সমুদ্রে ডাকাতি, উপকূলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে মুক্তিপণ আদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৩৮ পিএম, ০১ ডিসেম্বর ২০২১

বরগুনা, পাথরঘাটা ও পটুয়াখালী সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা নৌকায় ডাকাতি ও জেলেদের অপহরণের পর নারায়ণগঞ্জ থেকে মুক্তিপণের টাকা নিচ্ছিল দস্যুরা। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে অপহরণের টাকা আদায়ের পর তা দস্যুদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো।

সম্প্রতি পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এসময় দস্যুরা জেলের মাছ ধরার ট্রলারে হামলা করে এবং জেলেদের অপহরণ ও মাছ-জাল লুটে নেয়।

পরে জেলেদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে। এই টাকা অপহৃতরা জলদস্যু দলের অর্থ সংগ্রাহক ইলিয়াস হোসেন মৃধার কাছে পাঠায়। র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারির পর ইলিয়াসকে গ্রেফতার করা হয়। ইলিয়াস মূলত এক দস্যুনেতার নির্দেশে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে বসে মুক্তিপণের সাত লাখ টাকা নিয়েছিল। যার একটা অংশ আবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দস্যুদের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। গ্রেফতারের সময় অপহরণের পাঁচ লাখ টাকা ইলিয়াসের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়।

rab01

বুধবার (১ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজানে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের লিগ্যাল আ্যন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, গত নভেম্বরের মাঝামাঝি পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও বরগুনা থেকে জেলেরা মাছ ধরতে গভীর সমুদ্রে যায়। ২০ নভেম্বর রাতে জেলেরা পাথরঘাটা, বরগুনা ও পটুয়াখালী (বলেশ্বর ও পায়রা মোহনা) বঙ্গোপসাগরের তৎসংলগ্ন ৩০-৫০ কিঃ মিঃ অভ্যন্তরে বেশ কয়েকজন অপহৃত হয়। এসময় একটি নৌকার মূল মাঝি, কয়েকজন জেলে ও মোবাইল অপহরণ করে। আর দস্যুরা অপহরণ করে জেলেদের কাছে মুক্তিপণের টাকা দাবি করে এবং তাদের একটি নৌকা রেখে দেয়। যা দিয়ে ডাকাতির কাজ চালায়। তাছাড়া জেলেদের কাছ থেকে লুট করা মাছ, জাল এবং তেল ডাকাতদের নৌকার মাধ্যমে উপকূলে নিয়ে যায়।

rab01

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, এই ঘটনার পর র‌্যাব জেলেদের উদ্ধার ও দস্যুদের আটকে কাজ শুরু করে। র‌্যাব-৮ এর আভিযানিক দল বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে ও সমুদ্রের নিকটবর্তী চরাঞ্চল যেমন- ডালচর, সোনার চর, চর মন্তাজসহ বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি শুরু করে। তাছাড়াও হেলিকপ্টারে টহল দেয়। দস্যুরা র‌্যাবের গতিবিধি ও তৎপরতা আঁচ করতে পেরে ২৩ নভেম্বর অপহৃত জেলেদের নৌকায় রেখে কৌশলে পালিয়ে যায়। কিন্তু এসব জেলেদের ডাকাত সন্দেহে ঘিরে ফেলে হামলা চালায় স্থানীয় জেলেরা।

র‌্যাব মোবাইল ব্যাংকিং ট্রান্সফারের মাধ্যমে মুক্তিপণের অর্থের ব্যাপারে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহৃত রাখে। র‌্যাবের গোয়েন্দারা নারায়ণগঞ্জসহ আরও কয়েকটি জায়গায় এ সংক্রান্ত ফুটপ্রিন্ট শনাক্ত করে। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গত রাতে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমায় জেলেদের নৌকায় ডাকাতির মূল মুক্তিপণ সংগ্রাহক ইলিয়াস হোসেন মৃধাকে মুক্তিপণের টাকাসহ গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় মুক্তিপণের পাঁচ লক্ষাধিক টাকা।

jagonews24

র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইলিয়াস জানিয়েছে, সে সংঘবদ্ধ জলদস্যু দলের সদস্য। ইলিয়াস দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জে বসবাস করলেও তার বাড়ি পটুয়াখালীতে। এই দস্যু দলে ১৫-১৭ জন সদস্য রয়েছে। দলের সদস্যরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে মূলত ডাকাতির কাজ করে। আর মুক্তিপণ সংগ্রহে ২/৩ জন কাজ করে। ইলিয়াসের দায়িত্ব ছিল অপহরণদের মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ ও বন্টন করা। ডাকাত সর্দারের অত্যন্ত আস্থাভাজন হওয়ায় তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর মুক্তিপণের টাকা বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের কাছে ভুয়া মোবাইল নম্বর দিত। আবার অনেক সময় ভুয়া একাউন্ট তৈরি করত। প্রতিটি ডাকাতির পর ইলিয়াস ও তার সহযোগীরা ছদ্মবেশে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করত এবং মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলত। তারপর কাজ শেষে ওই এলাকা ত্যাগ করত।

দিনে লুকিয়ে থেকে রাতে ডাকাতি

র‌্যাব জানিয়েছে, সমুদ্র সীমানার যেসব এলাকায় মাছ ধরতে জেলেদের আনাগোনা আছে সেসব এলাকার উপকূলে দস্যুরা অবস্থান নেয়। দিনে তারা ছদ্মবেশে বা আত্মগোপনে থাকলেও রাতে তারা সমুদ্রে গিয়ে জেলেদের নৌকায় ডাকাতি করে। মাছ ধরার মৌসুম বাদে অন্য সময় তারা গার্মেন্টসকর্মী, নির্মাণ শ্রমিক, রাজমিস্ত্রী, সেমাই ও মিষ্টি তৈরির কারখানা ও ইটের ভাটার কাজ করে। অনেক সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক বিয়ে করে ছদ্মবেশে জীবনযাপন করছে। র‌্যাব বলছে, জেলেদের নৌকায় লুট করা মাছ, জাল, নৌকা, তেলসহ অন্যান্য জিনিস অল্প দামে বিক্রি করত। এগুলো কারা কিনছে তাদের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

টিটি/এসএইচএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]