এক বছরে সড়কে ঝরেছে প্রায় ৮ হাজার প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:০৬ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২২

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ৮৫ দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকার পরও ২০২১ সালে ৫ হাজার ৬২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৮০৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৯ হাজার ৩৯ জন। এর আগের বছর ৪ হাজার ৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ৬৮৬ জন। আর আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৬০০ জন।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ তথ্য তুলে ধরেন। এসময় তিনি বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন-২০২১ প্রকাশ করেন।

প্রতিবেদন তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২১ সালে সড়ক পথের পাশাপাশি রেলপথে ৪০২টি দুর্ঘটনায় ৩৯৬ জন নিহত, আহত ১৩৪ জন। নৌ-পথে ১৮২টি দুর্ঘটনায় ৩১১জন নিহত, আহত ৫৭৮ জন এবং ৫৪৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। সড়ক, রেল, নৌ-পথে মোট ৬ হাজার ২১৩টি দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫১৬ জন নিহত ও ৯ হাজার ৭৫১ জন আহত হয়েছেন।

দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদপত্রসমূহে প্রচারিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন তাদের মধ্যে ২ হাজার ৩৫০ জন চালক, ১ হাজার ৭১৫ জন পথচারী, ১ হাজার ১৭ জন পরিবহণ শ্রমিক, ৪৩০ জন ছাত্র-ছাত্রী, ১১১ জন শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২৩৭ জন সদস্য, ১ হাজার ৭৬ জন নারী, ৬৩৮ জন শিশু, ৪২ জন সাংবাদিক, ২৭ জন চিকিৎসক, ১৪ জন আইনজীবী, ১৮ জন প্রকৌশলী, ১৬১ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ১০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

jagonews24

পত্রিকায় প্রাকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব দুর্ঘটনায় বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি জিডিপির প্রায় ১.৫ শতাংশ। এসব হতাহতদের ৭৮.৩৯ শতাংশ ১৫ থেকে ৪৫ বছরের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী।

দুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সংগঠিত যানবাহনের ০.৭৯ শতাংশ মোটরসাইকেলে, ০.৭৬ শতাংশ কার-জিপ মাইক্রোবাসে ০.২১ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেলেও করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতিতে ৮৫ দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ২.৩৬ শতাংশ বাস দুর্ঘটনা, ১ শতাংশ নসিমন-মাহিন্দ্ৰা-লেগুনা দুর্ঘটনা, ০.৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক দুর্ঘটনা কমেছে।

সড়ক দুর্ঘটনার বেশ কিছু কারণ তুলে ধরেন মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, বেপরোয়া গতি, বিপদজনক অভারটেকিং, রাস্তাঘাটে ত্রুটি, ফটিনেসবিহীন যানবাহণ, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতাসহ বেশ কিছু কারণ রয়েছে দুর্ঘটনার পেছনে।

প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১২টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ১. সড়ক নিরাপত্তায় বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করা। ২. আইনের ত্রুটি চিহ্নিত করে সংস্কারপূর্বক ডিজিটাল পদ্ধতিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। ৩. সড়ক নিরাপত্তায় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো, মন্ত্রণালয়ে আলাদা সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট গঠন। ৪. সড়ক নিরাপত্তায় এরই মধ্যে প্রণীত যাবতীয় সুপারিশমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া। ৫. দেশের সড়ক-মহাসড়কে রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা। জেব্রা ক্রসিং অংকন করা। ৬. পরিবহন চালকদের পেশাদার ট্রেনিং ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা। ৭. পরিবহন সেক্টরে অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাদাঁবাজি বন্ধ করা। ৮. গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তালমিলিয়ে আধুনিকায়ন করা। ৯. সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনপূর্বক হতাহতদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। ১০. দেশব্যাপী চাহিদানুযায়ী পর্যাপ্ত মানসম্মত নতুন গণপরিবহন নামানোর উদ্যোগ নেওয়া। ১১. ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা। ১২. পরিবহনে সেবা ও নিরাপত্তার মান পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের সব মন্ত্রী, সংসদ সদস্য সচিব, জেলা প্রশাসকদের প্রতিমাসে একদিন পরিচয় গোপন রেখে গণপরিবহন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।

লিখিত বক্তব্য শেষে প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছরই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে, শুধু কারিগরি সমস্যার কারণেই নয়, রাজনৈতিক সমস্যাও রয়েছে এ ক্ষেত্রে।

তিনি বলেন, দেশে আইন কাগজে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার।

ড. হাদিউজ্জামান বলেন, জাপানে মোটরসাইকেল চলাচলে নিয়ন্ত্রণ করায় সেখানে সড়কে মৃত্যু কমেছে ৫০ ভাগ। অথচ আমাদের দেশে ৩ ভাগের ১ ভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। আমরা গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ যেমন করতে পারি না, আবার মোটরসাইকেল চলাচলেও কোনো মানদণ্ড দেখি না।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক আবদুল হক, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন, নাগরিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ, সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্না, সংগঠনের সহ-সভাপতি তাওহীদুল হক লিটন প্রমুখ।

আরএসএম/ইএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]