দূষণ-যানজটের কবলে ঢাকা, সমাধানে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৫৪ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০২১

একদিকে তীব্র যানজট, অন্যদিকে পরিবেশ ও শব্দদূষণ। এই ভোগান্তি যেনো রাজধানীবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী। সারা বছর রাজধানীজুড়ে চলে খোঁড়াখুঁড়ি। সড়ক খুঁড়ে রেখে দেওয়া হয় মাসের পর মাস। এতে একদিনে যেমন সড়ক বন্ধের কারণে তৈরি হয় তীব্র যানজট, অন্যদিকে বাতাসের ধূলিকণায় বাড়ছে ভারী বায়ু।

একই সঙ্গে বিভিন্ন নালা ও ডোবার পানি চলাচল বন্ধ থাকা, যত্রতত্র ময়লা ফেলা ও তা পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর কারণে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ। পাশাপাশি অপ্রয়োজনে যানবাহনের হর্ন বাজানোর ফলে ঘটছে শব্দদূষণ। ফলে তীব্র যানজট ও দূষণে নাকাল রাজধানীবাসী। বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকা থেকেও নিকট ভবিষ্যতে বের হয়ে আসার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যানজট, পরিবেশ ও শব্দদূষণ এই তিন সূচকে সর্বোচ্চ খারাপ অবস্থান থেকে সরে আসতে পারেনি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিও’র তালিকায় যানজটে ২০১৯ সালে এক নম্বরে থাকলেও করোনাকালে রাজধানীতে যানবাহন তুলনামূলক কম চলায় ২০২১ সালে তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

পরিবেশ দূষণে শীর্ষে বাংলাদেশ, তৃতীয় ঢাকা

২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বাতাসের দেশ ও শহরের তালিকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে বাংলাদেশ ও রাজধানী ঢাকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে, পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসের তথ্যানুযায়ী- বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলোর মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর তালিকায় তিন নম্বরে ঢাকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে অনেকের অকাল মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ।

 jagonews24

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ সালে ঢাকায় বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫) মাত্রা ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে প্রায় ১৫ গুণ বেশি। গ্রিনপিসের বরাত দিয়ে তারা এ তথ্য জানায়।

যানজটে শীর্ষ দশে ঢাকা

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নামবিও’র প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেস্ক বলছে, ২০২১ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ যানজটের শহরগুলোর তালিকায় ২৫০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯। তাদের গবেষণার ট্রাফিক ইনডেস্কে সর্বোচ্চ পয়েন্ট ধরা হয় ৩০০। এর মধ্যে বাংলাদেশের পয়েন্ট ২৭৪.৮৭। এই তালিকায় ৩৪২ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে নাইজেরিয়ার লোগোস। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ৬৯.৪০ পয়েন্ট নিয়ে ২৫০ নম্বরে অর্থাৎ সবচেয়ে কম যানজটের শহর সুইজারল্যান্ডের বাসেল সিটি।

এর আগে ২০২০ সালে ২৬০ পয়েন্ট নিয়ে ঢাকার অবস্থান ছিল ১০। করোনার আগে ২০১৯ সালে ২৯৭ পয়েন্ট নিয়ে ঢাকা ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ যানজটের শহর। ২০১৭ সালে ৩১৭ পয়েন্ট নিয়ে ঢাকা ছিল দ্বিতীয়। ২০১৬ সালে ছিল তৃতীয়।

বিশ্বের বিভিন্ন শহরের নানা পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে অনলাইনে তা প্রকাশ করে নামবিও। এর মধ্যে রয়েছে- জীবনযাপনের খরচ, অপরাধের হার, স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান ও যানজটের অবস্থা। প্রতিষ্ঠানটি তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ফোর্বস, বিজনেস ইনসাইডার, টাইম, দ্য ইকোনমিস্ট, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস, চায়না ডেইলি, দ্য টেলিগ্রাফসহ বিশ্বের খ্যাতনামা সংবাদপত্রের তথ্য ব্যবহার করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক ও নগরবিদ প্রকৌশলী ইকবাল হাবিব জাগো নিউজকে বলেন, যানজট কিংবা শব্দদূষণ— সবই অনেকগুলো সমস্যার উপসর্গ মাত্র। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপে ঢাকার অবস্থান বাড়ে-কমে, কিন্তু এর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। এখন পর্যন্ত ঢাকার যানজটের মূল কারণ হিসেবে আমরা সবাই জানি, গণপরিবহন কম থাকা ও পথচারীবান্ধব সড়ক না থাকা। কিন্তু এই দুইটা বিষয় কার্যকর করতে আমরা কোনো পদক্ষেপ নেইনি।

jagonews24

তিনি বলেন, যানজট নিরসনে প্রয়োজন গণপরিবহন বাড়ানো আর ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ করা কিন্তু আমরা সেটা করিনি। গণপরিবহনের জন্য প্রায়োরিটি লেন, রুট ফ্রেঞ্চাইজ করার কথা, কিন্তু সেটাও আমরা করিনি। আমরা ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ নানা খাতে বড় বড় ব্যয় করেছি, যার প্রায় সবগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়িকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সবকিছুই স্থবির ছিল। ওই সময়ের উন্নতি দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সত্যিকার অর্থে এখন আবার গাড়ির গতি সেই আগের মতো চার থেকে পাঁচ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় অপরিকল্পিত কার্যক্রম চলছে। সত্যিকার অর্থে গণপরিবহনে শিফট করার কোনো ধরনের প্রচেষ্টা নেই।

