‘পদ্মা কিন্তু দুইটা সেতু’

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৯ পিএম, ২৪ জুন ২০২২

শফিকুল ইসলাম। এক সময় ছিলেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। বর্তমানে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠায় আগের প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে বাদ দেয় সরকার। তার স্থলে ২০১১ সালের নভেম্বরে নিয়োগ পান শফিকুল ইসলাম। অবসরে যাওয়ার পর ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর তাকে চুক্তিভিত্তিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে রেখে দেওয়া হয়।

এরপর আরও চার দফা চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে নির্মাণকাজের পুরোটা সম্পন্ন হয়েছে শফিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে। বড় স্থাপনা নির্মাণে তার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সততার জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রশংসিত হয়েছেন। এজন্য পদ্মা সেতুর শেষ পর্যায়ে এসে সরকার নতুন কাউকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে চায়নি।

এরকম জটিল প্রকল্প পৃথিবীতে খুব বেশি হয়নি। এমন নদী পৃথিবীতে হয়তো দু- একটা আছে, যেখানে এখনো ব্রিজ হয়নি। কাজেই আমরা একটা উল্লেখযোগ্য কাজ করে সফল হয়েছি বলে মনে করি।

আরও পড়ুন: ‘পদ্মা কিন্তু দুইটা সেতু’

বাংলাদেশের স্বপ্নের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানান অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন শফিকুল ইসলাম। সেসব নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

জাগো নিউজ: শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দক্ষ চালকের মতো প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করলেন, কেমন লাগছে?

শফিকুল ইসলাম: আমরা সেতু নির্মাণের বন্দরে পৌঁছাতে পেরেছি এটাই আমাদের প্রাপ্তি। সমস্যামুক্ত বা দুর্ঘটনামুক্তভাবে নদী পারাপার করা যাবে এটা বড় পাওয়া। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এটার বিশাল গুরুত্ব আছে। শেষ পর্যন্ত বন্দরে পৌঁছাতে পেরেছি এতে অনেক ভালো লাগছে।

জাগো নিউজ: সেতু বাস্তবায়নে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল?

শফিকুল ইসলাম: ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিক দিয়ে আমরা বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। এরকম জটিল প্রকল্প পৃথিবীতে খুব বেশি হয়নি। এমন নদী পৃথিবীতে হয়তো দু-একটা আছে, যেখানে এখনো সেতু হয়নি। কাজেই আমরা একটা উল্লেখযোগ্য কাজ করে সফল হয়েছি বলে মনে করি।

জাগো নিউজ: সেতুর অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ কোনটা আপনার দৃষ্টিতে?

শফিকুল ইসলাম: আমরা কোনো চ্যালেঞ্জকে ছোট মনে করিনি। ছোট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। কাজগুলো আমাদের ধাপে ধাপে করতে হয়েছে। কোনো চ্যালেঞ্জকে খাটো করা যায় না। যখনই সমস্যা আসছে তখনই সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছি। নিজেরা না পারলে বিশেষজ্ঞ ও প্যারালাল এক্সপার্টের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা চেষ্টা করেছি এটাকে ওভারকাম করার জন্য, যাতে আমাদের কোনো সমস্যা না হয়।

আরও পড়ুন: পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেন যাবে ২০২৩ সালের জুনে

জাগো নিউজ: পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে রেকর্ড কী কী?

শফিকুল ইসলাম: খরস্রোতা পদ্মা নদীতে নির্মিত হয়েছে পদ্মা সেতু। পানিপ্রবাহের বিবেচনায় বিশ্বে আমাজন নদীর পরই এর অবস্থান। মাটির ১২০ থেকে ১২৭ মিটার গভীরে গিয়ে পাইল বসানো হয়েছে এই সেতুতে। পৃথিবীর অন্য কোনো সেতু তৈরিতে এত গভীরে গিয়ে পাইল প্রবেশ করাতে হয়নি, যা পৃথিবীতে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয় রেকর্ড হলো ভূমিকম্পের বিয়ারিং সংক্রান্ত। এই সেতুতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’র সক্ষমতা ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত কোনো সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

এর পরের বিশ্বরেকর্ড হলো পিলার এবং স্প্যানের মধ্যে যে বিয়ারিং থাকে সেটি। এখানে ১০ হাজার ৫শ মেট্রিক টন ওজনের একেকটি বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে। পৃথিবীতে এর আগে কোনো সেতুতে এমন বড় বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি। অন্য রেকর্ডটি হলো নদীশাসন সংক্রান্ত। ১৪ কিলোমিটার (১ দশমিক ৬ কিলোমিটার মাওয়া প্রান্তে ও ১২ দশমিক ৪ কিলোমিটার জাজিরা প্রান্তে) এলাকা নদীশাসনের আওতায় আনা হয়েছে। এটাও রেকর্ড।

জাগো নিউজ: পদ্মা সেতুর ব্যয় বাড়া প্রসঙ্গে কিছু বলার আছে কি না?

