সেবা করছেন রোগীর স্বজনরা।

শনিবার (৩১ জুলাই) ঢাকা শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা হলে তারা এসব জানান।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকরা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। শুরুতে বিভিন্ন ওয়ার্ডের মধ্যে ডেঙ্গু রোগীদের রাখা হলেও বর্তমানে ২০ বেডের দুটি ডেঙ্গু ওয়ার্ড করা হয়েছে। সেখানে একটি বেডও ফাঁকা নেই। রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অন্য ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা হয়েছে।

রাজধানীর বনশ্রীতে বসবাস করা ইসমত আরা জানান, তার একমাত্র ছেলে আহমদ (৫) ২৭ জুলাই বাইরে খেলতে গিয়ে বাসায় ফেরার পর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর শরীরে জ্বর আসতে থাকে। শুরুতে কম আসলেও পরে তা ১০৫ ডিগ্রিতে ওঠে। প্রথমে নাপা ও সাপোজিটরি ব্যবহার করে কিছুটা জ্বর কমলেও আবারও তা বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু ধরা পরে। প্রতিনিয়ত রক্তের প্লাটিনেট কমতে থাকে। সেটি এক লাখে নামলেও হাসপাতালের রিপোর্টে ১০ হাজার দেখানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে তারা দিশেহারা হয়ে চারটি হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি না নেয়ায় শুক্রবার রাত ১২টায় ঢাকা শিশু হাসপাতালে এনে ভর্তি করান। বর্তমানে তাকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি রাখা হয়েছে।

jagonews24

এ শিশুর মা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা বনশ্রী আবাসিক একটি এলাকায় থাকি। পুরো বাড়ির ভেতর-বাইরে পরিষ্কার করে রাখা হয়। কোথাও ময়লা-আবর্জনা না থাকলেও বাইরে খেলতে গিয়ে সে আক্রান্ত হয়েছে বলে ধারণা করছি।’

এদিকে শিশু হাসপাতালে তাহামন নামে ডেঙ্গু আক্রান্ত আট বছরের আরেক শিশুর দেখা মেলে। তার বাসা কুড়িল বিশ্বরোডে। শিশুটির সঙ্গে নানি মনোয়ারা থাকছেন। ২৬ জুলাই এই শিশুর জ্বর আসে। তার সঙ্গে মাথা ব্যথা, বমি ও শরীর ব্যথা শুরু হয়। ২৮ জুলাই তাকে শিশু হাসপাতালে এনে পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে।

অপরদিকে পাঁচ বছরের কন্যাশিশু সামিয়ার ২২ জুলাই হালকা জ্বর আসে। দুইদিন পরে তা বেড়ে যায়। জ্বর বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করা হলে তার ডেঙ্গু ধরা পরে। এরপর তাকে মিরপুরের এম আর খান শিশু হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে দুইদিন ভর্তি থাকলেও এই শিশুর রক্তের প্লাটিনেট কমে ২০ হাজারে নামলে জরুরিভাবে তাকে রক্ত দেয়া হয়। এতে করে রক্তের প্লাটিনেট ৪০ হাজারে ওঠলে সেখানে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অন্য হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেয়া হয়। সেদিন দুপুরে তাকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করান তার মা আকলিমা।

আকলিমা বেগম বলেন, ‘আমার তিন মেয়ের মধ্যে সামিয়া ছোট। গত কয়েক বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ায় আমাকে বাড়ি ভাড়া ও সংসার চালাতে হচ্ছে। মেয়ে হঠাৎ করে অসুস্থ হওয়ায় আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমরা যেখানে থাকি সেখানে কোনো আর্বজনা না থাকলেও পাশের ফ্ল্যাটের দুইজন শিশু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে বলে শুনেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় গত কয়েকদিনে গচ্ছিত অর্থ শেষ হওয়ায় আত্মীয়র কাছে টাকা ধার করে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। মেয়ের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।’ আরও কত টাকা প্রয়োজন হবে তা জানেন না বলে জানান তিনি।

jagonews24

এর মধ্যে দেখা গেল ৯ বছরের শিশু জিসানকে। সে ১০ দিন হাসপাতালে ভর্তির পর সুস্থ হয়ে বাড়ি যাচ্ছে। মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া থাকে তারা। ভর্তির পর তাকে চারদিন আইসিইউতে রাখা হয়। এ পর্যন্ত তাদের লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে। অনেক দিনের জমানো সব অর্থ ব্যয় করে ছেলের চিকিৎসা চালিয়ে নিয়ে গেছেন বলে জানান জিসানের মা মোছা. মোরশেদা বেগম।

ঢাকা শিশু হাসপাতাল থেকে জানা গেছে, গত দুই মাস ধরে ব্যাপকভাবে শিশুরা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। স্বাস্থ্যবান ও বেশি ওজনের শিশুদের অবস্থা গুরুত্বর হচ্ছে।

দেখা গেছে, গত কয়েক মাসে এ হাসপাতালে ১১৮ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। তার মধ্যে গত এক সপ্তাহে ৪১ জন শিশু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। বর্তমানে ২৯ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। তার মধ্যে আইডিইউতে পাঁচজন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত চার শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. প্রবীর কুমার সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্কুলগামী শিশুরা ডেঙ্গু জ্বরে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ২০ সিটের আলাদা দুইটি ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে।’

এই চিকিৎসক পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘সকলকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। ঘরের ভেতরে ও বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ বা স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।’ কারো শরীরে ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত সময়ের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেন ডা. প্রবীর কুমার সরকার।

এমএইচএম/জেডএইচ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]