বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে রোডম্যাপ তৈরির তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৩৩ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০২১

বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে হলে একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী।

মঙ্গলবার (১৯ অক্টোবর) বেলা ১২টায় জাতীয় সংসদের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক আইনি সীমাবদ্ধতা ও সুপারিশ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মতামত দেন।

তিনি বলেন, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে হলে একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। টেকসই সার্কুলার ইকোনমির (ফোর আর) দিকে গুরুত্বারোপ করতে হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে, সিটি করপোরেশনের বাজেটে যে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয় তা একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা হবে বলে তিনি মনে করেন।

সংবিধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনস্বাস্থ্য এক সুতোয় গাঁথা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রূপকল্প ২০৪১ অনুসারে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশই নগরীতে বাস করবে এবং এই ৮০ শতাংশ জনগণের ২৫ শতাংশই বাস করবে মেগা সিটি ঢাকায়। বর্তমানে ঢাকায় যে পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয় তার সিংহভাগই অসংগৃহীত থাকে যা পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই সমস্যাকে চিহ্নিত করে ও দূষণমুক্ত নগরীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে ইউএসএইড ও এফসিডিও এর আর্থিক সহযোগিতায় ও কাউন্টারপার্ট ইন্টারন্যাশনালের কারিগরি সহযোগিতায় ডিএসকে কনসোর্টিয়াম বাস্তবায়িত ঢাকা কলিং প্রকল্পের উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের (ডিএসকে) নির্বাহী পরিচালক ও কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওরের (কাপ) চেয়ারপারসন ডা. দিবালোক সিংহ।

ইউনিসেফের একটি পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা শহরের প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বসবাস। শহুরজুড়ে থাকা পাঁচ হাজারের বেশি বস্তিতে যারা কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতাবহির্ভূত থাকছে, যা বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশগত অধিকার সংরক্ষণের কথা নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবে।’

এই কঠিন বর্জ্যকে একটি আধুনিক ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে যথাযথ আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ঢাকা কলিং প্রকল্প কাজ করছে বলে জানান করেন ঢাকা কলিং প্রকল্পের কনসোর্টিয়াম কো-অর্ডিনেটর সানজিদা জাহান আশরাফী। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, পরিবেশ সংক্রান্ত সব আইনের জন্য একটি ছাতার ন্যায় কাজ করলেও এখানে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তেমন কিছু বলা নেই বলে জানান ইনসাইটস্’র উপদেষ্টা সুমন আহসানুল ইসলাম।

তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবস্থা নেবে বলে সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯-এ উল্লেখ থাকলেও তা কীভাবে করবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি। বিশেষ করে খসড়া কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ চূড়ান্তকরণ ও যথাযথ পরিবীক্ষণের বিধান কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালায় রাখতে হবে বলে তিনি তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বর্জ্য বাড়ছে। বর্জ্য কমিয়ে আনা ও একে সম্পদে রূপান্তরিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা জরুরি বলে মনে করেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান।

বস্তিবাসী সংগঠনগুলোর পক্ষে এনডিবিইউএসের সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা আক্তার বস্তিবাসীদের বর্জ্য অপসারণ সেবা অধিকার ও বস্তিতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিতকরণে নীতিমালা ও আইনে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনুরোধ ও ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরের কঠিন বর্জ্যজনিত দূষণ প্রতিরোধে বস্তিভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নেওয়া ও বস্তিবাসীদের সম্পৃক্ত করার সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার অনুরোধ জানান যাতে করে শহরের দরিদ্রদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয় গৃহীত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালায় গ্যাপ নিরসন, দ্রুত অনুমোদন ও সঠিক বাস্তবায়ন দরকার বলে মত প্রকাশ করেন দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। সুইডেনের মতো বিশ্বের অনেক দেশ বর্জ্য আমদানি করে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ বলে মনে করেন তিনি।

সুষ্ঠু পরিবেশ গঠন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কাজ করছে জানান কমিটির সদস্য রেজাউল করিম বাবলু। তিনি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বারোপ করে তৃণমূল পর্যায়ে এই সচেতনতা বৃদ্ধিতে এনজিওর কাজকে সমর্থন করে তৃণমূলের তথ্য তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এনজিওদের ধন্যবাদ জানান।

বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরকরণে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে বলে মত দেন কাউন্টারপার্ট ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি মইনুদ্দীন আহমদ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তিনি অনুকরণীয় মডেল তৈরিতে জোর দিয়ে বলেন, টেকসই একটি মডেল তৈরি করতে পারলে সেটা সব জায়গায় বাস্তবায়ন করা যাবে। ঢাকা কলিং প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত যেসব সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে তা বিবেচনায় নেওয়ারও অনুরোধ জানান তিনি।

jagonews24

কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট আইন না থাকলেও পরিবেশ সংরক্ষণে যেসব আইন বিদ্যমান তার যথাযথ প্রয়োগ কতটুকু হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার এবং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরকরণে এর বাণিজ্যিকীকরণ জরুরি বলে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মতপ্রকাশ করেন পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তানভীর শাকিল জয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী বিশ বছরে প্রায় তিন কোটি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে নগরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নেবে, যা নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও শোচনীয় করে তুলবে বলে সভাপতির বক্তব্যে মত দেন ডা. দিবালোক সিংহ।

তাছাড়া, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পর্কিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়টি সংসদে উত্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ, পরিবেশ আইন (কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা) ও বিধিগুলোর সংশোধনের উদ্যোগকে গতিশীল করা, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ (খসড়া) চূড়ান্ত করা ও তা অনুমোদন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বাজেট বাড়ানো ও নগর এলাকায় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও যত্নবান ও প্রণীত বিধি বাস্তবায়নে নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান।

আইএইচআর/এআরএ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]