জীবনে চাই স্পিড

শান্তা মারিয়া
শান্তা মারিয়া , কবি ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৩:২৯ এএম, ৩০ নভেম্বর ২০১৭

সকালে অফিস যাচ্ছেন। বাংলামোটর থেকে মতিঝিল। বাংলামোটরের সাবওয়ে স্টেশন থেকে উঠলেন। পাঁচ মিনিট লাগলো মতিঝিল স্টেশনে পৌঁছাতে। তারপর ঝকঝকে ফুটপাথ দিয়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে কিংবা স্টেশন থেকেই একটা সাইকেল নিয়ে পৌঁছে গেলেন অফিসে। হন্তদন্ত হয়ে দেরিতে অফিসে ঢুকে বসের ঝাড়ির ভয় নেই। জ্যামে বসে বসে ঢুলুনি নেই। প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে বাসের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া নেই। আরও ভাবুন। কোন অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। হয়তো পল্টন থেকে মিরপুর। বিশ মিনিটে চলে যাচ্ছেন মেট্রোতে। ঢাকা থেকে সিলেট যাবেন? সুপারস্পিড ট্রেনে চড়ুন। আধঘন্টার বেশি লাগবে না। হ্যাঁ জীবনে চাই স্পিড। গতিই জীবন।

আমাদের কত মূল্যবান কর্মঘণ্টা যে নষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন রাজপথে জ্যামে বসে থেকে! আবার দুর্ঘটনায় মহাসড়কে ঝরে যাচ্ছে কত জীবন। শুধুমাত্র পরিবহন খাতের অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে আমরা ক্রমশ জিম্মি হয়ে পড়ছি কতিপয় সুবিধাভোগী মানুষের কাছে। প্রতিবাদ করলেই অচল হয়ে যাচ্ছে পরিবহন সেক্টর। অথচ আমাদের জীবনে শুধু যদি পরিবহন খাতটি সুষ্ঠু ও গতিশীল হতো তাহলে ব্যক্তি, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারতাম আমরা।

সম্প্রতি মিডিয়া ট্যুর কর্মসূচিতে চীন সফরে গিয়ে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করলাম এই সত্য। চীনের রাজধানী বেইজিং। জনবহুলতার দিক থেকে বিশ্বে এর অবস্থান দ্বিতীয়। আয়তনেও বিশাল এই মহানগর। কিন্তু যানজট তেমন নেই। রিংরোড, ফ্লাইওভার, তিনতলা রাস্তা, পাবলিক বাস আর সাবওয়ের সুসমন্বয়ের ফলে এখানে ট্রাফিক জ্যামে পড়ে খাবি খেতে হয় না নাগরিকদের। সাবওয়েতে বেইজিং শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে খরচ হয় দুই ইউয়ান বা ২৬ টাকা। সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ নাগরিকদের জন্য তাও ফ্রি।

পাবলিক বাসের ব্যবস্থাও অতি চমৎকার। নাগরিকদের ব্যক্তিগত গাড়ির অভাব নেই। কিন্তু অকারণে কেউ গাড়ি পথে নামায় না। যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত যে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করাকেই সুবিধাজনক বলে মনে করে নগরবাসী। সব নাম্বারপ্লেটের গাড়ি সবদিন রাস্তায় নামতেও পারে না। কোন সিরিয়ালের গাড়ি কবে পথে নামবে তার নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন আছে। রাস্তার ধারণ ক্ষমতা বুঝে গাড়ি বিক্রিরও একটা হিসাব রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে রাস্তা জ্যাম করার ঝামেলা পাকাতে পারে না কেউ। শুধু বেইজিং নয়, চীনের অধিকাংশ বড় শহরেই সাবওয়ে রয়েছে।

