লুৎফর হত্যার তদন্তে স্থবিরতা: স্বজনরা হতাশ

রাসেল মাহমুদ
রাসেল মাহমুদ রাসেল মাহমুদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৫১ পিএম, ০২ জুলাই ২০২২
গোপীবাগে সিক্স মার্ডারের ঘটনায় নিহত লুৎফরের সংগৃহীত স্কেচ

‘ঘটনাটা যখন ঘটেছে আমাদের পরিবারের হর্তাকর্তা সবই ছিলেন আমার বাবা এবং তারপর বড় ভাই। এতে করে বাকি চারজন ভয়ে ছিল। পুরো পরিবারটা মূলত ধ্বংস হয়ে যায়। তার পরে যে পরিস্থিতি ও শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেটা পূরণ হয়নি। পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক কোনো দিক থেকেই সেটি পূরণ হয়নি।

একটা মানুষকে হত্যা করা হলো, তার ফলে শাস্তি যা-ই হয় সেটি হয়তো তার শূন্যতাকে পূরণ করে না কিন্তু মানসিক একটু প্রশান্তি থাকে যে আমি বিচার পেয়েছি। এই আশাটা প্রত্যেকেই করে। একটা সময় ছিল আমার বাবার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এমন কোনো সংস্থা নেই যে কাজ করেনি। তখন তারা যেটা বলতো হত্যাকাণ্ডটি ক্লুলেস (সূত্রহীন)। এখন যেটা বলছে এ ঘটনার প্রথম দিকে হলে রহস্যটা বের করা যেত। এসব কথা শুনে এখন আমরা আমাদের জায়গা থেকে খুবই হতাশ। বিচার পাবো এই আশাটা ভুলেই গেছি। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের জন্য বিচার নেই। প্রথমদিকে যে আশাটা ছিল পরে সেটা কমে গেছে। ছয়টা মানুষকে মারা হয়েছে এর মধ্যে পাঁচটা পরিবার একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে হতাশা ছাড়া আর কিছু নেই।’

কথাগুলো বলছিলেন প্রায় আট বছর আগে ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় গোপীবাগে লুৎফর রহমানসহ ছয়জনকে গলা কেটে হত্যা করা মামলার বাদী সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া লুৎফরের ছেলে আব্দুল্লাহ আল ফারুক।

মামলার তদন্ত সূত্রে জানা যায়, সূত্রহীন এই মামলা প্রথমে তদন্ত করে ওয়ারী থানার পুলিশ। তখন পুলিশ এই মামলায় সন্দেহভাজন চারজনকে গ্রেফতার করলেও তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পায়নি। ২০১৫ সালের অক্টোবরে ডিবির পূর্ব বিভাগে মামলাটি স্থানান্তর করা হয়। ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর বাড্ডায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান কথিত আরেক পির খিজির হায়াত খান হত্যা মামলায় গ্রেফতার তরিকুল ইসলামের কাছ থেকে ছয় খুন সম্পর্কে তথ্য পায় ডিবি। ফলে ছয় খুন মামলায় তরিকুলকে তারা গ্রেফতার দেখায়। এরপর থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের হাত ঘুরে মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের সন্ত্রাস ধমনে বিশেষ অভিযান চালানো ইউনিট সিটিটিসি। এ পর্যন্ত শতাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নিয়েছে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমও তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আলোচিত এ হত্যা মামলার এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে ঘাতকদের চিহ্নিত করতে পারেনি। ফলে এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম কবে শুরু হবে তা বলতে পারছে না বাদী ও তদন্তকারী কেউই। অনেকটা স্থবির হয়েই পড়ে আছে সূত্রহীন আলোচিত এই হত্যা মামলাটি।

মামলার তদন্ত সূত্রে জানা যায়, লুৎফর রহমানসহ ছয়জনকে গলা কেটে হত্যা করার ধরন সেই সময়ে জেএমবি সদস্যরা যেসব হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। দীর্ঘ প্রায় চার বছরে পুলিশ শুধু নিশ্চিত হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি জড়িত ছিল। ফলে যাদের সন্দেহ করা হয়েছে তাদের অনেকে জেএমবির সদস্য এবং অন্য মামলায় গ্রেফতার রয়েছে। কেউ কেউ বিভিন্ন অভিযান কিংবা স্বাভাবিকভাবে আবার মারাও গেছে।

সিটিটিসির তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার আগে সন্দেহভাজন ৯ জন আসামিকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে আরও দুজন সন্দেহভাজন আসামিকে গ্রেফতার দেখায় সিটিটিসি। এতে ১১ জন আসামিকে এখন পর্যন্ত এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। যাদের সবাই অন্য মামলায় গ্রেফতার রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোনো সূত্র না থাকায় এখনও এগোয়নি মামলার তদন্তকাজ। তবে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, নতুন করে একজনকে নজরদারিতে রেখেছেন তারা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিটিটিসির ইন্সপেক্টর সোহরাব হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘তদন্ত যদিও ধীরগতিতে চলছে শেষ মুহূর্তে কিছু আসামির নাম পেয়েছি যারা এ মামলার সঙ্গে জড়িত বলে আমরা সন্দেহ প্রকাশ করছি। একজনকে টার্গেট করেই আমরা এগোচ্ছি। অচিরেই তাকে গ্রেফতার করে মামলার আসল রহস্য উদ্ঘাটন করতে সমর্থ হবো। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টা জানার সম্ভাবনা আছে। তখন তদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিষয়টা হয়তো চলে আসবে। যদি পেয়ে যায় তবে মামলা দ্রুতই শেষ করতে পারবো আশা করছি।’

২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় গোপীবাগের ৬৪/৬ নম্বর বাড়িতে ইমাম মাহাদীর প্রধান সেনাপতি বলে দাবি করা লুৎফর রহমানসহ ছয়জনকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যার শিকার অন্যরা হলেন লুৎফরের বড় ছেলে সারোয়ার ইসলাম, লুৎফরের অনুসারী মঞ্জুর আলম, মো. শাহিন, মো. রাসেল ও মজিবর সরকার।

সেই ঘটনায় বাদী হয়ে রাজধানীর ওয়ারী থানায় ১০-১২ জন অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করেন লুৎফরের ছেলে আব্দুল্লাহ আল ফারুক।

আরএসএম/এসএইচএস/জেআইএম

তদন্ত যদিও ধীরগতিতে চলছে, শেষ মুহূর্তে কিছু আসামির নাম পেয়েছি যারা এই মামলার সঙ্গে জড়িত বলে আমরা সন্দেহ প্রকাশ করছি। একজনকে টার্গেট করেই আমরা এগোচ্ছি। অচিরেই তাকে গ্রেফতার করে মামলার আসল রহস্য উদ্ঘাটন করতে সমর্থ হবো। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টা জানার সম্ভাবনা আছে। তখন তদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিষয়টা হয়তো চলে আসবে।

এসব কথা শুনে এখন আমরা আমাদের জায়গা থেকে খুবই হতাশ। বিচার পাবো এই আশাটা ভুলেই গেছি। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের জন্য বিচার নেই। প্রথমদিকে যে আশাটা ছিল পরে সেটা কমে গেছে। ছয়টা মানুষকে মারা হয়েছে এর মধ্যে পাঁচটা পরিবার একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে হতাশা ছাড়া আর কিছু নেই।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]