পণ্য না পেয়ে টাকা ফেরত চাইতে গেলে টর্চার সেলে নির্যাতন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:২৩ পিএম, ২৫ নভেম্বর ২০২১

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান খুলে অগ্রিম টাকা নিয়ে পণ্য না দিয়ে ভুক্তভোগীদের অস্ত্র দেখানোসহ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাতো একটি প্রতারক চক্র। চক্রটি তাদের নিজস্ব টর্চার সেলে লাঠিপেটা, বৈদ্যুতিক শকসহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে অফিস থেকে ভুক্তভোগীদের তাড়িয়ে দিতো। এ ঘটনায় প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ফাল্গুনীশপ ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পাভেল হোসেনসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। গতকাল বুধবার থেকে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে র‍্যাব-৪।

র‍্যাব বলছে, চক্রের মূলহোতা ফাল্গুনীশপ ডটকমের সিইও পাভেল হোসেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এভাবে পণ্য দেওয়ার কথা বলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন পাভেল হোসেন (৩০), সাইদুল ইসলাম (৪০), আব্দুল্লাহ আল হাসান (২৫) ও ফারজানা আক্তার মিম (২১)।

অভিযানে ফাল্গুনীশপ ডটকমের অফিস থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড গুলি, ২৪ ক্যান বিয়ার, চার বোতল দেশি মদ, একটি প্রাইভেটকার, কম্পিউটার, প্রিন্টার, বিপুল পরিমাণ এন-৯৫ মাস্ক, ১০০টি ইনভয়েস, ৩০টি চেক বই, ৮০টি সিল ও বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনের স্ক্রিনশট উদ্ধার করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৫ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মোজ্জাম্মেল হক।

jagonews24

তিনি বলেন, ফাল্গুনীশপ ডটকম, অরিমপো ডটকম ও টেক ফ্যামিলি ডটকম নামে একাধিক ই-কমার্স সাইট খুলে নিত্যপণ্যের বাজার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে তা অনলাইনে বিক্রির জন্য প্রচার করে সাধারণ লোকজনদের আকৃষ্ট করতো চক্রটি। পরবর্তীতে সাধারণ লোকজন তাদের দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে স্বল্পমূল্যে পণ্য পাওয়ার আশায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতো। এভাবে চক্রের মূলহোতা পাভেল তার সহযোগীদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। পাভেল হোসেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এভাবে পণ্য দেওয়ার কথা বলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

প্রতারক পাভেলের উত্থানের গল্প বর্ণনা করতে গিয়ে র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, ফাল্গুনীশপ ডটকম কারসাজির মূলহোতা পাভেল হোসেন, যিনি প্রতিষ্ঠানটির সিইও। আর গ্রেফতার সাইদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল হাসান ও ফারজানা আক্তার মিম তার অন্যতম সহযোগী। পাভেল ১৯৯১ সালে গোপালগঞ্জ জেলার সদর থানা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। পাভেল ২০০৭ সালে গোপালগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি, ২০০৯ সালে ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ২০১৪ সালে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পাস করেছেন। ২০০৯ সালে এইচএসসি অধ্যয়নরত অবস্থায় সে অস্ত্রসহ র‌্যাবের কাছে আটক হয় ও তার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় একটি অস্ত্র মামলা রয়েছে।

তিনি হক বলেন, ২০১৪ সালে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্টে রাজবাড়ীতে ৩০-৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন পাভেল। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন ঠিকাদার হিসেবে কাজ করার সময় তার পরিচিত একজন তাকে অনলাইন ব্যবসা করার পরিকল্পনা দেয়। ২০১৯ সালের শুরুতে পাভেল, জনৈক দিদারুল আলম, কানিজ ফাতেমা ও রহমতুল্লাহ শওকত মিলে ফাল্গুনীশপ ডটকম নামে একটি অনলাইন বিজনেস প্লাটফর্ম তৈরি করে। শুরুতে তারা উত্তরা এলাকায় একটি ভাড়া করা স্পেসে আউটলেট খুলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। ব্যবসার শুরুতেই পাভেলের অন্য অংশীদাররা তার এই গ্রাহক ঠকানোর বিষয়টি বুঝতে পারে ও তারা তার বিরুদ্ধে থানায় জিডি করে এফিডেবিট করে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে যৌথ ব্যবসা থেকে সড়ে যায়।

jagonews24

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, পাভেলের অংশীদাররা এ বিষয়টি জয়েন্ট স্টক অথরিটিকেও অবহিত করে। পাভেল তাদের নামে জাল সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে গ্রাহকদের প্রতারিত করতো এমনকী তাদের নাম ব্যবহার করে যৌথনামে চেক পর্যন্ত ইস্যু করতো। ২০২১ সালের মে মাসে প্রতারণার অভিযোগে কয়েকজন গ্রাহক পাভেলের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করলে পাভেল সিআইডির কাছে গ্রেফতার হয়ে ২১ দিন জেলে থেকে জামিনে এসেই আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কিছু গ্রাহক ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ করলে অধিদপ্তর একাধিকবার ফাল্গুনীশপ ডটকমের আউটলেট বন্ধ দেয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের জুলাই মাসে পাভেল খিলগাঁও থানার বনশ্রী এলাকায় অরিমপো ডটকম ও টেক ফ্যামিলি ডটকম নামে নতুন অফিসের আড়ালেই ফাল্গুনীশপ ডটকমের কার্যক্রম পরিচালনা করে। অরিমপো ডটকম ও টেক ফ্যামিলি ডটকমে নিজে এমডি ও তার স্ত্রী রিতা আক্তার চেয়ারম্যান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