শেয়ারিং বাই সাইকেল আরেকটি আকর্ষণীয় জিনিস। স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে পাওয়া যায় এই সাইকেল। রাস্তার ধারে সারি সারি পাবলিক শেয়ারিং বাইসাইকেল রয়েছে। যে কোন স্থান থেকে এই সাইকেল নিয়ে তা ব্যবহার করা যায় স্বল্পদূরত্বের জন্য। ফলে অযথা গাড়ির ভিড় জমে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে চীনের বুলেট ট্রেন বা হাইস্পিড ট্রেনের কথা না বললেই নয়। এই বুলেট ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা আগেও ছিল।

সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে আবারও সেই অভিজ্ঞতা হলো। এই ট্রেন বুলেটের মতোই দ্রুতগতির এবং অব্যর্থ। নয়টার গাড়ি কয়টায় ছাড়বে নয়, ঘড়ি ধরে কাঁটায় কাঁটায় চলে এই ট্রেন। ২০১১ সালে চীনে বিশ্বে সর্বোচ্চ গতির বুলেট ট্রেন চালু হয়। তখন এর সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘন্টায় ৩০০ কিলোমিটার। দুটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন এর চলাচল বন্ধ রেখে আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হয়। এরপর আরও উন্নত ও নিরাপদ ট্রেন চালুর পরিকল্পনা করে তারা। এখন আরও উন্নত হাইস্পিড ট্রেন চলছে ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৩৫০ কিলোমিটার বেগে। বেইজিং থেকে সাংহাই যেতে লাগছে এক ঘন্টার কম সময়। বেইজিং থেকে হুনান প্রদেশের রাজধানী ছাংশার দূরত্ব রেলপথে প্রায় ১৫৮৭ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে আমাদের সাংবাদিক দলের সময় লাগে মাত্র ছয় ঘন্টা।

এই গতিতে চললে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে ঘন্টাখানেক সময় লাগবে। চীনে এই ধরনের দ্রুতগতির ট্রেন চলার জন্য ১৯৯৬০ কিলোমিটার ট্র্যাক রয়েছে। জরুরি অবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেনের গতি কমানো সম্ভব এবং থামানোও সম্ভব। চীনের পাঁচটি শহর ঘুরে মনে হলো বিশাল এই দেশটি যোগাযোগ ব্যবস্থায় সত্যিই বিপ্লব ঘটিয়েছে। পাহাড় পর্বতের ভিতর দিয়ে, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ের চূড়ায়, নদীর উপর দিয়ে সেতু গড়ে তারা পুরো দেশটিকে ট্রেন যোগাযোগের আওতায় নিয়ে এসেছে। আর সড়ক পথ, বিমান যোগাযোগ তো আছেই।

চীন এখন এক অঞ্চল এক পথ নামে প্রাচীন রেশম পথ অঞ্চলকে নতুনভাবে জাগাতে চাচ্ছে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে চাচ্ছে। বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটাচ্ছে তারা। এর সুবিধাভোগী হবে এশিয়ার রেশমপথ অঞ্চলের দেশগুলো। বাংলাদেশও এই বলয়ের বাইরে নয়। আমাদেরও যোগাযোগ ব্যবস্থার যথাযথ উন্নয়ন দরকার। ঢাকা শহরের যানজট কমানোর জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যাতে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট না নয়। সড়ক-মহাসড়ককে নিরাপদ করা দরকার। দুর্ঘটনায় যেন অকারণ প্রাণক্ষয় না হয়। আর আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে চাই কূটনৈতিক দক্ষতা। উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে পড়তে চাই না আমরা। দেবদাসের সেই গরুর গাড়ির যাত্রার দিন শেষ। সময় এখন হাই স্পিড ট্রেনের।

লেখক : কবি, সাংবাদিক।

এইচআর/পিআর

ঢাকা শহরের যানজট কমানোর জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যাতে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট না নয়। সড়ক-মহাসড়ককে নিরাপদ করা দরকার। দুর্ঘটনায় যেন অকারণ প্রাণক্ষয় না হয়। আর আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে চাই কূটনৈতিক দক্ষতা

আপনার মতামত লিখুন :