শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা আদায় করতেন তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৫২ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২১

রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রিক ৮ থেকে ১০ জনের দাকাত দল সংঘবদ্ধ এক অপরাধী চক্রের সদস্য। চক্রটি রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা ও শ্যামলী এলাকায় বিভিন্ন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করে আসছিলো। কয়েক বছর ধরে এলাকার ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নির্মাণাধীন ভবন মালিকদের কাছে চাঁদা আদায় করে আসছিলো চক্রটি। চাঁদা না দিলে তারা ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে ভয়-ভীতি দেখান তারা। তারপরেও কেউ চাঁদা দিতে রাজি না হলে ভুক্তভোগীদের বাসা-বাড়ি অথবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ডাকাতি করতেন।

বেশ কয়েক মাস ধরে পলাতক এক সন্ত্রাসীর নামে ইডেন অটোস নামক প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি করে আসছিল চক্রটি। চাঁদা না দিলে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়। হুমকি ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিতে ডাকাতি করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১১ অক্টোবর তারা ঢাকা উদ্যান এলাকায় জড়ো হন। এ সময় জসিমের বাসায় জহির, জাহিদ, নয়ন, খায়রুল ও রাকিব একত্রিত হয়ে শ্যামলী ইডেন অটোস শো-রুমে ডাকাতি করার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর সন্ধ্যায় শ্যামলী এলাকায় অবস্থিত উত্তরা মোটরসের ডিলার ইডেন আটোস নামের শো-রুমে ডাকাত দল প্রবেশ করে ম্যানেজার ওয়াদুদ সজীব ও মোটর টেকনিশিয়ান নুরনবী হাসানকে ধারালো চাপাতি দিয়ে আঘাত করেন। এ সময় ডাকাত দলের কিছু সদস্য শো-রুমের দোতলায় উঠে গ্লাস, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও ক্যাশ ড্রয়ার ভাংচুর করেন এবং নগদ সাড়ে ৫ লাখ টাকা ও কম্পিউটার নিয়ে চলে যান।

ডাকাতির ঘটনার মূলহোতা জহিরুল ইসলাম ওরফে জহিরসহ ওই চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এ সময় লুট করা অর্থ ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত দেশীয় অস্ত্র ও অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়।

গ্রেফতাররা হলেন- জহিরুল ইসলাম ওরফে জহির (৩৩), জসিম উদ্দিন (৩৪), জাহিদুল ইসলাম শিকদার (২৬), খায়রুল ভূঁইয়া (২০), রাকিব হাসান (২০), ও মো. নয়ন (২৮)। অভিযানে ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত ৪টি চাপাতি, শো-রুম থেকে লুট হওয়া এক লাখ ৯৩ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও ডাকাতিকালে তাদের পরিহিত ২টি গেঞ্জি ও একটি লুঙ্গি জব্দ করা হয়।

রোববার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা আদায় করতেন তারা

তিনি বলেন, শ্যামলীর ইডেন অটোস ডাকাতির ঘটনায় শো-রুমের মালিক পক্ষ থেকে কে এম আবদুল খালেক শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ডাকাতির ঘটনাটি রাজধানীর অন্যতম প্রধান সড়ক ও জনবহুল এলাকায় হওয়ায় স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি ও ত্রাসের সৃষ্টি করে। এছাড়াও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে র‌্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার রাতে র‌্যাব সদরদপ্তর গোয়ন্দা শাখা ও র‌্যাব-২ ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও ধামরাই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ডাকাত চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করে।

খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতার ডাকাতরা মোহাম্মদপুর কেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্য। যার সদস্য সংখ্যা ৮ থেকে ১০ জন। তারা সকলেই এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন ও এই সূত্রে পরস্পরের পরিচিত। এই চক্রটি রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা ও শ্যামলী এলাকায় বিভিন্ন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ভাঙিয়ে কয়েক বছর ধরে এলাকার ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নির্মাণাধীন ভবন মালিকদের কাছে চাঁদাবাজি করে আসছে। গ্রেফতারদের নামে চুরি, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়াও তারা এলাকায় মাদক ও চোরাই অটোরিকশার ব্যবসা, চুরি ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গেও জড়িত।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন আরও বলেন, বেশ কয়েক মাস ধরে পলাতক তথাকথিত এক সন্ত্রাসীর নামে ইডেন অটোস নামক প্রতিষ্ঠানটিতে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন ডাকাতরা। চাঁদা দিতে না চাইলে বিভিন্ন হুমকি প্রদান করতে থাকেন তারা। এই চক্রের সদস্যরা হুমকি ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে চাঁদা আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিতে ডাকাতি করার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ১১ অক্টেবর ওই শো-রুম রেকি করেন তারা। গ্রেফতার জসিম ও জহির ঢাকা উদ্যান কাঁচাবাজার থেকে ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত চারটি চাপাতি ক্রয় করেন। পরদিন অর্থাৎ ১২ অক্টোবর পুনরায় ঢাকা উদ্যানে জড়ো হয়ে তাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী শো-রুমের সামনে আসেন ও শো-রুমের লোকজন ও আশে পাশের লোকজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, এরপর গ্রেফতার জাহিদ তার কাছে থাকা ব্যাগ থেকে ৩টি চাপাতি জহির, রাকিব ও খায়রুলের হাতে দেন ও নিজে একটি চাপাতি নিয়ে শো-রুমে প্রবেশ করেন। এ সময় গ্রেফতার জসিম শো-রুমের বাইরে অবস্থান করে ওয়াচম্যান হিসেবে কাজ করেন। গ্রেফতার জহির শো-রুমে প্রবেশ করেই ত্রাস সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে চাপাতি দিয়ে ম্যানেজার সবুজকে আঘাত করেন ও রাকিব চাপাতি দিয়ে শো-রুমের মোটর টেকনিশিয়ান হাসানকে আঘাত করেন। এই সময় দলের অন্য সদস্যরা শো-রুমে ভাঙচুর করেন। গ্রেফতার জাহিদ চাপাতি নিয়ে শো-রুমের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে কাঁচের দরজা ভেঙে ক্যাশিয়ারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ক্যাশ বাক্স থেকে নগদ টাকা লুট করেন।

গ্রেফতার খায়রুল শো-রুম থেকে একটি পুরাতন ডেস্কটপের মনিটর নিয়ে নেন। ৫-৬ মিনিটের মধ্যে ডাকাতি শেষ করে তারা বের হয়ে যান। শো-রুম থেকে বের হয়ে জহির ও জাহিদ লেকসিটিতে জাহিদের বাসায় টাকা নিয়ে যান। পরবর্তীতে স্ব-স্ব ভাগের টাকা নিয়ে ডাকাত দলের সবাই অত্মগোপনে চলে যান।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা আদায় করতেন তারা

গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, জহিরুল ইসলাম ওরফে জহির চক্রের মূলহোতা। তিনি জসিম ও অন্যান্যদের সহযোগিতা নিয়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও নির্মাণধীন ভবন থেকে টাকা দাবিসহ বিভিন্ন অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত। মোটরসাইকেল শো-রুমে ডাকাতির সময় তার নেতৃত্বে অন্যান্য সহযোগীসহ ডাকাতি সম্পন্ন করে। জহির আগে অটোরিকশা চালালেও বর্তমানে চোরাই অটোরিকশার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার নামে একটি ডাকাতি মামলা ও মোহাম্মদপুর থানায় একাধিক ছিনতাইয়ের মামলা ও অভিযোগ রয়েছে।

গ্রেফতার জসিম এই চক্রের সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মোটরসাইকেল শো-রুমে ডাকাতির প্রাক্কালে সবাইকে একত্রিত করা ও ডাকাতি চলাকালীন শো-রুমের বাইরে অবস্থান করে; তিনি ওয়াচম্যান হিসেবে দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ঢাকা উদ্যানে অবস্থিত একটি হাউজিংয়ে পিয়নের চাকরির অন্তরালে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত। তার বিরুদ্ধেও মোহাম্মদপুর থানায় একটি চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মামলা রয়েছে।

গ্রেফতার রাকিব হাসান এই চক্রের সমন্বয়কারী জসিমের নিকট আত্মীয়। ডাকাতিকালে মোটরসাইকেল টেকনিশিয়ান হাসানকে তিনি চাপাতি দিয়ে আঘাত করেন। দলের অন্যান্য সদস্যের ন্যায় তিনিও বিভিন্ন অবৈধ কাজে জড়িত। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় চুরি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে দুটি মামলা রয়েছে।

গ্রেফতার জাহিদুল শিকদার অস্থায়ী ভিত্তিতে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন। তিনি একজন নিয়মিত মাদকসেবী বলে জানান। ডাকাতির ঘটনার দিন তিনি ক্যাশ থেকে নগদ টাকা লুট করেন। ইতোপূর্বে তিনি একাধিকবার মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় ছিনতাই করার অপরাধে গ্রেফতার হন।

গ্রেফতার খাইরুল ভূঁইয়া একজন অনিয়মিত অটোরিকশা চালক। বিভিন্ন জায়গা থেকে অটোরিকশা চুরি করে তিনি এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকেন। এছাড়াও তিনি ডাকাতি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধে জড়িত বলে জানান। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় ডাকাতি ও মাদকের দুটি মামলা রয়েছে।

গ্রেফতার নয়নের কোনো নির্দিষ্ট পেশা নেই। তিনি মূলত দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, জমি দখলসহ একাধিক অপরাধ কাজে জড়িত।

গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

টিটি/কেএসআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]