ঘুসের টাকাসহ শিক্ষা কর্মকর্তা গ্রেফতার

উল্টো অভিযোগকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে মামলা, সুরাহায় দুদকে চিঠি

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৯:৪০ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২
ঘুসসহ গ্রেফতার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আজিমেল কদর/ফাইল ছবি

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি টিমের হাতে ঘুসের ১০ হাজার টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আজিমেল কদর। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ ওই ঘটনায় দুদকের করা মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে বিচারাধীন। এরই মধ্যে অভিযোগকারী সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমা আকতার ও মামলার তদন্তকারী দুদকের সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন আদালত। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় ঘুসের অভিযোগটি অসঙ্গত, ভিত্তিহীন, হয়রানিমূলক, মিথ্যা ও তুচ্ছ উল্লেখ করে উল্টো অভিযোগকারী তাসলিমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিস।

এ নিয়ে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করে আইনি সুরাহা চেয়েছেন তাসলিমা। তিনি বর্তমানে ফটিকছড়ি ফরহাদাবাদ নূর কাজী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত।

প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দাবি, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তারা সহকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছেন। এদিকে বিচারাধীন বিষয়ে মামলার রায় না হওয়ার আগে অভিযোগকারী সহকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসের পদক্ষেপটি আইনসিদ্ধ নয় বলে দাবি করেছেন দুদক আইনজীবী।

দুদক সূত্রে জানা যায়, ফটিকছড়ি উপজেলার বেড়াজালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন তাসলিমা। স্কুলটি দুর্গম এলাকায় ও যাতায়াত কষ্টসাধ্য হওয়ায় ওই স্কুল থেকে বদলির আবেদন করেছিলেন তিনি। তাসলিমা সম্ভাব্য তিনটি স্কুলের নাম উল্লেখ করে ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন। কিন্তু পরবর্তীসময়ে বদলির বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আজিমেল কদর তার কাছে ৩০ হাজার টাকা ঘুস দাবি করেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সহকারী শিক্ষিকা দুদকে লিখিত অভিযোগ দেন। তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ফাঁদ তৈরি করে ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ ঘুসের ১০ হাজার টাকাসহ আজিমেল কদরকে গ্রেফতার করে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১।

ওই সময়ের উপ-সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে আজিমেল কদরকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ এবং সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ করা হয়। পরে ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে বিচারাধীন। দুদকের মামলায় সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমা আকতার ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত।

অন্যদিকে দুদকের মামলায় আজিমেল কদর জামিনে বের হওয়ার পর তাসলিমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিস। ওই বিভাগীয় মামলায় ঘুস নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খানের সই করা এক আদেশে আজিমেল কদরকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

আদেশে বলা হয়, শিক্ষা কর্মকর্তা আজিমেল কদরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার অভিযোগের বিষয়ে ২০১৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর লিখিত জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি লিখিত জবাব দিয়েছেন ও ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নিয়েছেন। তার লিখিত জবাব ও শুনানিতে দেওয়া বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় বিভাগীয় মামলাটি তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এবং লিখিত জবাব, শুনানিতে দেওয়া বক্তব্য, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) ও ৩(ঘ) অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে করা মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।

আজিমেল কদরকে বিভাগীয় মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পাঁচদিনের মাথায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ২(খ) অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা করেন চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম। একই সঙ্গে আজিমেল কদরের বিরুদ্ধে তার দেওয়া অভিযোগটি অসঙ্গত, ভিত্তিহীন, হয়রানিমূলক, মিথ্যা এবং তুচ্ছ বলে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে অভিযোগকারী সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমা আকতার জাগো নিউজকে বলেন, বেড়াজালী প্রাথমিক স্কুলটি দুর্গম এলাকায় হওয়ায় আমার গ্রামের পাশের যে কোনো একটি স্কুলে বদলির জন্য আবেদন করেছিলাম। আমাকে বদলির জন্য ফটিকছড়ি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আজিমেল কদর ৩০ হাজার টাকা ঘুস চান। আমি ঘুস দিতে রাজি না। তাই দুদকের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। পরে আমার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক একটি ফাঁদ তৈরি করে ১০ হাজার টাকা ঘুস দিতে বলেন।

‘টাকাগুলোতে আগেই দুদক কর্মকর্তারা সই করে দিয়েছিলেন। দুদক কর্মকর্তাদের সই করা টাকাগুলো আমি বদলির ঘুস হিসেবে আজিমেল কদরকে দিয়েছিলাম। এসময় আগে থেকে উপস্থিত দুদক টিম তাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। ওই ঘটনায় দুদক বাদী হয়ে আজিমেল কদরের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলাটিতে চার্জশিট হয়েছে। আমি গত মাসে আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে এসেছি।’

তাসলিমা বলেন, হয়রানি করার জন্য এখন আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। আমাকে কেন বরখাস্ত করা হবে না, সেই মর্মে কারণ দর্শানো চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমি বিষয়টিতে আইনি সুরাহা চেয়ে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছি। চিঠিটি দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে জমা দিয়েছি।

সহকারী শিক্ষিকা বলেন, আজিমেল কদরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার পর আমাকে তিনবার ঢাকায় ডাকা হয়েছে। এখন আমাকে উল্টো চাকরি থেকে বরখাস্তের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।

দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপ-পরিচালক মো. নাজমুচ্ছায়াদাত জাগো নিউজকে বলেন, আমরা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অনুমোদন নিয়ে ফাঁদ মামলা পরিচালনা করেছি। সই করা টাকাই আলামত হিসেবে অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে। মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা এরই মধ্যে সবক্ষেত্রে দেখেছি, এ ধরনের ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হলেও তার ফৌজদারি মামলার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিভাগীয় মামলা স্থগিত থাকে। এ ক্ষেত্রে তার উল্টো ঘটেছে। এখনো আদালতের রায় হয়নি। কিন্তু তারা আসামিকে নির্দোষ দাবি করে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। ঘুসের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতারের পরও তাকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে পুরো শিক্ষা অফিসই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

চট্টগ্রাম আদালতে দুদকের আইনজীবী কাজী ছানোয়ার আহমেদ লাভলু বলেন, ঘুসের টাকাসহ গ্রেফতার হওয়া শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি এবং অভিযোগকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে উল্টো বিভাগীয় মামলা করার বিষয়টি শিক্ষা অফিসের ইচ্ছাকৃত। বিভাগীয় দুটি মামলাই ইচ্ছাকৃত।

তিনি বলেন, আদালতে একই বিষয়ে মামলা বিচারাধীন থাকার পরও শিক্ষা অফিস তো ঘটনাটি সত্য নয় বলতে পারে না। এটি সিদ্ধান্ত নেবে আদালত। কে দোষী, কে নির্দোষ, সেটি নির্ধারণ করা আদালতের এখতিয়ার। এখানে দুদকের মামলাটির রায় না হওয়ার আগে শিক্ষা অভিযোগ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তাতে একটি বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। এগুলো আইনসিদ্ধ হয়নি।

এদিকে দুই বিভাগীয় মামলাই নিজেদের ইচ্ছায় নয়, মন্ত্রণালয়ের আদেশ হয়েছে বলে দাবি করেন চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আজিমেল কদরকে বিভাগীয় মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি আমরা দেইনি। অব্যাহতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলায় আমি তদন্ত কর্মকর্তা ছিলাম না। আমি এসেছি অল্প কিছুদিন হলো। ওই ঘটনাটি অনেক আগের।

তবে সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমা আকতারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, এই মামলাটিও আমরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে করেছি। আর বেশি কিছু আমি জানি না।

ইকবাল হোসেন/আরএডি/বিএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।