কপ-২৭

পৃথিবীকে বাঁচাতে শুধুই প্রতিশ্রুতি, এবারও ক্ষতিপূরণ অনিশ্চিত

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন মুরাদ হুসাইন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শার্ম আল শেখ মিশর থেকে
প্রকাশিত: ০৯:০২ পিএম, ১৪ নভেম্বর ২০২২

পৃথিবীকে বাঁচাতে জলবায়ুর ওপর প্রভাব কমানের প্রত্যয় নিয়ে কপ-২৭ এর আসর বসলেও এবারও হতাশ হয়ে ফিরতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বৈশ্বিক লস অ্যান্ড ড্যামেজের জন্য আলাদা ফান্ড তৈরি, বাতাসের উষ্ণতা এক দশমিক পাঁচ শতাংশের মধ্যে আনা, পৃথিবীর বুকে সবুজায়ন ও উন্নত দেশের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের আশ্বাস ছাড়া কোনো অর্জন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে বৈশ্বিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে ক্লাইমেট ভেল্যুয়াবল ফোরামের (সিভিএফ) সদস্যভুক্ত দেশগুলো নতুনভাবে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এবারের জলবায়ু সম্মেলনের এটি সফলতা বলে মনে করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এম আব্দুল মোমেন।

সোমবার (১৪ নভেম্বর) মিশরের শার্ম আল-শেখে কপ-২৭ সম্মেলনে সিভিএফ সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জলবায়ুর ক্ষতিপূরণ নিয়ে আমরা অনেক দিন ধরে কাজ করছি, বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের ক্ষতির বিষয়টি আওয়াজ তুলেছি। আমাদের দেশে প্রতিবছর জলবায়ুর ক্ষতির কারণে ছয় লাখ মানুষ গৃহহীন ও কর্মহীন হয়ে পড়ছে। সরকার তাদের বাসস্থান ও কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

COP

বাংলাদেশে ক্ষতির হার শূন্য দশমিক চার শতাংশ উল্লেখ করে আব্দুল মোমেন বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের পরিবেশের ক্ষতির পরিমাণ কম হলেও সেটি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশসহ লস অ্যান্ড ড্যামেজ বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সম্মেলনে ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পাঁচটি দাবি জানিয়েছে।

এসব দাবির মধ্যে রয়েছে- যেসব দেশ বেশি বেশি পরিবেশ দূষণ করছে তাদের কাছে ক্ষতিপূরণ আদায়। প্যারিস চুক্তিতে যারা প্রতিজ্ঞা করেছিল ১০০ বিলিয়ন ডলার আগামীতে নয়, সেটি এখন পরিশোধ। পরিবেশের ক্ষতি ও পরিবর্তন ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজের’ জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া। সবুজায়নের জন্য উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি দেওয়া।

মন্ত্রী বলেন, আশার সংবাদ হচ্ছে লস অ্যান্ড ড্যামেজটির ইমপ্রুভ (উন্নতি) হয়েছে। গ্লোবাল শিল্ড আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। আমাদের একটি ভয় ছিল, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জলবায়ু সম্মেলনের গুরুত্ব অনেকটা কমে যাবে। বড় বড় দেশগুলো অস্ত্র তৈরিতে অর্থ ব্যয় করবে। পরিবেশের জন্য ফান্ড কমে যাবে।

তিনি বলেন, জার্মান, আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটিশসহ সিভিএফের অনেক সদস্য দেশ ক্ষতিপূরণ দেবে বলে নতুন করে ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের দাবিগুলো সিভিএফ সভায় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবছর আমাদের দেশ যে ছয় লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত তার জন্য আমরা সাহায্য, সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় দাবি করা হয়েছে। আমরা কিছুটা ফলাফলও পেয়েছি। শুধু একার জন্য নয়, সবার জন্য দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ প্রয়োজন রয়েছে।

কপ-২৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সঞ্জয় কুমার ভৌমিক জাগো নিউজকে বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের দেশের ২০টি জেলার ওপর পড়ছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় মানুষ, জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে তথ্য সংগ্রহ করে সেটি ইউএনডিপির সুপারিশ নিয়ে সম্মেলনে তুলে ধরেছি।

তিনি বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে যে প্রভাব পড়ছে সেটির একটি সুনির্দিষ্ট চিত্র তৈরি করে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। এবার হয়তো এ বাবদ ক্ষতিপূরণ পাওয়া না গেলেও আগামী বছর এ বিষয়ে জোর দেওয়া হবে।

COP

কপ-২৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়া সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী মো. সামসুদোহা জাগো নিউজকে বলেন, লস অ্যান্ড ড্যামেজের জন্য আলাদা একটি ফান্ড তৈরির দাবি করা করে আসছি অনেকদিন থেকে। এ সম্মেলনে আমরা আশা করছি একটি আলাদা ফান্ড তৈরি হবে। কিন্তু জার্মান সরকারের ইন্সুরেলিয়াস নামে যে ইন্স্যুরেন্স ম্যাকানিজম ছিল সেটিকে পরিবর্তন করে গ্লোবাল শিল্ড টু ক্লাইমেট চেঞ্জ টু ইমপ্যাক্ট। এটির সঙ্গে জি-২০ দেশও যুক্ত হয়েছে। তারা বলছে যে, এ ফান্ডের অর্থ সিভিএফের মাধ্যমে ব্যয় করা হবে।

তিনি বলেন, গ্লোবাল শিল্ডের অর্থ লস অ্যান্ড ডেমেজের অর্থ না। এটির মেজর হচ্ছে ইন্স্যুরেন্স ও আর কিছু ডিজেস্টার ইন সিডেকশনের জন্য। ইউএনডিপির ঘোষণা অনুযায়ী লস অ্যান্ড ডেমেজের জন্য আলাদা ফান্ড তৈরি হচ্ছে না। এতে করে আমাদের দাবির গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে। এ সম্মেলনে ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি। সিভিএফের দাবি অনুযায়ী আলাদা ফান্ড তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সম্মেলনের বৈশ্বিক সফলতা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে, সোমবার জলবায়ু সম্মেলনের অষ্টম দিনকে জেন্ডার দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য। তাই এদিন সম্মেলনে মূলত জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় নারীদের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, বিশ্বজুড়ে এক্ষেত্রে তাদের সফলতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নারীদের ভূমিকা আলোচনা গুরুত্ব পায়।

এদিন সম্মেলনে জেন্ডার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর মোট সাতটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে জেন্ডার দিবসের সব অধিবেশনের সুপারিশগুলো সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।

এমএইচএম/আরএডি/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।