সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ‘নিসআ’ কেন আসে?

মাহবুবুল ইসলাম মাহবুবুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:১৯ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

রাজধানীর রামপুরায় একরামুন্নেসা স্কুলের শিক্ষার্থী মাঈনুদ্দিন বাসচাপায় মারা যাওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রামপুরা ব্রিজে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করে বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন (১ ডিসেম্বর) নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (নিসআ) নামে একটি সংগঠনের কয়েকজন নেতা এর নেতৃত্ব নিতে চান। এতেই বাধে বিপত্তি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করতে চাইলেও নিসআর কর্মীরা তা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিতণ্ডারও সৃষ্টি হয়।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, অনাবিল পরিবহনের একটি বাসের চাপায় মাঈনুদ্দিনের মৃত্যুর পর তারা যে আন্দোলনে নেমেছেন, তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের ‘উদ্দেশ্য হাসিল’ করতে চান নিসআর নেতারা। এ সময় তাদের বিরুদ্ধে পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বুধবার (১ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা থেকে রামপুরা ব্রিজে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা বাস আটকে রেখে অন্য যানবাহনের চালক ও গাড়ির লাইসেন্স আছে কি না তা পরীক্ষা করেন। পরে দুপুর ২টার দিকে কর্মসূচি সমাপ্তির ঘোষণা দেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ১১ দফা দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় থাকার ঘোষণা দিলেও এইচএসসি পরীক্ষার জন্য রাস্তার আন্দোলন বন্ধ রাখার কথা জানান।

এর কিছুক্ষণ পরই রামপুরা ব্রিজে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মাঝে এসে বক্তব্য দেন নিসআর যুগ্ম-আহ্বায়ক এনজামুল হক রামিম, আব্দুল্লাহ মেহেদী দিপ্ত ও শহীদুল ইসলাম আপন। তারা তাদের বক্তব্যে তিন বছর ধরে চলে আসা ৯ দফা দাবি পেশ করেন। এ সময় এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালেও সীমিত পরিসরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।

তাদের এ ঘোষণায় আপত্তি জানান সকাল থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ বাগবিতণ্ডা হয়। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিসআর নেতাদের কাছে স্টুডেন্ট আইডি কার্ড দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হন। এতে শিক্ষার্থীরা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে নিজেদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন নিসআর নেতারা।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জাগো নিউজকে বলেন, দুদিন ধরে আমরা আন্দোলন করছি। কয়েক দিন আগে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাইম হাসান এবং এর কয়দিনের মাথায় মাঈনুদ্দিন বাসচাপায় হত্যার প্রতিবাদকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা রাজপথে নেমেছি। এই প্রতিবাদের সঙ্গে আমরা ১১টি দাবি উত্থাপন করেছি। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবেই আন্দোলন করছি। কিন্তু উনারা (নিসআর নেতারা) বাইরে থেকে এসে আমাদের মাঝে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তারা আরও বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকে তারা ছিলেন না। মাঝখানে এসে আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নিজেদের দাবি সাধারণ শিক্ষার্থীদের বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের নিয়ম হচ্ছে আইডি কার্ড ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী আন্দোলনে থাকবে না। কারণ এটা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। কিন্তু তারা আইডি কার্ডই দেখাতে পারেননি আমাদের। বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সাধারণ আন্দোলন বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নিজেদের ব্যানারে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

২০১৮ সালে রাজধানীর কুর্মিটোলায় রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজিব ও দিয়া বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর গড়ে ওঠা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (নিসআ)। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেমে গেলেও ৯ দফা দাবি নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান সংগঠনটির কিছু নেতা। সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের কমিটিও রয়েছে। সংগঠনটির আহ্বায়ক মোস্তফা রেজওয়ান রাহাত বর্তমানে কানাডা প্রবাসী।

এছাড়া নিসআর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে।

jagonews24

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন সময় সড়কে শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যানারবিহীন আন্দোলনে নামলে একই সময়ে সাংগঠনিকভাবে বিবৃতি দেয় নিসআ। তাদের এ বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় নিজেদের সামনে আনে তারা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে ফায়দা নেয় বলে অভিযোগ মেলে।

রামপুরায় আন্দোলনরত একজন শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে বলেন, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী। আমাদের সঙ্গে নিসআর কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের দাবির সঙ্গে আমরাও একমত। কিন্তু আমাদের চলমান আন্দোলন যে ইস্যুতে তৈরি হয়েছে, আমরা এটাকে আড়াল করতে চাই না। কিন্তু তারা নিজেরা নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের আন্দোলনকে তাদের আন্দোলন বলে প্রচার করার চেষ্টা করছে। আমাদের আন্দোলনকে তাদের নিজেদের ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ বানাতে চাইছে। আমরা তা হতে দেবো না।

সংগঠনটির ঢাকা মহানগর কমিটি থেকে স্বেচ্ছায় বের হয়ে আসা একজন শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে বলেন, ২০১৮ সালের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিসআ গঠিত হলেও তারা পরিবহন মালিক সমিতি, শ্রমিক ফেডারেশন ও বাস শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছেন। বিভিন্ন সময়ে তারা পরিবহন সেক্টরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নিজেদের আন্দোলন দেখিয়ে সেখান থেকে সাংগঠনিকভাবে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যার সঙ্গে আমাদের বর্তমান সাধারণ আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি আরও বলেন, পরিবহন সেক্টরের কোনো নেতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। আমরা যখন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ব্যানারবিহীন আন্দোলন করি, তখন নিসআর নেতারা ব্যানার নিয়ে বিআরটিএসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন। যাদের মধ্যে শুধুই তাদের সংগঠনের কর্মীরা থাকে।

এই বিতর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে নিসআর যুগ্ম-আহ্বায়ক এনজামুল হক রামিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী। ২০১৮ সালে আমি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম।’

আপনারা কোন সংগঠনের জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী।’

রামপুরার আন্দোলনস্থলে আইডি কার্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে নিসআর এক নারী কর্মী বলেন, ‘আমরা আন্দোলনেরই লোক’।

পরে অবশ্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে আন্দোলনস্থল ত্যাগ করেন নিসআর নেতারা।

এমআইএস/এমএইচআর/এইচএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]