বিশ্বকাপ উন্মাদনায় ‘চট্টগ্রামের নলা’

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০১:১০ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০২২

বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে সারাদেশ। কেউ আর্জেন্টিনা, কেউবা ব্রাজিল সমর্থক। শুক্রবার রাতে ব্রাজিলের দুর্ভাগ্যজনক বিদায় এবং রাতে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে সেমিতে জায়গা করে নেওয়া আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দ যেন আর বাঁধ মানে না। এমনিতেই খেলা শেষ হতে রাত ৪টা বেজে যায়। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়ের পর আনন্দে ভাসে দলটির সমর্থকরা। শেষ রাতে জয়ের উন্মাদনা ছড়ায় সারাদেশে। চট্টগ্রামেও রাস্তাও চলে আনন্দ উল্লাস।

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বাদেও বিশ্বকাপের বড় দলগুলোর সমর্থক কম নয় বাংলাদেশে। প্রথম রাউন্ডে জার্মানি এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে স্পেনের ছিটকে পড়ায় তাদের হতাশ সমর্থকরাও এরই মধ্যে বিকল্প দলকে সমর্থন দিতে শুরু করেছে। আর রাত জেগে বিশ্বকাপের খেলা দেখে পছন্দের খাবারে উদরপূর্তিতেও যান ফুটবলপ্রেমীরা। আর সেই ফুটবল উন্মাদনায় যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের নলা।

গরু কিংবা মহিষের পা ও রানের হাড়ের অংশবিশেষ চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় নলা এবং নেহারি হিসেবে পরিচিত। বিশেষ কায়দায় গোপন রেসিপিতে রান্না করা এই নলার স্বাদ নিতে ভোররাতে নগরীর মোমিন রোডের দস্তগীর হোটেলে ভিড় করেন ভোজনবিলাসীরা। শুক্রবার দিনগত রাত ১টায় শুরু হয়ে আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডসের ম্যাচটি শেষ হয় ভোররাত ৪টায়।

এরপর ভোজনবিলাসী অসংখ্য যুবক নলা ও নেহারির স্বাদ নিতে যান দস্তগীর হোটেলে। তবে হোটেলের বয়-বেয়ারা থেকে শুরু করে কারিগররাও খেলায় মজে থাকার কারণে হোটেলটি তখনও খুলতে ভোর প্রায় সোয়া ৪টা বেজে যায়। এর আগে থেকেই হোটেলের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ রিকশায়, কেউ অটোরিকশায়, কেউ মোটরবাইক, কেউবা এসেছেন প্রাইভেটকার কিংবা সাইকেলে চড়ে।

হোটেলটি খোলার পরও নলার সঙ্গে পরোটা, নান-রুটি তৈরি করতে আরও আধাঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে যারা বসার জায়গা পেয়েছেন তারা বসেছেন, অন্যরা ভিড় করেছেন। অর্থাৎ এক ব্যাচ খাবার শেষ করার পর অন্য ব্যাচের চেয়ার ধরার তোড়জোড়। প্রায় ৫০ মিনিট পরে শুরু হয় খাবার পরিবেশন। শুরু হয় নলা-নেহারির স্বাদ নেওয়া।

প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরের হালিশহর এলাকা থেকে নলা খেতে এসেছেন আলিফ হোসেন। তিনি আর্জেন্টিনার সমর্থক। বলছেন, আজকের রাতটি আমাদের জন্য, পুরো আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য স্পেশাল। কারণ আজ ব্রাজিল হেরেছে, আর্জেন্টিনা জিতেছে। দুটোতেই আর্জেন্টিনা সমর্থকরা নিজেদের জয় দেখছেন। স্পেশাল রাতটি আরও স্পেশাল করে রাখার জন্য দস্তগীর হোটেলের নলা খেতে আসা।

চান্দগাঁও এলাকার ইবরার আহমেদ ব্রাজিল সমর্থক হলেও আর্জেন্টিনা সমর্থক বন্ধুদের সঙ্গে নলা খেতে এসেছেন। তবে তার ব্রাজিলের জার্সিটি শীতের জ্যাকেট দিয়ে লুকিয়ে মুখে কষ্টের হাসি ধরে রেখেছেন।