প্রতারকদের কার্যপদ্ধতি

টার্গেট ক্রেতা সংগ্রহ:
প্রেস ব্রিফিংয়ে র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক বলেন, প্রতারক চক্রের সদস্যরা করোনা মহামারিতে লকডাউন চলাকালে অনলাইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী স্বল্প মূল্যে বিক্রির চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে। তাদের এই বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিপুল পরিমাণ অর্ডার দিতে থাকে। পরবর্তীতে প্রতারক প্রতিষ্ঠানটি কিছু কিছু ক্রেতাকে আংশিক, কিছু কিছু ক্রেতাকে নিম্নমানের পণ্য আবার কিছু ক্রেতাদের কোনো পণ্য সরবরাহ না করেই সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করে।

ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ
মোজাম্মেল হক বলেন, যেসব ক্রেতা তার এই অনলাইন শপ ফাল্গুনীশপ ডটকমে পণ্যের অর্ডার করতো তাদেরকে সে পণ্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করতে বলতো। তখন সাধারণ লোকজন তার কথা সরল মনে বিশ্বাস করে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করতো। সে পরবর্তীতে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও অনলাইন গেটওয়ে থেকে টাকা অন্যত্র স্থানান্তর বা জমি ও প্লট কিনে টাকা লেয়ারিং করতো।

প্রতারণার কৌশল
তিনি বলেন, প্রতারণার কৌশল হিসেবে সে শুরু থেকেই তার অনলাইন শপ ফাল্গুনীশপ ডটকম ও ফেসবুক পেজ ফাল্গুনীবিডির মাধ্যমে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কমে দাম নির্ধারণ করে তা অনলাইনে প্রচার করে সাধারণ লোকজনদের আকৃষ্ট করতো। পরবর্তীতে সাধারণ লোকজন তার দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে স্বল্পমূলে পণ্য পাওয়ার আশায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করতো। চক্রের মূলহোতা পাভেল তার সহযোগীদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ লোকজনের কাছ থেকে প্রতারণা করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ হাতিয়েছে।

jagonews24

‘ফাল্গুনীশপ ডটকমের ব্যবসায়িক অবকাঠামো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকে পাভেল হোসেনের নিজস্ব ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় চার কোটির অধিক টাকা লেনদেন হয়েছে। তার নামে ফাল্গুনীশপ ডটকম, ফাল্গুনী শপ ও ফাল্গুনী শপ বিডিসহ মোট ২৮টি নামসর্বস্ব কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে ফাল্গুনীশপ ডটকম কোম্পানি ছাড়া বাকি ২৭টি কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পাভেল অনলাইন শপের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব না খুলে তার নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করে অন্যত্র স্থানান্তর বা জমি ও প্লট কিনে টাকা লেয়ারিং করতো। পভেলের স্ত্রী পলাতক রিতা আক্তার (২৬) তার অন্যতম ব্যবসায়িক পার্টনার। বর্তমানে রিতা টেক ফ্যামিলি ডটকমসহ আরও সাত থেকে আটটি কোম্পানি খোলার পায়তারা করছে বলে জানা যায়।’

ক্রেতাদের অভিযোগ
‘গ্রেফতার পাভেলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও প্রতারণা মামলা রয়েছে। তার কাছে কোনো ভুক্তভোগী পণ্য অথবা তাদের পরিশোধ করা টাকা চাইতে তার অফিসে গেলে সে তাদের পণ্য ও টাকা ফেরত দিতো না। উল্টো ভুক্তভোগীদের অস্ত্রসহ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার নিজস্ব টর্চার সেলে লাঠি পেটা, বৈদ্যুতিক শকসহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে অফিস থেকে তাড়িয়ে দিতো।’

অভিযানে ওয়ার হাউজ থেকে ৪২৩ কেজি চা পাতা, ৭১৫ কেজি চাল, ৪১২ কেজি মসুর ডাল, ২৬০ কেজি ফুলক্রিম মিল্ক, আটটি বাইসাইকেল, ৪৫০ লিটার সয়াবিন তেল, ২১৪ লিটার সরিষার তেল, ৫০ কেজি লবণ, ১১০ কেজি হুইল পাউডার, গ্লাস ক্লিনার ও হারপিকসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

টিটি/এমআরআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]