সালিশে অপমান হয়ে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যা করেন সিরাজুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:২৭ পিএম, ২৩ জুন ২০২২

২০০২ সালে সিরাজুলের (৪০) সঙ্গে আব্দুল জলিলের মেয়ে জুলেখার (১৯) বিবাহ হয়। বিয়ের পর থেকে সিরাজুল স্ত্রীকে যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নির‍্যাতন করতে থাকেন। এমনকি যৌতুক না দিতে তালাক দেওয়ার ভয়-ভীতি দেখায়।

এরই মধ্যে জুলেখা ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। একপর‍্যায়ে সিরাজুল তার প্রতিবেশী মোশারফ নামে এক যুবকের সঙ্গে জুলেখার পরকীয়ার সম্পর্ক আছে বলে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়।

হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিরাজুলের ব্যাগে থাকা গামছা দিয়ে স্ত্রী জুলেখার গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীর পাড়ে ফেলে পালিয়ে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় জুলেখার নিহত হওয়ার পাশাপশি তার ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা সন্তানও হত্যার শিকার হয়।

১৯ বছর পালিয়ে থাকার পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-৪ এর একটি চৌকস আভিযানিক দল মানিকগঞ্জের চাঞ্চল্যকর অন্তঃসত্ত্বা জুলেখা (১৯) হত্যা মামলার পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সিরাজুলকে নারায়ণগঞ্জের সদর থানার চর সৈয়দপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুন) দুপুরে কারওয়ান বাজার র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক।

আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০০২ সালের জুলাইয়ে আসামি মানিকগঞ্জ সদর থানার বাহের চর এলাকার সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে সিংগাইর থানার উত্তর জামশা গ্রামের আব্দুল জলিলের মেয়ে জুলেখা বেগমের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে বেশকিছু নগদ অর্থ, গহনা ও আসবাবপত্র বরপক্ষকে দেওয়া হয়।

jagonews24

বিয়ের পর থেকে সিরাজুল জুলেখাকে আরও যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নির‍্যাতন করতে থাকে। যৌতুক না দিতে পারলে তালাক দেওয়ার ভয়-ভীতি দেখায়। এর মধ্যে জুলেখা ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। পরিবার থেকে পর‍্যাপ্ত যৌতুক না পাওয়ায় আসামির সঙ্গে জুলেখার পারিবারিক কলহ আরও বেড়ে যায়।

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক বলেন, সিরাজুলের নির‍্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে জুলেখার বাবা-ভাইসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে গ্রামে সালিশি বৈঠক হয়। সেখানে তার স্ত্রীর কোনো দোষ না পেয়ে এবং পরকীয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় সালিশে আসামিকে গালিগালাজ করে। এ ঘটনার পর সিরাজুল আরও ক্ষিপ্ত হয়ে এবং মনে মনে জুলেখাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০০৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সিরাজুল জুলেখাকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি সিংগাইরের উত্তর জামশা গ্রামে যায়। এর তিনদিন পর সিরাজুল জুলেখাকে চিকিৎসক দেখানোর কথা বলে মানিকগঞ্জ শহরে নিয়ে যায়। বিভিন্ন অজুহাতে ইচ্ছাকৃতভাবে কালক্ষেপণ করে গভীর রাতে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে মানিকগঞ্জ শহর থেকে রওনা হয়। মানিকগঞ্জ শহর থেকে সিরাজুল জুলেখাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি না গিয়ে কৌশলে তার শ্বশুরবাড়ির পাশে কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়।

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক বলেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আসামি তার ব্যাগে থাকা গামছা বের করে জুলেখার গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীর পাড়ে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় জুলেখার নিহত হওয়ার পাশাপশি তার ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা সন্তানও হত্যার শিকার হয়।

পরে ২০০৩ সালের ৭ ডিসেম্বর থানা পুলিশ জুলেখার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠায়। একই দিনে চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জুলেখার বাবা আব্দুল জলিল বাদী হয়ে সিংগাইর থানায় আসামি সিরাজুলসহ তার বড় ভাই রফিকুল, মা রাবেয়া বেগম, খালু শামসুল, চাচা ফাইজুদ্দিন ও তাইজুদ্দিন এবং মামা আবুল হোসেনসহ মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-১৬।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এজাহারনামীয় স্বামী সিরাজুল, ভাসুর রফিকুল, শাশুড়ি রাবেয়া ও খালু শ্বশুর শামসুলসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেন। এজাহারনামীয় বাকি তিনজন আসামি- ফাইজ উদ্দিন, তাইজুদ্দিন ও আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পরে চার্জশিটের ভিত্তিতে আদালত মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন। পর‍্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে জুলেখাকে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে ২০০৫ সালের শেষের দিকে মানিকগঞ্জ জেলার জেলা ও দায়রা জজ মো. মোতাহার হোসেন চার্জশিটে অভিযুক্ত আসামি সিরাজুলকে মৃত্যুদণ্ড দেন। অপর তিন আসামি ভাসুর রফিকুল, শাশুড়ি রাবেয়া ও খালু শ্বশুর শামসুলকে খালাস দেন। এ ঘটনার পর থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সিরাজুল প্রায় ১৯ বছর পলাতক ছিলেন।

টিটি/এমআরএম/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]