ইবরার জাগো নিউজকে বলেন, খেলাতে হারজিত আছে। আমি ব্রাজিল সমর্থক। ব্রাজিল নান্দনিক ফুটবল খেলে। নিজেদের নৈপুণ্য দেখিয়েই পাঁচবার বিশ্বকাপ নিজেদের ঘরে নিয়েছে ব্রাজিল। সেখানে আর্জেন্টিনা কাপ দেখেছেন মাত্র দুইবার। তবে আজকের নিজের পছন্দের দল হেরে যাওয়ায় আর্জেন্টিনার জন্য শুভ কামনা থাকবে।

তবে আমি সেমিফাইনালে সাপোর্ট করবো, ফ্রান্স-ইংল্যান্ড ম্যাচে যে দলটি জয়ী হয়। এখন ফ্রান্স দুর্দান্ত খেলছে। ফাইনালটা তাদের মধ্যেই হওয়ার সম্ভাবনা। পাহাড়তলী এলাকা থেকে স্ত্রী ও কোলের সন্তানকে নিয়ে বাইকে চড়ে দস্তগীরের নলার স্বাদ নিতে এসেছিলেন জালাল উদ্দিন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। তবে হোটেলে বসার জায়গা হয়নি, অনেকক্ষণ বাইরে অপেক্ষার পর লোকজনের চাপের কারণে প্যাকেটে পার্সেল করে নিয়ে গেছেন।

জালাল উদ্দিন বলেন, আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক, আমার স্ত্রী ব্রাজিলের। আমার স্ত্রীও কর্মজীবী। একটি বেসরকারি ব্যাংকে আছেন। আজ কথা ছিল, দুই খেলায় যে দল হারবে সেই দস্তগীরের নলা খাওয়াবে। তাই বউয়ের টাকায় নলা খেতে আসা। এমনিতেই অনেক দিন ধরে দস্তগীর হোটেলের নলার সুনাম শুনে আসছিলাম। সবসময় শুনেছি সূর্যোদয়ের আগে নলা বিক্রি শেষ হয়ে যায়।

‘তাই কখনো খাওয়ার সুযোগ হয়নি। এখন যেহেতু খেলা দেখা, রাত জাগা হয়েছে। ভাগ্যিস ব্রাজিল হেরেছে, তাই নলা খাওয়ার সুযোগটা কাজে লাগানো গেছে। তারপরও হোটেলে যেই ভিড়, বসে খেতে গেলে আর নলা পাওয়া যাবে না। তাই পার্সেল করে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি।’

আন্দরকিল্লা থেকে কাছেই মোমিন রোডে দস্তগীর হোটেলের অবস্থান। নলা-নেহারির জন্য পুরো চট্টগ্রামে দস্তগীর হোটেলের সুনাম রয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে স্বাভাবিক সময়ের আগেই নলা পরিবেশন শুরু হয়। শনিবার ভোর সোয়া ৫টার দিকে মসজিদ থেকে যখন ফজরের আজান ভেসে আসছিল তখন দস্তগীরের নলা বিক্রি প্রায় শেষ হওয়ার পথে। এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে পুরো এক মেজবানি ডেকচি নলা বিক্রি শেষ হয়েছে। কেউ হোটেলে খেয়েছেন, কেউবা বাসায় পার্সেল নিয়ে গেছেন।

১৯৮৬ সাল থেকে দস্তগীর হোটেলে নলা বিক্রি হচ্ছে জানিয়ে হোটেলটির পরিচালক আলী আকবর জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের হোটেলের নলার সুনাম পুরো চট্টগ্রামজুড়ে। নগরীর দুয়েক জায়গায় নলার আয়োজন চললেও, দস্তগীর হোটেলের নলা একটি ব্র্যান্ড। আমাদের নলার স্বাদ নিয়ে চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে থেকে লোকজন আসে। অনেকে বেড়াতে আসা চট্টগ্রামের বাইরের অতিথিদের নিয়েও আমাদের হোটেলে নলা খেতে নিয়ে আসেন। যে কারণে চট্টগ্রামের বাইরেও আমাদের নলার পরিচিত ছড়িয়েছে।

এমআরএম/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।