স্পষ্টবাদী-বিবেকবান-সজ্জন মাহবুব তালুকদারের চিরবিদায়

সিরাজুজ্জামান
সিরাজুজ্জামান সিরাজুজ্জামান , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫৭ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০২২
মাহবুব তালুকদার/ফাইল ছবি

দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। অথচ নিয়োগপ্রাপ্ত কমিশনাররা সরকারের ‘আজ্ঞাবহ’ বলে অভিযোগ ওঠে হরহামেশা। যত প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনই হোক, তা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বলে বক্তব্য-বিবৃতি দিতেই সাম্প্রতিক সময়ের কমিশনাররা অভ্যস্ত। তবে নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম এবং স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আলোচনায় ছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। প্রায়ই তিনি অন্য কমিশনারদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেন। দিতেন নোট অব ডিসেন্টও। এমন অবস্থানের কারণে অনেকেই তাকে ‘স্পষ্টবাদী’ ও ‘বিবেকবান’ বলেও প্রশংসা করতেন।

কর্মজীবনে মাহবুব তালুকদার ছিলেন দক্ষ আমলা। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। কবি ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। ২০১২ সালে শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ অর্জন করেন। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কমিশনার নিয়োগ পান।

কমিশনারের দায়িত্ব থেকে মাহবুব তালুকদার সাবেক হয়েছেন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি। এরপর তিনি খুব বেশি জনসমক্ষে আসেননি। দায়িত্ব শেষ করার পর প্রায় ছয় মাসের অধিকাংশ সময়ই অসুস্থতায় কেটেছে মাহবুব তালুকদারের। বুধবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার। তার মৃত্যুতে একজন সজ্জন, স্পষ্টবাদী, বিবেকবান মানুষের চিরবিদায় হলো বলে জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্টজনরা।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘একজন বিবেকবান ব্যক্তির চিরপ্রস্থান। তিনি বক্তব্য, বিবৃতি ও দ্বিমত জানিয়ে ইসি গরম রাখতেন। আজ মাহবুব তালুকদার হিমঘরে। আমরা সত্যিই একজন বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্বকে হারালাম।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাহবুব তালুকদার গত নির্বাচন কমিশন ও দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে অনেক সমালোচনা করেছেন, যা আমাদের কাছে গণতান্ত্রিক চর্চা বলেই মনে হয়েছে। এখন এ ধরনের কোনো কমিশনার দেখছি না।’

jagonews24

মাহবুব তালুকদার যে কমিশনের কমিশনার ছিলেন, সেই সময়ে ইসির সচিব ছিলেন মো. আলমগীর। তিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার। মো. আলমগীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্যার অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় নানা সমালোচনা করলেও ব্যক্তিগতভাবে কারও সঙ্গে কোনো শক্রতা ছিল না।’

মাহবুব তালুকদারের মৃত্যুতে শোকবার্তা দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মাহবুব তালুকদার এমন একজন বিবেকবান মানুষ ছিলেন, যার কল্যাণে নির্বাচন কমিশনার থাকাকালীন দেশের নির্বাচনে প্রাতিষ্ঠানিক অনেক ফাঁকফোকরের কথা দেশবাসী জানতে পেরেছিলেন। দেশের চলমান নির্বাচনী ব্যবস্থার গলদ এখন সবার কাছে স্পষ্ট। আমি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘মাহবুব তালুকদার ছিলেন একজন আদর্শ মানুষ। বিগত নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার হিসেবে তিনি অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছেন।’

এদিকে, মাহবুব তালুকদারের মৃত্যুতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। পৃথক শোকবার্তায় শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনাও জানানো হয়।

মাহবুব তালুকদারের আলোচিত যত মন্তব্য
দায়িত্বে থাকাকালীন নির্বাচন ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতেন মাহবুব তালুকদার। তার অনেক বক্তব্য দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়েছে। মাহবুব তালুকদারের আলোচিত বক্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দেশে গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্রের লাশ পড়ে আছে’। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে তিনি এমন কথা বলেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে ওই নির্বাচনে গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্রের লাশ পড়ে আছে। এ লাশ সৎকারের দায়িত্ব কে নেবে?’

এছাড়া ‘নির্বাচন এখন কতিপয় জটিল অসুখে আক্রান্ত’, ‘এখন ভোটযুদ্ধে যুদ্ধ আছে কিন্তু ভোট নেই’, ‘নির্বাচন আইসিইউতে, গণতন্ত্র লাইফ সাপোর্টে’, ‘জাতীয় নির্বাচনে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও সন্ত্রাসের ঘটনায় আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’, ‘নির্বাচন ও সন্ত্রাস একসঙ্গে চলতে পারে না’সহ অসংখ্য মন্তব্য করেছেন, যা আলোচিত।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘এ নির্বাচনে আমরা গ্লানি ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনি। ওই নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।’

jagonews24

মাহবুব তালুকদারের এসব বক্তব্যে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা ও অন্য কমিশনাররা চরম নাখোশ ছিলেন। কখনো কখনো তারা পাল্টা বক্তব্যও দিয়েছেন। সিইসি নূরুল হুদা মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যের জেরে বলেছিলেন, ‘বর্তমান কমিশনকে হেয়, অপদস্ত করার জন্য নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার যা যা করা দরকার সবই করছেন। ব্যক্তিস্বার্থে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কমিশনকে হেয় করে চলেছেন তিনি।’

বঙ্গবন্ধুর সহকারী প্রেস সচিব ছিলেন মাহবুব তালুকদার

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব তালুকদার। তিনি মুজিবনগর সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে চাকরিতে যোগ দেন। পরে মাহবুব তালুকদার সরকারি চাকরির ধারাবাহিকতায় বঙ্গভবনে পাঁচ বছর অবস্থানকালে বিভিন্ন পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বিশেষ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহর জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণের পর তিনি মাহবুব তালুকদারকে ডেকে নিয়ে নিজেরে সহকারী প্রেস সচিবের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্মরণ করতেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে অঝোরে কেঁদেছেন মাহবুব তালুকদার। এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওইদিনই তিনি আমাকে ডেকে বলেন, মাহবুব তুমি আমার সঙ্গে থাকবা। আমাকে রাষ্ট্রপতির সহকারী প্রেস সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।’

১৯৪২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় জন্ম মাহবুব তালুকদারের। নবাবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।

দৈনিক ইত্তেফাকে সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা মাহবুব তালুকদার দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। তিনি তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেন।

মাহবুব তালুকদার শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৯ সালে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন গঠিত পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কাছে শপথ নেন মাহবুব তালুকদার।

বারডেমে মরদেহ, ছেলেরা ফিরলে সিদ্ধান্ত

মাহবুব তালুকদারের মরদেহ বর্তমানে রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। বুধবার (২৪ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে তার মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি বারডেমের উদ্দেশ্যে রওনা করে। বারডেমে পৌঁছানোর পর প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ সেখানে রাখা হয়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মাহবুব তালুকদারের দুই ছেলের মধ্যে একজন কানাডায় এবং অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তারা দেশে ফিরলে মরহুমের জানাজার নামাজ, দাফনসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এইচএস/এএএইচ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।