ওয়েস্টমিনস্টার থেকে ডাউনিং স্ট্রিট : নারীর নিরাপত্তা সংকট!

তানভীর আহমেদ
তানভীর আহমেদ তানভীর আহমেদ , লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৪:০৮ এএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৭

মুখ খুলছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপিরা। একজন দু'জন নয়, প্রায় অর্ধ শতাধিক এমপি ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে। অভিযুক্ত এমপি ও মন্ত্রীদের অধীনস্ত গবেষক ও সহযোগীদের বিভিন্ন কৌশলে যৌন নির্যাতন করেছেন তারা। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের ডিফেন্স সেক্রেটারি স্যার মাইকেল ফ্যালনের মতো শক্তিশালী রাজনীতিবিদ যখন যৌন কেলেঙ্কারি মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন তখন ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ যে কতোটা ভয়াবহ সেটা সহজেই অনুমেয়।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে' তার নিজ দলের ৪০ জন এমপির একটি তালিকা তৈরি করেছেন যাদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। তালিকার ১৮ জন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যৌন অসামঞ্জস্যপূর্ণ অভিযোগের তদন্ত চলছে, ১২ জন এমপির বিরুদ্ধে তাদের নারী গবেষকদের যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে চারজন নারী এমপির বিরুদ্ধে তাদের পুরুষ গবেষকদের বিরুদ্ধে অশালীন আচরণের অভিযোগ রয়েছে।

ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রী মার্ক গার্নিয়ের তার কমন্সের সেক্রেটারি ক্যারোলিন এডমন্ডসনকে 'সুগার টিটস' বা মিষ্টি যুবতী বলে ডাকতেন। মূলত ক্যারোলিনকে দিয়ে গার্নিয়ার সেক্স টয় কেনানোর কথা স্বীকার করার পরই পার্লামেন্টারিয়ানদের যৌন হয়রানির বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে। লেবার পার্টির ২৫ বছর বয়সী এ্যাক্টিভিস্ট বেক্স বেইলি বিবিসি টেলিভিশনকে বলেছেন, তিনি ২০১১ সালে তার দলের সিনিয়র পলিটিশিয়ানের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছেন। মুখ খুলছেন নির্যাতনের শিকার হাই প্রোফাইল এমপিরাও। বাংলাদেশিবংশোদ্ভূত লেবার দলীয় এমপি ডক্টর রুপা হকও বলেছেন, তার বয়স যখন ২০ বছর তখন তিনি ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। টিউলিপ সিদ্দিকও পার্লামেন্টে যৌন নিপীড়ক এমপিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।

কি ভয়াবহ ব্যাপার, গণতন্ত্রের সুতিকাগার ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের একি দশা! নিজ দলের হাই প্রোফাইল এমপি মন্ত্রীদের এমন যৌন কেলেঙ্কারির খবরে ডাউনিং স্ট্রিট রীতিমতো নড়েচড়ে বসেছে। যে কোনো সময় থেরেসা মে তার কেবিনেটের পরিবর্তন আনতে পারেন। চলতি সপ্তাহে যৌন কেলেঙ্কারি সামলাতে করণীয় নিয়ে লেবার দলীয় নেতা জেরিমি করবিন ও লিবডেম নেতার সাথে বৈঠক করে যৌন নির্যাতন বিরোধী শক্ত অবস্থান নিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।

এ তো গেলো ওয়েস্টমিনস্টারের খবর। এবার ওয়েস্টমিনস্টার থেকে অন্যদিকে চোখ সরাই। ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের 'এভরিডে সেক্সিজম প্রজেক্ট' নামে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী মেয়েদের ৫২ শতাংশই কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকার। জরিপে অংশ নেয়া এক পঞ্চমাংশই বলেছে, তারা তাদের কর্মক্ষেত্রের শীর্ষব্যক্তি বা বসের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন। ব্রিটেনের অফিস অব ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্সের ক্রাইম সার্ভের ২০১৬ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ১৬ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে পরিবারের সদস্য বা পার্টনার দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৩ লাখ নারী, অন্যদিকে নির্যাতিত পুরুষের সংখ্যা ৭ লাখের বেশি। এদের মধ্যে ২৬ শতাংশ নারী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের বয়স যখন ১৬ বছর। এই তথ্যউপাত্ত গুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে ব্রিটেনের মতো একটি সভ্য দেশে যেখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ রয়েছে সেই দেশের যৌন নির্যাতনের এমন ভয়াবহ চিত্র।

এবার দৃষ্টি ফিরাই বাংলাদেশে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে ৩৯৪ জন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে যার মধ্যে স্বামীর হাতে নিহত হয়েছে ১৯১ জন। আর একইসময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭২৪ জন আর ধর্ষণ চেষ্টা হয়েছে আরও ৬৫ জনের ওপর। প্যারিসভিত্তিক দাতব্য সংগঠন মেডস্য সঁ ফ্রঁতিয়ে এমএসএফ এর এক কর্মশালায় চলতি বছর জুলাইতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশে নির্যাতিত নারীদের প্রায় ৮০ ভাগই স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়, এর মধ্যে মাত্র দুই শতাংশ প্রতিকারের জন্য বিভিন্ন সংস্থার দ্বারস্থ হন। তবে এতো সব তথ্যের ভিড়ে আমি বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে নারীরা কত শতাংশ নির্যাতনের শিকার হন সেই পরিসংখ্যান খুঁজে পেলাম না।

