মধুমতির পানিতে বদলে গেছে খুলনা শহরের জনজীবন

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৩ এএম, ১৯ আগস্ট ২০২২

খুলনা মহানগরের সুপেয় পানির সংকট নিরসন করছে গোপালগঞ্জের মধুমতি নদী। মধুমতির পানি এনে পরিশোধন করা হচ্ছে রূপসার সামন্তসেনায়। ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প’র আওতায় রূপসার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে চলছে এ পরিশোধন কার্যক্রম। সেই পানি সরবরাহ হচ্ছে পাইপলাইনের মাধ্যমে। এতে বদলে গেছে খুলনার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। বহুলাংশে দূর হয়েছে ১৫ লাখ মানুষের শহরের দীর্ঘদিনের বিশুদ্ধ পানির সংকট।

পরিশোধন প্রক্রিয়া ও সরবরাহ ব্যবস্থা বেশ ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হলেও কাজটি সহজ করেছে যৌথ অর্থায়নের এ প্রকল্প। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়ন হয়েছে ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প’।

দেশের অন্য নগর-মহানগরের মতো খুলনায়ও সুপেয় পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাড়ার বিপরীতে কমছে ভূগর্ভস্থ পানি। ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যাপক লবণাক্ততা মোকাবিলায় বিকল্প উৎস হিসেবে ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহার নিশ্চিত করছে এ প্রকল্প। এতে শহরের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে পান উপযোগী বিশুদ্ধ পানি। তবে ভূ-পৃষ্ঠের পানির উৎসে রূপান্তরের জন্য নানা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রকল্পের রূপান্তরমূলক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে, এমনটিই জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

khulna-(2)

খুলনা ওয়াসা জানায়, মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। বাড়ছে সমুদ্রের জলরাশির উচ্চতা। উপকূলবর্তী এলাকাগুলো লবণাক্ত পানির ঝুঁকিতে পড়ছে। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অভিযোজন সংশ্লিষ্ট নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন উপকূলের জনপদ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল খুলনাও এ সমস্যার বাইরে নয়। কারণ, খুলনা শহরের সুপেয় পানি সরবরাহের সংকট ছিল দীর্ঘদিনের।

এডিবি, জাইকা ও সরকারের যৌথ অর্থায়নে ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প’র আওতায় একটি টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে খুলনা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়ারেজ অথরিটি (কেওয়াসা)।

বর্তমানে খুলনা শহরের ১৫ লাখ মানুষের প্রতিদিন গড় পানির চাহিদা ২৪ কোটি লিটার। এ চাহিদা পূরণে খুলনা ওয়াসা ভূ-গর্ভস্থ স্তর থেকে উত্তোলিত মাত্র ১১ কোটি লিটার পানি সরবরাহে সক্ষম। এর মধ্যে ছয় কোটি লিটার গভীর নলকূপ ও পাঁচ কোটি লিটার পানি চাপকলের মাধ্যমে উত্তোলন এবং সরবরাহ হয়। এটি মোট চাহিদার মাত্র ৪৫ শতাংশ। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ার কারণে পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও শিল্পবর্জ্যের আধিক্যের কারণে ভৈরব এবং রূপসার পানি পরিশোধন উপযোগী নয়। এজন্য একটি টেকসই পানি সরবরাহ পদ্ধতি স্থাপন খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে নগরবাসীর জন্য। বাস্তবায়িত এ প্রকল্প জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে লবণাক্ততা বৃদ্ধির আওতামুক্ত থেকে খুলনা শহরে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থায়ীভাবে পানি সরবরাহে সক্ষম। প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে শহরের ১৫ লাখ মানুষের মধ্যে ১১ লাখ মানুষই এখন সুপেয় পানি পাচ্ছে।

khulna-(2)

