আড়ালেই থেকে গেলো তিস্তা

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:১৯ পিএম, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

চারদিনের সফর শেষে আজ দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও একান্ত বৈঠকের মধ্য দিয়ে এই সফরে বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক সমাধানের বিষয় ছিল এবারে আলোচ্য বিষয়। দেশ দুটির জাতীয় নির্বাচনের আগে এই সফর বিশেষ নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদেরও।

কিন্তু এবারও অধরা থেকে গেলো তিস্তা। যে অনিশ্চিয়তার ঘোরে আটকা বাংলাদেশের প্রাণের দাবি তিস্তা চুক্তি, তা আড়ালেই থেকে গেলো। প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে তিস্তা ইস্যু নিয়ে যেটুকু আলোচনা হলো, তা আগের আলোচনার পুনরাবৃত্তি মাত্র।

কেন বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছে জনগুরুত্বপূর্ণ তিস্তা ইস্যু, কী আছে তিস্তার ভাগ্যে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে করণীয় কী, তা নিয়ে মতামত গ্রহণ করা হয় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এম শাহিদুজ্জামান ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের।

তিস্তা চুক্তি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন অধ্যাপক ড. এম শাহিদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘তিস্তা চুক্তি ভারত কখনই করবে না। কারণ সিকিম থেকে শুরু করে একেবারে বাংলাদেশ সীমানা পর্যন্ত তিস্তার যে স্বাভাবিক প্রবাহ, তাতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে ভারত। এটি আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। সিকিম থেকেই পানির একটি বড় অংশ চলে যায় ইরি চাষের কাজে। আরেকটি অংশ যায় রাবার চাষ এবং আন্তঃরাজ্য সংযোগ প্রকল্পে। তিস্তার পানি বিহারেও পাঠানো হচ্ছে। আবার আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে গঙ্গায়।

বাংলাদেশ সীমানার কাছে পশ্চিমবঙ্গে গজলডোবায় যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সেখানেও আন্তর্জাতিক আইনের পুরোপুরি লঙ্ঘন করে তিস্তার পানি ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা দেখা যায়। ‘তিস্তায় পানি নেই, দেব কীভাবে’ বলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়ে আসছেন, তা মিথ্যা। আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার এবং দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার উভয়ই নদী আইন চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। ’

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে করণীয় প্রসঙ্গে এই বিশ্লেষক বলেন, ‘বিষয়টি বাংলাদেশ ভারতকে সরাসরি বলছেই না। ভারতকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা উচিত যে, আপনারা তিস্তার ওপর যতগুলো বাঁধ তৈরি করেছেন, তা সরিয়ে ফেলেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তা বলতে পারছে না।’

‘আমরা তিস্তায় যেটুকু পানি আশা করি, তা পেতে হলে ভারতকে অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তিস্তার পানি ব্যবহার করা হলে ক্ষতি ছিল না। কারণ তখন পানির প্রবাহটা ঠিক থাকতো। যেহেতু নদীর পানি সরিয়ে অন্যত্র সেচ কাজে ব্যবহার করছে সেহেতু বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিস্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর আগে থেকে চীন বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়ে আসছে তিস্তায় অতিরিক্ত জলাধার তৈরি করে পানি সংরক্ষণ করার। চীন বারবার এটি করে দিতে চাইছে এবং দেশটির এ বিষয়ে বড় অভিজ্ঞতা রয়েছে। চীন দায়িত্ব পেলে ভারত নাখোশ হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পা হলে নাকি ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারতের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। যতটুকু জানি, বাংলাদেশ সরকার নাকি ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন তাদের কী কী অসুবিধা হবে। তার কোনো উত্তর দেয়নি ভারত।’

‘দিল্লি থেকে ঘোষণা করা হলো, শিগগির তিস্তার সমাধান করা হবে। কিন্তু কবে সেটা? বছরের পর বছর ধরে তো একই কথা শুনিয়ে আসছেন। নরেন্দ্র মোদী এর আগেও বলেছিলেন, তার আমলেই তিস্তার সমস্যার সমাধান হবে। হয়নি। এটি এখন সুদূরপরাহত। যতদিন মমতা ব্যানার্জী ও বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছেন, ততদিন এ নিয়ে আশা করার প্রশ্নই ওঠে না।

‘তিস্তার পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক না থাকায় এখানকার জনজীবন যেমন বিপর্যস্ত, তেমনি দক্ষিণে লবণাক্ততা বাড়ছে। মধ্য বাংলাদেশ পর্যন্ত কৃষির মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে সামনের দিনে। এ কারণে উজানের নদীগুলোর পানিপ্রবাহের বিষয়টি নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। প্রয়োজনে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে জোরালো আপত্তি জানানো দরকার’ বলছিলেন অধ্যাপক ড. এম শাহিদুজ্জামান।

তিস্তা ইস্যুতে প্রায় একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অন্য কারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তিস্তা ইস্যু গুরুত্ব পাবে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে দিল্লিতে ডাকা হয়েছে। তিনি যাননি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ফল আসবে না।’

‘আর তিস্তায় আসলে পানিই নেই। একের পর এক বাঁধ দিয়ে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্হোত করা হয়েছে। তিস্তা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন হবে না। ভারত চাইলে অনেক আগেই এর সুরাহা হয়ে যেত।’

তিস্তা ইস্যু জিইয়ে রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কী কারণে এই ইস্যু জিইয়ে রাখা হয়েছে, তা আমার জানা নেই। কোনো কারণ আছে বলেও আমি মনে করি না। সরকার শুধু আলোচনার জন্যই আলোচনা করছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে বা ভারত থেকে বাংলাদেশে কেউ এলে এটি রাজনৈতিক আলোচনা হিসেবে গুরুত্ব পায়। গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। আবার তিস্তা নিয়ে যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে, সেটাও বিলম্বিত করার চেষ্টা হয়তো।’

‘সরকার তিস্তা নিয়ে যে পরিকল্পনার কথা বলছে, তা ভারত আসলে ভালোভাবে দেখতে চাইছে না। শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি আটকে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বর্ষাকালে প্রচুর পানি আসে। এই পানি ধারণ করে রাখতে পারলে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে। এজন্য নদী খননের পাশাপাশি পাড় উঁচু করতে হবে। সম্ভবত, এমন পরিকল্পনা নিয়েই সরকার এগিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু ভারতের কারণে পারছে না’ যোগ করেন এম সাখাওয়াত হোসেন।

এএসএস/এএসএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।