শফিকুল ইসলাম: পদ্মা সেতু শুধু সেতু নয়। নদীশাসন, মূল সেতু, পুনর্বাসন ও অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ লাইন ও গ্যাস লাইনও আছে। আমাদের মূল সেতুর কস্ট কিন্তু ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ লাইন আছে সেখানেই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে। গ্যাস লাইন আছে সেখানেও ৩০০ কোটি টাকার উপরে চলে যাচ্ছে। শুধু ব্রিজে ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা নেই। ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা চলে গেছে। এটা অনেকে বুঝতে পারে না। এটা কিন্তু রেলসেতুসহ, মানে দুইটা সেতু। মেঘনা সেতু একটা, ভৈরব সেতু একটা। পদ্মা কিন্তু দুইটা সেতু। এটা ছয় লেনের সেতু। ট্রেন কিন্তু যাবে ১৬০ কিলোমিটার গতিতে। এত হাইস্পিড ট্রেন যাবে। এটা ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ের একটা অংশ। এই লোডটা সেতুর ওপর দিতে হয়েছে। এই সেতু ১০০ বছরে আর হবে না।

আরও পড়ুন: ‘সিঙ্গাপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেন যাবে ইউরোপে’

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে আমরা এটা করেছি। সিঙ্গাপুর থেকে যখন ইউরোপে ট্রেন যাবে তখন পদ্মা সেতু হয়ে যাবে। অনেক মালামাল নিয়ে যাবে, সুতরাং হেভি লোডেড সেতু বানানো হয়েছে। বিভিন্ন কারণে এটা করতে হয়েছে। সেতুর খরচ কিন্তু ভুলভাবে দেখানো হচ্ছে। তুলনা করলে বাংলাদেশের অন্যান্য সেতু থেকে খরচ কম। মেঘনা ও দাউদকান্দি সেতুতে কত খরচ করেছি। রেলওয়ে সেতুর খরচ কত? সব মিলিয়ে দেখলে খরচ বেশি হয়নি।

জাগো নিউজ: বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়। আপনি কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আছেন। এ প্রসঙ্গে যদি কিছু বলতেন।

শফিকুল ইসলাম: আমি নিজে ইচ্ছে করে এখানে থাকিনি পিডি (প্রকল্প পরিচালক) হিসেবে। সরকার আমাকে রেখেছে। তবে বলবো এটা সরকারের একটা সুচিন্তিত মতামত। এ বিষয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। যদি প্রকল্প পরিচালকের ধারাবাহিকতা না থাকে তবে প্রকল্প এটা সাফার করে। সরকার একটা আইন করেছে, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা যাবে না। আইনটা কিন্তু প্রয়োগ হচ্ছে না। কিন্তু আমার বেলায় এটা প্রয়োগ হয়েছে। কোনো প্রকল্পেই বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা উচিত নয়।

জাগো নিউজ: পদ্মা সেতুতে শুধু বিদেশি কোম্পানি কাজ করেনি। আমাদের অনেক দেশি কোম্পানিও কাজ করেছে। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

শফিকুল ইসলাম: আমাদের তিনটি বড় কন্ট্রাক্ট ছিল পদ্মা সেতুতে। একটা মূল সেতু, একটা নদীশাসন ও অ্যাপ্রোচ সড়ক। মেইন ব্রিজে চায়নিজ ঠিকাদার, রিভার ড্রেজিংয়েও চায়নিজ ঠিকাদার সিনোহাইড্রো। অ্যাপ্রোচ সড়কে আবদুল মোনেম লিমিটেড (এএমএল) ও মালয়েশিয়ার একটা কোম্পানি যৌথভাবে কাজ করেছে। আমাদের সক্ষমতা না থাকায়ই বিদেশি ঠিকাদার আনতে হয়েছে। তবে বিদেশি ঠিকাদারদের বলেছি তোমরা দেশি ম্যাটারিয়ালস ব্যবহার করবা। প্রকল্পে সিমেন্ট, বালি বাংলাদেশের। কিন্তু পাথর বাংলাদেশের ব্যবহার হয়নি, কারণ এই পাথর বাংলাদেশে নেই।

আরও পড়ুন: ‘ঢাকার গুলশান-বনানীতে যে শান্তি, এখানেও একই শান্তি’

পৃথিবীতে বাণিজ্য হয় কেন? আমেরিকাও কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। চায়নাও প্রচুর ইমপোর্ট করে। যার যেটা সুবিধা আছে সেটা নিয়ে কাজ করেছি। রেলের কিছু প্লেট চীন থেকে এনেছি। আবার রেলওয়ের স্ট্রেনঞ্জার লুক্সেমবার্গ থেকে এনেছি। কারণ তারা এটা ভালো বানায়। আমরা ভারত থেকেও এটা আনিনি। কারণ এটা কোয়ালিটির প্রশ্ন। প্রকল্পে ভারত থেকে বেশি পাথর এনেছি, আবার দুবাই থেকেও পাথর এনেছি।

জাগো নিউজ: পদ্মা সেতুতে হেঁটে পার হওয়া যাবে না। সাইকেল চালিয়েও পার হওয়া যাবে না। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

শফিকুল ইসলাম: নিরাপত্তার জন্য কোনোভাবেই পদ্মা সেতু দিয়ে হেঁটে বা সাইকেলে পার হওয়া যাবে না। এতে সেতুর ওপর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

জাগো নিউজ: সেতুতে মোট ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এই টাকা কতদিনে উঠবে?

শফিকুল ইসলাম: আমরা আশা করছি ২০ থেকে ২৫ বছরে টাকা উঠে আসবে। তবে এটা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। এমনও হতে পারে তার আগেই টাকা উঠে আসবে। আবার দেরিও হতে পারে। তবে ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে টাকা উঠে আসবে।

জাগো নিউজ: ব্যস্ত সময়ে জাগো নিউজকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

শফিকুল ইসলাম: জাগো নিউজকেও ধন্যবাদ।

এমওএস/এএসএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]