যুগপূর্তি ঘিরে নানা কর্মযজ্ঞ নৌকাবাইচ সংগঠনের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:২৮ পিএম, ০৩ জুলাই ২০২২

নৌকাবাইচ বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে মিশে আছে ওতপ্রোতভাবে। কয়েক বছর আগেও নৌকাবাইচ ঘিরে গ্রামগঞ্জে উৎসবের আমেজ বিরাজ করতো। ঘরে ঘরে পিঠা-পুলির আয়োজন হতো। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসতো। এরইমধ্যে চলতো নৌকাবাইচ উৎসব।

কিন্তু দেশের বিভিন্ন নদ-নদী দিন দিন ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ভরাট হওয়া, নাব্য সংকট এবং নৌপথ ব্যবস্থার অবনতির ফলে প্রাচীন এ ঐতিহ্য বাঙালি সংস্কৃতি থেকে হারাতে বসেছে। এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতেই এবার এগিয়ে এসেছে একদল উদ্যমী নৌকাবাইচপ্রেমী। ২০১০ সালে ২০ জুলাই গঠন করা হয়েছে ‘নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটি’। চলতি মাসের ২০ জুলাই সংগঠনটি যুগপূর্তি উদযাপন করবে।

আগামী ভাদ্র মাসে আয়োজন করা হবে যুগপূর্তির নৌকাবাইচ। এ সংগঠনের কর্মকর্তা নিবেশ চকিদার বড় একটি নৌকা বানাচ্ছেন। এবারের বাইচে এলাকাবাসী দেখতে পাবেন তার নতুন এ নৌকা। এছাড়া পুরোনো নৌকাগুলোতেও আঁকছেন বিভিন্ন চিত্রকর্ম।

কথা হয় সংগঠনের সভাপতি মাসুদ মোল্লার সঙ্গে। তিনি বলেন, ২০১০ সালে নৌকাবাইচ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লার পরামর্শে এ সংগঠন হয়। ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে প্রায় একশ বছর আগ থেকে ইছামতি, কালিগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর বিভন্ন পয়েন্টে মাসব্যাপী নৌকাবাইচ হতো। ২০০১ সালের দিকে কাশিয়াখালী ইছামতী নদীর মুখে বেড়িবাঁধ দেওয়া হয়। নদীতে পানির সংকট দেখা দেয়। চর পড়ে যায় নদীতে। নদীর মতো ভাটা পড়ে নৌকাবাইচেরও। এ কারণে এলাকার নৌকাগুলোও বিক্রি করে দেওয়া হয়।

তিনি জানান, ৩১ মার্চ মুজিব জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশ রোইং ফেডারেশন হাতিরঝিলে আয়োজন করে বঙ্গবন্ধু কাপ আন্তর্জাতিক নৌকাবাইচ। বাইচে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় দুটি ইভেন্ট ছিল। জাতীয় ইভেন্টে অংশ নেয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লার নবাবগঞ্জ রোইং ক্লাব। আন্তর্জাতিক ইভেন্টেও বাংলাদেশ টিমের সাদা দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। দুই ইভেন্টেই জয় লাভ করে।

সূত্র জানায়, এ সংগঠনের কার্যক্রম এখন রাজধানী ঢাকা, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়। এসব জেলার বিভিন্ন নদীতে নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির নেতাদের নৌকা অংশ নেয়।

হারানো নৌকাবাইচ ঐতিহ্য ফেরাতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা ২০১৯ সালে রাজধানীর বুড়িগঙ্গায় নৌকাবাইচ আয়োজন করতে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইদুল মাদবরকে আহ্বান জানান। তখন কাউন্সিলর তার আহ্বানে আয়োজন করেন নৌকাবাইচ। ওই বাইচে সংগঠনের ৮ থেকে ১০টি নৌকা অংশ নেয়।

২০২১ সালে বিআইডব্লিউটিএ আয়োজিত নৌকাবাইচে সহায়তা করে নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা কমিটি। এতে অংশ নেয় সংগঠনের ৭টি নৌকা।

সবশেষ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন আয়োজিত নৌকাবাইচে পদ্মা পাড়ি দিয়ে অংশ নিয়েছে সংগঠনের ৬টি নৌকা। নৌকাগুলো হলো- বলধারার ঐতিহ্য, সোনার তরী, হাতনীর রাজ, মামা ভাগ্নে, সোনার বাংলা ও লিটন এক্সপ্রেস।

নৌকাবাইচ শুরুর ইতিহাস:
নৌকাবাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অংশ। বাংলা ও বাঙালির শিরা-উপশিরায় মিশে আছে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য। দীর্ঘদিন ধরে এ ঐতিহ্য নিজেদের মধ্যে লালন করে আসছে। এক সময় এ দেশের মানুষের অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম ছিল এটি। পাশ্চাত্যে ও আধুনিকতার প্রভাবে হারাতে বসেছে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।

কথিত আছে, জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রায় বহু নৌকার ছড়াছড়ি পড়ে যেতো। এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পান। এ থেকে কালক্রমে নৌকাবাইচ শুরু। আবার অনেকে মনে করেন, ১৮ শতকের শুরুর দিকে কোনো এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ে থাকা তার ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোনো নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝনদীতে এলো তখনই নদীতে তোলপাড় শুরু। নদী ফুলেফেঁপে উঠলো। তখন চারপাশে যত নৌকা ছিল তারা খবর পেয়ে ছুটে আসে। সারি সারি নৌকা একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। অনেকের মতে, এ থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন।

এছাড়া মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকাবাইচ ছিল বেশ জনপ্রিয়। অনেকে মনে করেন, নবাব বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন।

এফএইচ/এমআইএইচএস/এমকেআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]il.com