যেহেতু নারীদের ৮০ শতাংশই তাদের স্বামীর হাতে নির্যাতিত হচ্ছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে তাহলে সেই স্বামীদের একটা বড় অংশ যে তাদের অধীনস্ত নারীদের কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন করে থাকতে পারেন সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তার উচ্চপদস্থ কর্মকতা বা মালিকের বিরুদ্ধে কিভাবে সোচ্চার হতে পারেন তার কোন পরিস্কার দিক নির্দেশনা নাই। অনেক নারীরাই হয়তো জানেন না কিভাবে যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে চাকরি হারানোর ভয়ে, নিরাপত্তা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এমন বহু নির্যাতনের ঘটনা থেকে যায় অন্তরালে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অপর জুনিয়র এমপিদের পাশাপাশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রুপা হক যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, এই প্রকাশভঙ্গি হয়তো অন্যদের আরো উৎসাহিত করবে। মুখ খুলবে বাংলাদেশের নারীরা।

তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে নারীদের এই বলে আশ্বস্ত করেছেন তারা যেন ভয় না পায়, তার বসের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উত্থাপন করতে গিয়ে যেন কেউ চাকরি না হারায়, অভিযোগকারী যেন ন্যায়বিচার পান সেটি তিনি নিশ্চিত করবেন। বাংলাদেশে যৌন হয়রানি বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের সেবা দিতে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু করেছে, কোনো ঘটনার শিকার ব্যক্তি নিজে বা প্রত্যক্ষদর্শী কেউ যদি ১০৯ নম্বরে কল দেন তাহলে এই সেন্টার সেবা দেবে। নিঃসন্দেহে এই সেবা প্রসংশার দাবিদার। যদিও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এই সেবা সম্পর্কে অনেক নারীরই কোন ধারণা নেই। ব্রিটেনে এধরনের নোটিস কোনো কোনো অফিসের দেয়ালে লাগানো থাক। যৌন হয়রানি, বুলিং বা স্টাফ এবিউজের নোটিস কর্মক্ষেত্রে দেয়ালে ঝোলানোর পরও এধরনের ঘটনা ঘটছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো ব্রিটেনের নারীরা ঘটনা ঘটলে তার প্রতিকার চেয়ে রিপোর্ট করে থাকেন যেমনটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা যায় না। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এই কেলেঙ্কারির পর বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মক্ষেত্রে নারীর যৌন নির্যাতন ও সুরক্ষা বিষয়ে পরিস্কার নীতিমালা জরুরি হয়ে উঠেছে।

এই লেখাটি শেষ করার কিছুক্ষণ আগে বিবিসি'র জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ার দেখছিলাম। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক এক ভয়ঙ্কর তথ্য দিলেন। আইটিভির প্রডিউসার ডেইজি গুডউইন খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকতার হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবী করেছেন। ঘটনাটি ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কোন এক সময় ঘটেছে যখন ডেভিড ক্যামেরন ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। হলিউড মোঘল হার্ভি ওয়েস্টিন ও ওয়েস্টমিনস্টারের সাম্প্রতিক যৌন নির্যাতনের ঘটনা গুলো একে একে ফাঁস হতে থাকলে ডেইজি গুডইউন ডাউনিং স্ট্রিটে তার সেই নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করার অনুপ্রেরণা খুঁজে পান, তবে তিনি মনে করেন সেইদিনের ঘটনাটি রিপোর্ট না করে তিনি ভুল করেছেন।

গণতন্ত্রের নিউক্লিয়াস ওয়েস্টমিনস্টার কিংবা পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যালয় ডাউনিং স্ট্রিট কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়, হয়তো সেই তুলনায় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কিংবা গণভবন এখনো নিরাপদ। তবে আমাদের দেশে যেখানে ৮০ শতাংশ নারী তাদের স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত সেখানে কর্মক্ষেত্রে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে না একথা বলা যাবে না। ওয়েস্টমিনস্টারের নারীরা মুখ খুলছেন, হয়তো একদিন মুখ খুলবে বাংলাদেশ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। কারেন্ট এফেয়ার্স এডিটর, চ্যানেল এস টেলিভিশন, লন্ডন। ইউকে প্রতিনিধি একাত্তর টেলিভিশন।
[email protected]

এইচআর/আরআইপি

‘গণতন্ত্রের নিউক্লিয়াস ওয়েস্টমিনস্টার কিংবা পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যালয় ডাউনিং স্ট্রিট কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়, হয়তো সেই তুলনায় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কিংবা গণভবন এখনো নিরাপদ।’

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]