খুলনা শহর থেকে ৭১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মধুমতি নদী থেকে পানি সংগ্রহের পর তা পরিশোধনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পুরো প্রকল্পের আওতায় মধুমতি নদী থেকে ৩৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট পাইপের মাধ্যমে অপরিশোধিত পানি সামন্তসেনা এলাকায় পরিশোধন করা হচ্ছে। সেখানে গড়ে দৈনিক ১১ কোটি লিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শোধনাগারের পাশাপাশি অপরিশোধিত পানি সংরক্ষণের জন্য ৭ লাখ ৭৫ হাজার কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি জলাধার নির্মাণ করা হয়। শুষ্ক মৌসুমে এক থেকে দুই সপ্তাহ ধরে মধুমতির পানি কিছুটা লবণাক্ত হয়ে পড়ে। ওই সময় জলাধারের পানি পরিশোধন করে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করা হয়। প্রকল্পের এ অংশটি বাস্তবায়িত হয় জাইকার অর্থায়নে।

খুলনা ওয়াসা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ্, পি.ইঞ্জ জাগো নিউজকে বলেন, একসময় খুলনাবাসী সুপেয় পানির কষ্টে ছিল। কিন্তু খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সে কষ্ট দূর হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে শহরে মাত্র ১৩ হাজার হোল্ডিংয়ে পানি সরবরাহ করা হতো। এটি বাস্তবায়নের পর নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মাণও শুরু হয়েছে। শহরে নির্মাণ করা হয়েছে ৭শ কিলোমিটার পাইপলাইন। এখন ৪০ হাজার হোল্ডিংয়ে মধুমতি নদীর পানি সংশোধন করে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় শহরের ১৫ লাখ মানুষের মধ্যে ১১ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে পরিশোধিত পানি। খুলনা শহরে পানি সরবরাহে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। লাঘব হয়েছে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট।

khulna-(2)

খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় নারীদের নেতৃত্বে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার নিম্নআয়ের পরিবারকে নতুন করে পানির সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ওয়াসার এ কর্মকর্তা।

২০১১ সালের ২১ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প’ অনুমোদন পায়। এর মধ্যে জাইকার ঋণ এক হাজার ১২৬ কোটি এবং এডিবির ৫২১ কোটি টাকা। বাকি টাকা বহন করেছে সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে খুলনা শহরে ১১ কোটি লিটার পানি সরবরাহ বেড়ে যায়। সে হিসাবে দৈনিক খুলনা ওয়াসা নগরীতে প্রায় ২১ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করছে, যা নগরবাসীর মোট চাহিদার ৮৮ শতাংশ। মধুমতি মেটাচ্ছে প্রায় ৫৩ শতাংশ চাহিদা।

প্রকল্পে যা রয়েছে
এ প্রকল্পের আওতায় গোপালগঞ্জের মধুমতি নদী থেকে পানি এনে রূপসার সামন্তসেনায় পরিশোধন করা হচ্ছে। এজন্য মোল্লাহাটে মধুমতি নদীর কাছে একটি ইনটেক পয়েন্ট নির্মাণ এবং মোল্লাহাট থেকে সামন্তসেনা পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার পাইপলাইন বসাতে হয়। এতে নগরবাসীর জন্য তিন মাসের পানি মজুত থাকবে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন স্থানে ১১টি উচ্চ জলাধার, সাতটি আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার, পরিশোধন হওয়া পানি নগরীতে সরবরাহের জন্য ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও বিভিন্ন ব্যাসার্ধের ৭৫০ কিলোমিটার পানির সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণ এবং মিটারসহ ৭৫ হাজার গৃহসংযোগ দেওয়া হয়। পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের জুন মাসে।

khulna-(2)

এ বিষয়ে খুলনা সিটি করপোরেশেনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক জাগো নিউজকে বলেন, যেহেতু খুলনা একটি লবণাক্ত পানির অঞ্চল, ফলে এখানে পর্যাপ্ত নিরাপদ ও সুপেয় পানি ছিল না। গভীর নলকূপই ছিল বিশুদ্ধ পানির একমাত্র উৎস। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও নগরবাসী পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পাচ্ছেন না।

‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প’ প্রসঙ্গে ঢাকায় এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর এডিমন গিনটিং জাগো নিউজকে বলেন, শহরকে বসবাস উপযোগী করতে মৌলিক অবকাঠামো হলো নিরাপদ পানি সরবরাহ। আমরা খুলনা শহরে পানিবণ্টন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি একটি জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করছি।

এমওএস/এমকেআর/এএসএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।