‘বর্জ্যের অব্যবস্থাপনায় নগরের জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:১১ পিএম, ২৪ জুন ২০২২

ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপাদিত হলেও সরকারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ ও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তার প্রায় ৩৫ শতাংশই থেকে যায় অসংগৃহীত যা বিক্ষিপ্তভাতে নিক্ষিপ্ত হয় নগরের আশেপাশের রাস্তা, খাল, বিল, জলাধার, নিম্নাঞ্চল ইত্যাদি জায়গায়।

বিক্ষিপ্তভাবে নিক্ষিপ্ত ও অসংগৃহীত এ সকল কঠিন বর্জ্য সঠিক সময়ে সঠিক উপায়ে নিষ্কাশন বা পুনর্ব্যবহারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ না নেয়ায় নগরের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে মারাতœকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে যা আমাদের পরিবেশগত সাংবিধানিক অধিকারকেও (সংবিধানের ১৮-ক অনুচ্ছেদ) ক্ষুন্ন করছে। বর্জ্যরে এ সকল অব্যবস্থাপনার নেতিবাচক প্রভাব ও ক্ষতির সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে নগরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠিরা যাদের আবাস মূলত নগরের বস্তি এলাকাগুলোতে।

বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঢাকা কলিং প্রকল্প আয়োজিত ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্রান্তিক জনগোষ্ঠির স্বাস্থ্যগত প্রভাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা এই কথা বলেন।

স্টাডি রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকা শহরে ১৯৭১ সালে যেখানে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ লাখ সেটা ২০২২ সালে এসে প্রায় সোয়া ২ কোটিতে পৌঁছেছে। ইউনিসেফের গবেষণা অনুযায়ী ঢাকার ৫ হাজারেরও বেশি বস্তিতে প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি লোক বসবাস করলেও তাদের এখনোও আমরা অন্তর্ভূক্তিমূলক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পারিনি। ফলে দীর্ঘমেয়াদে তারা শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে মারাতœক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং নগরবাসীর জনস্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

কঠিন বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট পরিবেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির মধ্যে থাকে। জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথা, চর্মরোগ, ইউরিন ইনফেকশন, প্রসাবে জ্বালাপোড়াসহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যান্সার, জন্ডিস, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড রোগের মত বিপজ্জনক রোগের বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। এ ধরণের রোগ সাধারণত অবিশুদ্ধ ও অনিরাপদ পানি খাওয়া, অনেকক্ষণ ময়লার মধ্যে থাকা ইত্যাদি কারণে হয়ে থাকে। নিম্ন আয়ের এলাকার প্রায় ৩৪ শতাংশ মানুষ নোংরা পরিবেশের কারণে এ ধরণের রোগে আক্রান্ত হন। এ সকল এলাকার প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ ময়লা পানির জন্য এবং প্রায় ১৯ শতাংশ জলাবদ্ধতার কারণে এ ধরণের রোগে আক্রান্ত হতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

স্টাডি রিপোর্টে আরোও বলা হয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাসরত এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগের ঘাটতি সুস্পষ্ট। কঠিন বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনার জন্য যে সকল কারণগুলোকে স্টাডিতে দায়ী করা হয় তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে- পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাব, উচ্চ সেবা মূল্য, পরিবেশ ধ্বংস ও দূষণের তদারকির অভাব, অপরিকল্পিত ও অপ্রতুল পয়ঃব্যবস্থা, ড্রেন ও পানি নিষ্কাশনের অভাব, সরাসরি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) ব্যবহার করতে না পারা, এসটিএস এর অব্যবস্থাপনা, অধিবাসীদের সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমের অভাব, জটিল অভিযোগ গ্রহণ এবং নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং সিটি কর্পোরেশনের অসম্পৃক্ততা।

এ সকল বিষয় সামগ্রিকভাবে শারীরিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকি যেমন- জন্মের সময় প্রতিবন্ধকতা ও প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকি, ক্রনিক ডিসঅর্ডার, ইনফেকশনস ইত্যাদি তৈরি করছে। বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি- মেজাজ খিটখিটে থাকা, অকারনে রেগে যাওয়া, মানসিক চাপ, হতাশা ও আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, মনঃসংযোগহীনতা ও মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদিতে প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া, বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা সামাজিক ও আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আর্থিকভাবে নগরবাসীর চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আয় হ্রাস পাচ্ছে বলে গবেষণায় দেখা হয়েছে।

স্টাডি রিপোর্টের উপর মতামত দিতে গিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, এই গবেষণা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে আরোও ব্যাপক গবেষণার পথকে উন্মোচিত করেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ রাখা উচিত। মিথেন গ্যাস নিঃসরণের মাধ্যমে বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখছে। বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা একটি চক্রের মাধ্যমে খাদ্যপ্রণালী হয়ে আমাদের শরীরেও ঢুকে যাচ্ছে। অসংক্রামক ব্যাধি সেই চক্রের মাধ্যমে সংক্রামক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে একটি রাষ্ট্রের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ জনস্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত হলেও আমরা রাখছি ০১ শতাংশেরও কম।

নগর দরিদ্র বস্তিবাসীর সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা আক্তার বলেন, নিম্ন আয়ের জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা গড়ে তুলতে না পারলে তা সমস্ত নগরবাসীর স্বাস্থ্যকেই হুমকির মুখে ফেলবে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান জনাব আবু নাসের খান বলেন, এই স্টাডির নিবিড় পর্যবেক্ষণসমূহ কাজে লাগিয়ে একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ গঠনে কিভাবে কঠিন বর্জ্যরে একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে যায় সেটা আমরা কাজে লাগাতে পারি।

সংবাদ সম্মেলনটি ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে কাউন্টারপার্ট ইন্টারন্যাশনালের কারিগরি সহযোগিতায় প্রমোটিং এ্যাডভোকেসি এন্ড রাইটস প্রকল্পে আওতায় ঢাকা কলিং প্রকল্পের অধীনে আয়োজন করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে), বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক), কোয়ালিশন ফর দ্যা আরবান পুওর (কাপ) এবং ইনসাইটস এর সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন, সানজিদা জাহান আশরাফী, কনসোর্টিয়াম কো-অর্ডিনেটর, ডিএসকে এবং সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন খোন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত, নির্বাহী পরিচালক, কোয়ালিশন ফর দ্যা আরবান পুওর (কাপ) এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জনাব এমএহাকিম, পরিচালক-ওয়াশ, ডিএসকে। তাছাড়া, সম্মেলনে আরোও উপস্থিত ছিলেন কাউন্টাপার্ট ইন্টারন্যাশনালের টিফ অব পার্টি জনাব মাইনউদ্দিন আহমেদ।

আইএইচআর/জেএইচ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]