‘লঞ্চ দুর্ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি না দিলে অপরাধ আরও বাড়বে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৫৫ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২২
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চ এমভি অভিযান-১০/ফাইল ছবি

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিধান-১০ লঞ্চ দুর্ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি না দিলে অপরাধ আরও বেড়ে যাবে বলে মনে করে নাগরিক তদন্ত কমিটি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুধু মালিক, মাস্টার ও ড্রাইভারকে শাস্তি না দিয়ে এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনাসহ ২৫ দফা সুপারিশ জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো উত্থাপন করেন নাগরিক তদন্ত কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আশীষ কুমার দে।

সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের ছয়টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র অব্যবহৃত পাওয়া যায়। আগুন লাগার পর লঞ্চটির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে দুর্ঘটনাস্থল সংলগ্ন মানুষের বক্তব্য থেকে নাগরিক তদন্ত কমিটি জানতে পারে। লঞ্চটি নোঙর করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া সত্ত্বেও লঞ্চকর্মীরা তা করেননি। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা ও লঞ্চটি দ্রুত নোঙর করা কিংবা কোথাও ভেড়ানো হলে আগুনের ভয়াবহতা ও প্রাণহানি অনেক কম হতো বলে মনে করে নাগরিক তদন্ত কমিটি।

আশীষ কুমার দে বলেন, সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, আগুন লাগার পর তাদের আর দেখা যায়নি। এসব কারণে এমভি অভিধান-১০ লঞ্চের ইঞ্জিন ড্রাইভার মাসুম বিল্লাহ ও আবুল কালামসহ সেদিন কর্মরত সব গ্রিজার দায়ী বলে মনে করছে নাগরিক তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এমডি অভিযান-১০ লঞ্চটি চাঁদপুর ঘাট অতিক্রম করার পর ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়, অস্বাভাবিক শব্দ হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীরা জানিয়েছেন। ইঞ্জিনের ত্রুটি সারাতে ব্যর্থ হওয়ায় লঞ্চটি আর না চালিয়ে নিরাপদ কোনো ঘাটে আগেই ভেড়ানো উচিত ছিল। অনেক যাত্রী লঞ্চ ভেড়ানোর অনুরোধও জানিয়েছিলেন। কিন্তু লঞ্চের মাস্টার ও ইঞ্জিন ড্রাইভার এ বিষয়ে কর্ণপাত না করে ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে লঞ্চটি চালিয়ে যেতে থাকেন।

তিনি বলেন, লঞ্চটির ইঞ্জিনের শব্দ অন্যদিনের মতো ছিল না। ইঞ্জিন কক্ষ ও আশপাশের এলাকা প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে আগুন ধরে যায়। এতে অর্ধশত মানুষের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাই নাগরিক তদন্ত কমিটির সদস্যরা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এই ঘটনার জন্য দায়ী সবার শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছে।

এসময় দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ দিতে আইন প্রণয়ন, টাকার পরিমাণ নির্ধারণ ও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী (নৌযান মালিক/মাস্টার/ড্রাইভার/সরকারি কর্মকর্তা) ব্যক্তিদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করারও সুপারিশ করেন।

নাগরিক তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো হচ্ছে—

>> প্রত্যেক যাত্রীবাহী নৌযানে আনসার/সিকিউরিটি থাকা বাধ্যতামূলক করা;

>> যাত্রীবাহী লঞ্চের ইঞ্জিন কক্ষ, প্রবেশপথ, মাস্টার ব্রিজসহ স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা;

>> যেকোনো নৌযানের নকশায় অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত, সেই অনুযায়ী নকশা অনুমোদন ও যথাযথভাবে নকশা মেনে নৌযান নির্মাণ করা;

>> নতুন নৌযানে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা সঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত হতে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেওয়া ও ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে প্রতি তিন মাস পরপর তা পরীক্ষা করা;

>> চলমান নৌযানগুলো বিশেষ করে লঞ্চ ও অন্যান্য যাত্রীবাহী নৌযানের অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে কি না তা আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পরীক্ষা করা;

>> লঞ্চের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার না করা;

