কী শিখলাম পাকিস্তান থেকে?

মাসুদা ভাট্টি
মাসুদা ভাট্টি , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৬:২৯ এএম, ২৮ নভেম্বর ২০১৭
কী শিখলাম পাকিস্তান থেকে?

পাকিস্তানের নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার এ যাত্রায় টিকে গেলেও সাধারণ জনগণ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত এক মাস ধরে চলা ভয়াবহ ঘটনাবলী যেভাবে শেষ হলো তাতে প্রমাণিত হয়েছে যে, নওয়াজ শরীফের স্থলে যে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন, তার সরকার শুধু দুর্বলই নয়, বরং তারা দেশ চালাতে অক্ষম। এখন জোরেশোরেই যে কথাটি সকলে উচ্চারণ করতে চাইছেন তাহলো, এরকম দুর্বল সরকারের বদলে দেশে সরাসরি সামরিক শাসন জারি করাই উত্তম হবে, যা পাকিস্তানের সত্তর বছরের ইতিহাসে বার বার হয়েছে এবং পাকিস্তানের জনগণেরও সে অভিজ্ঞতা একাধিকবার হয়েছে।

ঘটনার শুরু নির্বাচনী আইন সংশোধনকে কেন্দ্র করে এবং অভিযোগ তোলা হলো যে, নির্বাচিতদের শপথ পড়ানোর সময় মহানবীকে অশ্রদ্ধা দেখানো হচ্ছে যা ব্লাসফ্লেমির শামিল, একই আইনে যদিও দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে প্রায় বঞ্চিতই করা হয়েছে তবু সে বিষয়ে কোনো কথা কেউ বলেনি পাকিস্তানে। বরং বছরখানেক আগে গঠিত তাহরিক-ই-লাব্বাইক নামক একটি অখ্যাত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কর্মীরা যখন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদসহ অন্যান্য শহরকে প্রায় অচল করে দিয়েছে তখন পাকিস্তান সরকার সেনা বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ এক মাস ধরে চলা এই অবরোধকে সিভিল প্রশাসন কোনো এক বিচিত্র কারণে বাড়তে দিয়েছে এবং অদৃশ্য জায়গা থেকে তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে বলেও বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গিয়েছে।

দেশটির গণমাধ্যম এই অবরোধ ও অবরোধকারীদের উস্কে দিচ্ছে বলে অভিযোগ এনে দেশটির বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, এমনকি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলিও সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল গুজব ছড়িয়ে অবরোধকারীদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে সে অভিযোগে। কিন্তু তাতে গুজব ছড়ানো বন্ধ হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না, বরং দিনের ভেতর একাধিক গুজব নানারকম ডালপালা মেলতে মেলতে দেশটিকে কার্যতঃ অচল করে দিয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিদারুণ ভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বাড়িঘর আক্রমণ হওয়ায় দেশটিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকেই আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন এবং দেশটির ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যেই সরকারের ওপর অনাস্থা জানিয়ে দিয়েছিল এই অবরোধের জের ধরে। ঠিক এমন অবস্থায় যখন সিভিল প্রশাসনের হাত থেকে ক্ষমতা প্রায় অবরোধকারীদের হাতে চলে যাচ্ছিল তখন উপায়ন্তর না দেখে প্রধানমন্ত্রী দেশটির সেনা প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। দেশে-বিদেশে সেই বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, বৈঠকটি কার্যতঃ ব্যর্থ হয়েছে কারণ সেনা বাহিনী অবরোধকারী/বিক্ষোভকারীদের দমনে শক্তি প্রয়োগে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম কোনো রকম রাখঢাক না রেখে এ কথাই এরপর বলতে শুরু করে যে, যারা সমস্যা সৃষ্টি করেছে তাদের কাছেই সমাধান চাইতে গেলে এর চেয়ে ভালো কোনো সমাধানতো আশা করা যাবে না, তাই না? তার মানে সকলেই ততক্ষণে পুরোপুরি জেনে গিয়েছেন যে, পুরো ঘটনাটির নিয়ন্ত্রক এবং কুশীলব আসলে কারা।

