গ্যাস উত্তোলন প্রসঙ্গে ভিন্নমত বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৫৬ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২২

দেশীয় গ্যাসের অপ্রতুলতা ও আমদানিনির্ভরতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল বা নীতি নির্ধারকদের জনগণের সঙ্গে আরেকটু দায়িত্বশীল হয়ে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম।

তিনি বলেছেন, উপর মহল বা নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে অনেকেই বলেন, দেশে গ্যাস নেই। যেটুকু আছে তা উত্তোলনের জন্য যথেষ্ট নয়। বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করেই চলতে হবে। জনগণের সামনে এসব কথা বলার আগে আরেকটু দায়িত্বশীল হতে হবে।

বুধবার (১৭ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন আয়োজিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট : নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।

গত ৯ আগস্ট এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক ইলাহি বলেন, মাটির নিচে গ্যাস পেলেই উচ্ছ্বসিত হওয়া যাবে না। মিয়ানমার গত ১০ বছরে গ্যাস পায়নি। আপাতত এলএনজিই ভরসা।

তার এমন বক্তব্যের ঠিক কদিন পরই গত ১৪ আগস্ট বিদ্যুৎ ভবনে এক আলোচনায় সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিশেষজ্ঞদের উদ্দেশে বলেন, অনেক বিশেষজ্ঞ হুটহাট কথা বলেন। আমরা গ্যাস উত্তোলনে যাবো। কিন্তু এখন যে অবস্থায় আছি সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। গ্যাস থাকলেই তো উত্তোলন করা যাবে না।

প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের সময় অনুষ্ঠানে অধ্যাপক বদরুল ইমাম, ক্যাব উপদেষ্টা শামসুল আলম ও অ্যানার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সম্পাদক মোল্লা আমজাদসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানের শুরুতে নিজেদের গ্যাস উত্তোলনের প্রতি জোর দেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রেস ক্লাবে সুজন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিদ্যুৎ ভবনের সেই বৈঠকে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বদরুল ইমাম বলেন, সরকারি নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অনেকেই বলেন, ‘মিয়ানমার গত ১০ বছরে গ্যাস পায়নি। যা পাওয়ার অনেক আগে পেয়েছে।’ কিন্তু একথা অসত্য, মিয়ানমার গত দু-তিন বছর আগেও গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কেউ যদি বলে আমাদের সমুদ্রের অবস্থা আমরা জানি না। এটা ভুল কথা। আমাদের রিজার্ভ ও রিসোর্স নিয়ে অনেক গবেষণা আছে। উপর মহল বা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অনেকে বলেন, বাংলাদেশে গ্যাস নেই। তারা জিয়োলোজিস্টের উদাহরণ দিয়ে বলেন, মাটির নিচে গ্যাস নেই। তবে এটা বলা উচিত না। তারচেয়ে বরং বাংলাদেশের অনাবিষ্কৃত বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাসিসমেন্ট দেখে তাদের কথা বলা উচিত।

গোলটেবিল বৈঠকে বদরুল ইমামের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পাওয়ার অ্যান্ড অ্যানার্জি সম্পাদক মোল্লা আমজাদ বলেন, আপনারা যারা বিশেষজ্ঞ আছেন, তারা অনেক সময় মিডিয়াকে একটা বিতর্কের উপকরণ তৈরি করে দেন। এই মাসে দুটি অনুষ্ঠানে ‘গ্যাস নেই, এলএনজিই ভরসা’- এ ধরনের বক্তব্য এসেছে। আমরা যারা মিডিয়ার সঙ্গে আছি, আপনাদের কাছে বক্তব্যের বাইরেও আরও কিছু প্রত্যাশা করি। এ ধরনের বক্তব্যের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিলে ভালো।

এসময় নিজের নির্ধারিত বিষয়ের ওপর মোল্লা আমজাদ বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ না হলেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে পারতো। সরকারের উচিত প্রতি বছর বাজেটে এক বিলিয়ন ডলার বাজেট করে অন্তত ১০টি কুপ খনন করা। আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘণফুটে নেমে আসবে। কিন্তু চাহিদা হবে তখন ৩ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তখন এলএনজি আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। তবে তার আগেই আমাদের গ্যাস উত্তোলনে মনোযোগী হতে হবে।

এসময় বদরুল ইমাম বলেন, এলএনজির বর্তমান দাম নিয়েই তো আমাদের চাপে পড়তে হচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতে তো এ দাম আরও বাড়বে। তখন এলএনজি কেনাও সক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। প্রাকৃতিক গ্যাসেরও অনেক সংকট হতে পারে। তাই আমাদের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনায় যেতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের ত্রিপুরা রাজ্যের আয়তন মাত্র ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। তারা কূপ খনন করেছে ১৭০টি। অথচ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের দেশে কূপ খননের সংখ্যা মাত্র ৯৮টি।

মিয়ানমার পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না, এ প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাগরে ২৬টি গ্যাসক্ষেত্র আছে। অথচ আমরা এখনো উত্তোলনে যেতে পারিনি। অন্যদিকে মিয়ানমার শিগগির সাগরে গ্যাস উত্তোলন শুরু করতে পারে। বঙ্গবন্ধু আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন কীভাবে নিজেদের সম্পদ নিজেরাই উত্তোলন করবো। কিন্তু আমরা জাতির পিতার নীতি থেকে সরে এসেছি।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকি। এছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন পর্যায়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সুজন নেতারা।

এমআইএস/এমকেআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।