>> ইঞ্জিন কক্ষের পাশ থেকে খাবারের হোটেল সরিয়ে নেওয়া এবং ইঞ্জিন কক্ষ ও ক্যান্টিনের আশেপাশে জ্বালানি তেলসহ কোনো দাহ্য পদার্থ রাখা নিষিদ্ধ করা;

>> নৌযানের ইঞ্জিন কক্ষে আগুন লাগলে তা দ্রুত নেভানোর জন্য স্থায়ী কার্বন ডাইঅক্সাইড সরবরাহ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা।

>> নৌযানের কর্মীদের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র পরিচালনার বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক ও বছরে অন্তত একবার মহড়ার ব্যবস্থা করা;

>> প্রত্যেক নাবিকের ইউনিফর্ম পরিধান বাধ্যতামূলক করা;

>> আইএসও ৫৮ (ক) ধারা মোতাবেক যাত্রীবাহী নৌযানের বিমা অথবা নৌ-দুর্ঘটনা ট্রাস্ট ফান্ড বাধ্যতামূলক করা;

>> যেকোনো নৌ-দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য অভিজ্ঞ নৌ-স্থপতি, নৌ-প্রকৌশলী, পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ, মাস্টার মেরিনার, নৌপরিবহন-বিষয়ক গবেষক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, নৌ-অধিদপ্তর, নৌযান মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের একজন করে প্রতিনিধির সমন্বয়ে জাতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা;

Press-2.jpg

>> প্রত্যেক দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট ও নারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা নৌ-মন্ত্রণালয় ও নৌ-অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা;

>> আধুনিক ও ত্রুটিমুক্ত নৌযান নির্মাণের স্বার্থে নকশা অনুমোদনের দায়িত্ব নৌ-অধিদপ্তর থেকে প্রত্যাহার করে একাধিক সংস্থার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র নকশা অনুমোদন কমিটি গঠন করা;

>> ত্রুটিপূর্ণ নৌযান চলাচল বন্ধে যথাযথভাবে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য শূন্যপদগুলোতে অবিলম্বে নিয়োগ দিয়ে নৌ-অধিদপ্তরের ‘শিপ সার্ভেয়ার’ সংকট নিরসন ও বার্ষিক সার্ভে প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা;

>> কোন শিপ সার্ভেয়ার কোন মাসে কতগুলো নৌযান নিবন্ধন ও সার্ভে করছেন নামসহ সেই তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা;

>> দক্ষ নৌযান চালক তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিসহ এ ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ মাস্টারশিপ-ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা বোর্ড গঠন, পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার ও পরীক্ষার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা সমমানের নির্ধারণ করা;

>> নৌ-অধিদপ্তর থেকে সমুদ্রগামী নাবিকদের সার্টিফিকেট অব প্রফিশিয়েন্সি (সিওপি), অভ্যন্তরীণ নৌযান চালকদের সনদ নবায়নসহ অন্যান্য সেবা ও নৌযান মালিকদের নিবন্ধন-বার্ষিক ফিটনেস সনদ পেতে অহেতুক কালক্ষেপণ, অর্থব্যয় ও হয়রানি বন্ধ করা;

>> নিয়ন্ত্রক সংস্থা নৌ-অধিদপ্তরকে শক্তিশালী ও গতিশীল করতে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়োগ, দ্রুতগতির টহল বোটসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক জলযান ও কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি বরাদ্দ করা;

>> রাজস্ব আদায় ও নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারা দেশে বৈধ-অবৈধ সব ধরনের নৌযানের সংখ্যা নির্ধারণে অবিলম্বে জাতীয় নৌ-শুমারির ব্যবস্থা নেওয়া;

>> নিবন্ধন ও ফিটনেসবিহীন নৌযানের বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-অধিদপ্তরকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া এবং এ কাজে সহায়তার জন্য নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশকে সম্পৃক্ত করা;

>> নদী খনন ও নৌপথের পলি অপসারণ কাজের গতি বাড়ানো, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চলমান প্রকল্পগুলোর তথ্য সবিস্তারে বিআইডব্লিউটিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা এবং বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএসহ সব সরকারি দপ্তরের নৌযানগুলোকে হালনাগাদ সার্ভের আওতায় আনা ও নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলো থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক আবু নাসের খান, সদস্য সচিব আমিনুর রসুল বাবুলসহ আরও অনেকে।

আরএসএম/এআরএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]