পবার এই নগরবিদ আরও বলেন, আনিসুল হকের (সাবেক মেয়র) মৃত্যুর এক বছর আগে থেকে এখন পর্যন্ত এই চার-পাঁচ বছরে রুট প্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমাদের নতুন মেয়র অঙ্গীকার করেছেন কিন্তু এসব পরিকল্পনা কার্যকর করার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ- এসব করতে মাঠ পর্যায়ের কাজ- বাসস্টপ তৈরি, পথচারীবান্ধব সড়ক তৈরি, তার কোনোটারই কাজ হয়নি। তাহলে তো এসব কার্যকরী হবে না। শুধু শুধু প্রতিশ্রুতি দেওয়া।

শব্দ দূষণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ঢাকাবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম কারণ শব্দ দূষণ। অতিরিক্ত শব্দ দূষণে রাজধানীবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন খোদ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তমনন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। তিনি গত ২৮ এপ্রিল আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস-২০২১ উপলক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক অনুষ্ঠানে বলেন, ঢাকা শহর সহনীয় মাত্রার চেয়ে তিনগুণ তীব্র শব্দ দূষণে আক্রান্ত। যার ফলে অর্ধ-কোটি মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। নির্মাণকাজে সৃষ্ট শব্দ, সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে মাইকের ব্যবহারসহ ট্রাফিক আইন না মেনে চালকদের অতিরিক্ত হর্ন বাজানোকে দায়ী করেন তিনি।

jagonews24

বেসরকারি সংস্থা ‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট’ ঢাকা শহরের ১০টি জায়গায় শব্দ দূষণের মাত্রা পরিমাপ করেছে। তাদের জরিপে দেখা যায়, উত্তরার শাহজালাল অ্যাভিনিউতে শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫ ডেসিবেল, মিরপুর-১-এ সর্বোচ্চ ৯৬ ডেসিবেল, পল্লবীতে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ৫ ডেসিবেল, ধানমন্ডি বালক বিদ্যালয়ের সামনে সর্বোচ্চ ১০৭ দশমিক ১, ধানমন্ডি ৫ নম্বর সড়কে সর্বোচ্চ ৯৫ দশমিক ৫, নিউ মার্কেটের সামনে সর্বোচ্চ ১০৪ দশমিক ১, শাহবাগে সর্বোচ্চ ৯৭ দশমিক ৩ এবং সচিবালয়ের সামনে সর্বোচ্চ ৮৮ ডেসিবেল মাত্রায় শব্দ দূষণ হয়।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজধানীর ১২টি জায়গার প্রতিটিতেই দিনের বেলায় শতভাগ সময় নীরব এলাকার জন্য প্রযোজ্য মানমাত্রার (৫০ ডেসিবেল) চেয়ে বেশি মাত্রায় শব্দ হয়েছে। এর মধ্যে সচিবালয়ের পশ্চিমে মসজিদের পাশের এলাকা বাদে সব জায়গায় ৭০ ভাগের বেশি সময় ধরে ৭০ ডেসিবেলের (তীব্রতর) বেশি শব্দের মাত্রা ছিল। সামগ্রিকভাবে ১২টি জায়গায় সম্মিলিতভাবে ৯১ দশমিক ৯৯ ভাগ সময় ৭০ ডেসিবেলের (তীব্রতর) বেশি মাত্রায় শব্দ হয়েছে।

সর্বোচ্চ সময় ধরে তিনটি জায়গায় শব্দের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেগুলো হলো- পল্টন বাস স্ট্যান্ড (১০০ ভাগ সময়), জিরো পয়েন্ট (৯৯ দশমিক ৪ ভাগ সময়) ও কদম ফোয়ারা (৯৯ দশমিক ২ ভাগ সময়)। এই তিন জায়গায় নিয়মিতভাবে শব্দের মাত্রা ছিল ৭০ ডেসিবেলের বেশি।

jagonews24

রাজধানীর শব্দ দূষণের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকৌশলী ইকবাল হাবিব বলেন, শব্দ দূষণ থামাতে প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোও আমরা নিতে পারিনি। ভিআইপিরা যে বিশেষ ধরনের হর্ন ব্যবহার করেন, সেটাই বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এটা তো এমন নয় যে, অসুস্থ কিংবা অশিক্ষিত বা যাদের আইডেন্টিফাই করা যায় না এমন দুষ্কৃতকারীরা হর্ন বাজাচ্ছেন। কাজটা করছে ভিআইপি নামধারী মানুষেরা। আমরা সেটাই বন্ধ করতে পারিনি। আমরা হর্ন দেওয়ার জন্য কোনো ধরনের শাস্তি বা বিধিবিধান করি না। আমরা স্কুল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এমনকি সচিবালয়েও হর্ন বন্ধে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি। এত কিছুর পর আমাদের আর পরিবর্তন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

নগরের সমস্যা দূর করতে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্তি নেই। সমস্যা সমাধানে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে গণপরিবহনভিত্তিক, পথচারীবান্ধব ব্যবস্থায় না গেলে সমাধান মিলবে না। পাশাপাশি জনদুর্ভোগকে প্রাধান্য দিয়ে হর্ন ও শব্দ দূষণকে নিয়ন্ত্রণ করতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এ অবস্থা থেকে আমাদের পরিত্রাণের সুযোগ নেই বলে জানান এই নগরবিদ।

এমআইএস/এআরএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।