‘কমছে নদ-নদীর শরীর, বাড়ছে জাহাজ’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৩১ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

গত পাঁচ দশকে দেশে নৌপথের আয়তন কমেছে প্রায় ৩১ হাজার কিলোমিটার। প্রতিনিয়তই ভরাট-দখল হচ্ছে বিভিন্ন নদ-নদী। নদী সীমানায় অবৈধভাবে গড়ে উঠছে জনবসতি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে শীর্ণ হচ্ছে দেশের বহু নদ-নদীর শরীর। হারাচ্ছে নাব্যও। অথচ ক্ষীয়মান নদ-নদীতে প্রতিদিনই বাড়ছে নৌযানের সংখ্যা। বিপরীতমুখী এ বাস্তবতায় সরু নৌপথে অহরহ ঘটছে দুঘটনা। বর্তমানে সারাদেশে অর্ধলক্ষাধিক নৌযান চলাচল করলেও নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা মাত্র ১৪ হাজার। এর মধ্যে পাঁচ হাজারের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। অবস্থা উত্তরণে ও দেশের নৌপথ নিরাপদ করতে সঠিক ও পরিকল্পিতভাবে শিপ সার্ভে করার তাগিদ দিয়েছেন নৌখাত সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গ্রিন ক্লাব বাংলাদেশের (জিসিবি) এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

সমুদ্রগামী জাহাজের প্রায় ১০ হাজার নাবিকসহ অভ্যন্তরীণ নৌযানের শতভাগ শ্রমিককে অবিলম্বে করোনা টিকা দেওয়া, ত্রুটিপূর্ণ নৌযান যথাযথ ফিটনেস করা, সার্ভেয়ার সংকট নিরসন ও বার্ষিক সার্ভে প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে জিসিবি।

নৌযান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সবুজ শিকদার বলেন, শিপ ইয়ার্ডগুলো টার্মিনালের আশেপাশেই নির্মাণ করা হয়েছে। যে যেভাবে পারছে জাহাজ নির্মাণ করছে। দেশে নদী বাড়ে না, কিন্তু জাহাজ বাড়ছে। এ কারণে নদীতে দুর্ঘটনা বাড়ছে, বদনাম হচ্ছে দেশের। বালুবাহী, পাথরবাহী জাহাজ নদীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। সেগুলোর নির্মাণ বন্ধ করাই উচিৎ।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিবহন সংস্থার জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদল বলেন, আমরা ১০ বছর আগে নৌ শুমারি করার কথা বলেছি। নৌযানগুলোকে আইনের আওতায় আনা হোক। যতক্ষণ আইন থাকবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত ইঞ্জিন বানিয়ে এভাবেই যত্রতত্র নৌযান নদীতে নামিয়ে দেওয়া হবে। সার্ভে নাই, ফিটনেস নাই, রেজিস্ট্রেশন নাই- এ ধরনের জাহাজগুলোই বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এসব দুর্ঘটনা কমাতে সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, আজকে বিভিন্ন জায়গায় স্পিড বোটে সয়লাব। কিন্তু একটারও সার্ভে রেজিস্ট্রেশন নাই। কারও কাছেই নৌযানের সঠিক হিসাব নাই।

গ্রিন ক্লাব অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা অধিদপ্তরের হাতে রাখা হলেও সংস্থাটির প্রয়োজনীয় জনবল নেই।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনা রোধ ও সরকারকে রাজস্ব প্রদান নিশ্চিত করতে নৌযানের বার্ষিক সার্ভে (ফিটনেস) বাধ্যতামূলক। দেশে অর্ধলক্ষাধিক নৌযান চলাচল করলেও নিয়মিত বার্ষিক সার্ভে হয় মাত্র হাজার নয় নৌযানের। বাকি পাঁচ হাজারের মতো থেকে যায় ফিটনেসবিহীন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য মতে, শিপ সার্ভেয়ার বা জাহাজ জরিপকারীরা যথাযথভাবে ফিটনেস পরীক্ষা না করেই সনদ দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে সবসময়ই জনবল সংকটের দোহাই দেওয়া হয়ে থাকে।

জিসিবি সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, একজন সার্ভেয়ারকে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০টি নৌযান সার্ভে করার অনুমতি দিয়েছে অধিদপ্তর; যা কয়েক বছর আগে ছিল ৫টি। এছাড়া কোনো কোনো সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে দিনে ৫০ থেকে ৬০টি নৌযান সার্ভের অভিযাগে রয়েছে। কিন্তু একজন সার্ভেয়ারের পক্ষে দিনে ৫টি নৌযানও যথাযথভাবে সার্ভে করা সম্ভব না। জনবল সংকট নিরসনে নৌ অধিদপ্তরে শিপ সার্ভেয়ারের সংখ্যা চারজন থেকে বাড়িয়ে ২২ জন করেছে সরকার। তবে বর্তমানে সাতজন কর্মরত থাকলেও বাকি ১৫টি শূন্যপদে অদৃশ্য কারণে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, নৌযান সার্ভে ও নিবন্ধনে অনিয়ম-দুর্নীতিও নৌখাতের একটি বড় সমস্যা। এ ধরনের চাঞ্চল্যকর অনেক ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তা আমলে নেওয়া হয় না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দু-একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও আলোর মুখ দেখে না সেসব কমিটির রিপোর্ট।

সংগঠনের দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে- সমুদ্রগামী জাহাজের প্রায় ১০ হাজার নাবিকসহ অভ্যন্তরীণ নৌযানের শতভাগ শ্রমিককে অবিলম্বে করোনা টিকা দেওয়া, ত্রুটিপূর্ণ নৌযান যথাযথ ফিটনেস করা, সার্ভেয়ার সংকট নিরসন ও বার্ষিক সার্ভে প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, যেকোনো নৌ দুর্ঘটনা সুষ্ঠু তদন্তের জন্য অভিজ্ঞ নৌস্থপতি, নৌপ্রকৌশলী, পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ, মাস্টার মেরিনার, নৌ পরিবহনবিষয়ক গবেষক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী এবং নৌ মন্ত্রণালয়, নৌ অধিদপ্তর, নৌযানমালিক ও শ্রমিক সংগঠনের একজন করে প্রতিনিধির সমন্বয়ে জাতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা, প্রত্যেক দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নৌ মন্ত্রণালয় ও নৌ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ, নকশা জালিয়াতি বন্ধে দুই বছরে কতোগুলো নতুন জাহাজের নকশা অনুমোদন ‘কিল লেইং’-এর অনুমতি দেয়া হয়েছে, নামসহ সেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা, ত্রুটিপূর্ণ নৌযান চলাচল বন্ধে যথাযথভাবে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য শূন্যপদগুলোতে অবিলম্বে নিয়োগ দিয়ে নৌ অধিদপ্তরের শিপ সার্ভেয়ার সংকট নিরসন ও বার্ষিক সার্ভে প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর তারেক আলী বলেন, বিরাজমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করে জিসিবি যেসব সুপারিশ উত্থাপন করেছে, নৌখাতের উন্নয়নের জন্য সেগুলো বাস্তবসম্মত।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে হলে নদ-নদী রক্ষা ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন এ বিশেষজ্ঞ।

এসএম/এমকেআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]