মজার ব্যাপার হলো সামরিক বাহিনীর কাছে গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতা চাওয়ার পরও সামরিক বাহিনীর প্রধান তাকে পরামর্শ দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে আপোষে আসার জন্য। পাকিস্তানি সেনা প্রধান একথাও প্রধানমন্ত্রীকে সাফ জানিয়ে দেন যে, নিজের দেশের জনগণের ওপর দেশটির সেনা বাহিনী কোনো ভাবেই শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। এখানে একটুখানি একাত্তরকে স্মরণ করতে হয়, একাত্তরে কিন্তু পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর এরকমটি মনে হয়নি, তখন তারা নির্বিচারে তখনও পর্যন্ত নিজের দেশ থাকা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পশুর মতো। হয়তো এটা এ কারণেই যে, পাকিস্তান কখনওই পূর্ব বাংলাকে নিজের দেশ মনে করেইনি, যেমনটি মনে করেনি বাঙালিকে পাকিস্তানের নাগরিক। কিন্তু কথা সেটি নয়, কথা হলো, পাকিস্তানের সেনা বাহিনী যে দেশটির সরকারের নির্দেশ মানার বদলে তাদের নির্দেশেই পাকিস্তানকে পরিচালনা করে তা আবারও প্রমাণিত হলো, এই একবিংশ শতকে এসেও পাকিস্তানের জন্ম ইতিহাসে সামান্যতম পরিবর্তন না হওয়াটা কেবল দুঃখজনকই নয় আতঙ্কের ব্যাপারও বটে।

মজার ব্যাপার হলো দেশটির নির্বাচিত সরকার যখন বিক্ষোভকারীদের দাবিনামা মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে তাতে সই করেন দেশটির নির্বাচিত সরকারের কেউ নয় বরং দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। বিষয়টি রীতিমতো বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে পশ্চিমা গণমাধ্যমে এবং তারা এই প্রশ্ন ইতোমধ্যেই তুলতে শুরু করেছেন যে, এর অর্থ কি এই যে, পাকিস্তানের নির্বাচিত সরকারের আয়ু ইতোমধ্যেই ফুরিয়েছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ইঙ্গিত রয়েছে? যেমন ব্রিটেনের দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস স্পষ্ট করেই বলেছে যে, এর আগে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতকে ব্যাবহার করে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও জনপ্রিয় নেতা নওয়াজ শরীফককে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় যেমন সেনা বাহিনী প্রত্যক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করেছে তেমনই আইনমন্ত্রী’র বিরুদ্ধে খুবই মামুলি অজুহাত তুলে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক শক্তিকে উস্কে দিয়ে সেনা বাহিনী প্রমাণ করতে চাইছে যে, দেশটির মূল চালিকাশক্তি আসলে তারাই, এর মধ্যে গণতান্ত্রিক শক্তির কোনো ভ’মিকা নেই, ভ’মিকা রাখতে চাইলেও তা দেওয়া হবে না।

ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত এক্সামিনার বলেছে, যদি দেশটিতে আরেকটি নির্বাচন দিতেই হয় অর্থাৎ সেনা বাহিনী যদি সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ না করে তবে আগামি নির্বাচনে সেনা বাহিনীর হয়ে প্রক্সি রাজনীতি যারা করবে সেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলির শক্তি আসলে কতোটুকু সেটা প্রমাণ করার জন্যই সেনা বাহিনী এই নাটক মঞ্চস্থ করেছে। একই কথা একটু সহনীয় ভাষায় বলতে গিয়ে ব্লুমসবার্গ বলেছে, পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের খুব সুসময় যাচ্ছে না, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেদেশে সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসুক সেটাও চায় না, কারণ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান কখনও যদি দুর্বৃত্তের হাতে পড়ে তাহলে পৃথিবীর জন্য হবে মহা সর্বনাশের ব্যাপার।

নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা রেখে সামরিক বাহিনীকে একটা চাপের মধ্যে রেখে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখাই মার্কিন সরকারের এ যাবতকালের নীতি হলেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ধর্মভিত্তিক শক্তির শক্তিময়তার প্রমাণ দিয়ে সেনা বাহিনীকেও একথা ট্রাম্প সরকারকে বোঝাতে হচ্ছে যে, তাদেরকে যেনো কোনো ভাবে অবহেলা করা না হয়। এমনিতেই সিরিয়ায় আইসিস-এর পতনের পর দক্ষিণ এশিয়ায় আয়-ক্বায়েদার উত্থান এখন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে আলোচিত একটি বিষয়। আল-ক্বায়েদার দ্বিতীয় প্রধান আয়মন আল-জাওয়াহিরি দক্ষিণ এশিয়ায় আল-ক্বায়েদাকে যে প্রকারেই হোক শক্তিশালী করতে চাইছে এবং অভিযোগের তীর কেউ না বললেও পাকিস্তান সেনা বাহিনীর শক্তিশালী গোয়েন্দা বাহিনীর দিকেই যে, তারা এক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে আগ্রহী বা ইতোমধ্যেই হয়তো করেওছে। কারণ, এবার আল-ক্বায়েদার টার্গেট ভারত ও বাংলাদেশ সহ বঙ্গোপসাগরের তীরে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এরকম বিশ্লেষণ বেশ ক’মাস আগেই প্রকাশিত হয়েছিল।

এখন পাকিস্তানে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির এই উল্লেখযোগ্য বিজয় আল-ক্বায়েদারই বিজয় কিনা এবং তাতে পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের স্বাভাবিক ভাবেই ভাবিয়ে তুলবে, যেমনটি ব্লুমসবার্গসহ অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ-নির্ভর গণমাধ্যম স্পষ্ট করেই বলতে শুরু করেছে। পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা থেকেই কিছু না কিছু শেখার রয়েছে আমাদের, সেই অর্থে পাকিস্তানে গত মাস খানেকের ঘটনা থেকেতো বাংলাদেশের মতো দেশের অনেক কিছুই শেখার রয়েছে বা বুঝবার রয়েছে। এমনিতেই পাকিস্তান সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, দেশটি তিনটি বৃহৎ ‘এ’ অথবা বাংলা করলে ‘আ’-এর ওপর নির্ভর করে টিকে আছে, এগুলো হলো এক. আল্লাহ্ অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্মকে যথেচ্ছ ব্যবহার; দুই. আর্মি, যারা জন্মলগ্ন থেকেই দেশটিকে হয় শাসন করেছে নয় শাসনক্ষমতায় কারা বসবে তা নির্ধারণ করেছে, কিংবা যখন সেটা পারেনি তখন অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়েছে; তিন. আমেরিকা, পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে যেমন আমেরিকার হাত ছিল তেমনই সৃষ্টির পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের গাঁটছড়া এক হিসেবে এখনও দেশটিকে টিকিয়ে রেখেছে, কেবলমাত্র ১৯৭১ সালেই আমেরিকা এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছিল আর সেবারই পাকিস্তান দু’টুকরো হয়েছিল একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এলেও পাকিস্তানের ভূত এখনও এদেশ এবং এদেশের রাজনীতিকে তাড়া করে ফেরে। বিশেষ করে এদেশের পাকিস্তানপন্থী অগণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাটি এখনও শক্তিশালী এবং তারা বারম্বার দেশকে অস্থিতিশীল করে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ খোঁজে। উদাহরণ হিসেবে ২০১৩ সালের ৫ই মে’র কথা টানা যেতে পারে, যদিও বাংলাদেশের সিভিল প্রশাসন অসামান্য দক্ষতায় সে বিপদ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল, যা পাকিস্তানের বর্তমান প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এখানেই হয়তো বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় পার্থক্য যে, এদেশের মানুষ এখনও সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি আস্থাশীল, পাকিস্তানে যেখানে ধর্মভিত্তিক ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাবান জনগণের আধিক্য রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অবস্থা ও তার পরিণতি থেকে বাংলাদেশেরও যে শিক্ষণীয় অনেক কিছুই রয়েছে সেটাতো আগেই বলেছি এবং মূল শিক্ষাটা আসলে এটাই যে, যে কোনো মূল্যে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হবে এবং এর বিকল্প আসলে আর কিছুই নেই।

ঢাকা ২৮ নভেম্বর, মঙ্গলবার ২০১৭
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি।
masuda.bhatti@gmail.com

এইচআর/পিআর

নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা রেখে সামরিক বাহিনীকে একটা চাপের মধ্যে রেখে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখাই মার্কিন সরকারের এ যাবতকালের নীতি হলেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ধর্মভিত্তিক শক্তির শক্তিময়তার প্রমাণ দিয়ে সেনা বাহিনীকেও একথা ট্রাম্প সরকারকে বোঝাতে হচ্ছে যে, তাদেরকে যেনো কোনো ভাবে অবহেলা করা না হয়