‘ও-তে ওড়না, ‘ম’-তে মৃত্যু

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা
প্রকাশিত: ১০:৪১ এএম, ১৯ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১০:৪১ এএম, ১৯ জানুয়ারি ২০১৮
‘ও-তে ওড়না, ‘ম’-তে মৃত্যু

‘ও’তে ওড়না শিখতে এবং শেখাতে একনিষ্ঠ নারী-পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। গত ১৫ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখের প্রথম আলো-জনকণ্ঠ এবং এরকম আরও কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে আসা এক তথ্য- গত এক বছরে, অর্থাৎ ২০১৭ সালে মোটরচালিত যানের চাকার সাথে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস লেগে ১০৩ জন নারীর মৃত্যু হয়েছে।

এই তালিকায় আছে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে মরে যাওয়া মাত্র ১৮ বছরের নাজমুন নাহার রাহা’র নাম। পরীক্ষার দিন সকাল থেকেই টেনশন নিয়ে ছুটতে থাকা রাহা এক মুহূর্তের অসাবধানতায় হারিয়ে ফেললো টেনশন করার সব রকমের ক্ষমতা। ওর সহপাঠিরা নিশ্চয়ই এইচএসসি’র গন্ডি পেরিয়ে জীবনের পথে আরো এগিয়ে গেছে। রাহা শুয়ে আছে মাটির ঘরে, চুপচাপ। রাহার সাথে শুয়ে আছে রাহার সব সম্ভাবনা। রাহা কি নিশাত মজুমদারের মতো এভারেস্ট জয় করতে পারত? রাহা কি কি করতে পারত, কি হতে পারত, কি হওয়ার স্বপ্ন ছিল, তা এখন একান্তই রাহার পরিবারের ব্যক্তিগত শোকগাথা, তা নিয়ে কথা বলার সময় অন্যদের নেই, থাকে না।

রাহার পরিবারের নারীরা হয়তো রাহার দুর্ভাগ্যজনিত মৃত্যুর পর ‘ও’ শুনলেই ওড়না বুঝে সাবধান হতে শিখে গেছে। বাকিরা কিন্তু ‘ও’ শুনলে ওড়না বুকে টেনে নিতে জানে। কেননা এরা বাঙালি নারী হিসেবে লজ্জাশরম বুকে টেনে নেওয়ার অভিনয় করে অথবা ওড়নাকে নারীর ‘ভূষণ’ বলে ঝুলিয়ে রাখতে স্বস্তি পায়, বেশির ভাগই পুরুষের অবয়বধারী কুদৃষ্টিসম্পন্ন বিকৃত রুচির মচ্ছবকে ঠেকানোর মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে যুক্তি টানে। নিজের শরীরটা অন্য কেউ কুৎসিতভাবে দেখছে, এই অনুভূতি স্রেফ ঘৃণার জন্ম দেয়, যার প্রলেপ দিতে ওড়নাকে লাগে এবং লাগে কেবল নারীরই। পুরুষকে ওড়না পরতে হয় না। কেননা, কারোর কুদৃষ্টি ঠেকাতে ওড়না যে কোন কাজে আসে না, এটা বোঝার মতো বুদ্ধি পুরুষের আছে। তাই গলায় ফাঁস লেগে পুরুষকে ওভাবে মরতে হয় না, যেভাবে মরতে হয় নারীকে।

৩৬৫ দিনে বছর হয় বলে সোজাসাপ্টা অংকের হিসেবে প্রতি সাড়ে ৩ দিনে একজন নারীর মৃত্যু ঘটছে স্রেফ ‘ও’-তে ওড়না পেঁচিয়ে। এই অংকের বাস্তব প্রমাণ দিতেই বুঝি আজকের অর্থাৎ ১৬ তারিখের যায়যায়দিন পত্রিকায় দেখলাম নাসরিন বেগমের মৃত্যুর সংবাদ। তিনি ১৮ বছরের সদ্য কৈশোর পেরুনো রাহা নন, ৩৬ বছরের বিবাহিতা সংসারী নারী। শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় অটোরিকশার মোটরের সাথে তার ওড়না পেঁচিয়ে গেলে গলায় ফাঁস লাগে নাসরিন বেগমের। সাড়ে ৩ দিনের অংকের প্যাঁচে পড়ে গেলেন তিনি। কাল-পরশু আর কে কে পড়বে, জানতে চোখ রাখুন পত্রিকার পাতায়, পেয়ে যাবেন তাজা তাজা!

পুরনো পত্রিকাগুলো দেখতে থাকুন, পেয়ে যাবেন সেই তাদের খবর, যারা ওড়নার সম্মান রেখে চলে গেছেন চিরতরে। ১২ বছরের কিশোরী পুষ্প সাহা, পুলিশ কনস্টেবল নুসরাত জাহান তানিয়া-র নাম খুঁজে পেলাম পুরনো খবরের পাতায়। কলসিন্দুর গ্রাম এক দল কিশোরীকে বিস্ময়কর ফুটবল প্রতিভা হিসেবে উপহার দিয়ে নিজেই বিখ্যাত হয়ে গেছে। সেই কলসিন্দুর গ্রামের নিশা মনি পিএসসি পরীক্ষা দিয়ে আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। সবার চোখের সামনে বাচ্চাটার গলায় ফাঁস লেগেছে, ছটফট করে এক ফোঁটা বাতাসের জন্য কাকুতি জানিয়েছে ওর বিস্ফারিত চোখ জোড়া উপস্থিত সবার কাছে, সবাই ওর গলার ফাঁস খুলতে ব্যস্ত, ওকে বাঁচাতে ব্যস্ত, ফাঁস খুলতে খুলতে ফাঁকি দিল নিশা মনি...আহ্! কী সুন্দর নাম, নিশা মনি!

‘ও’-তে ওড়না আর কি কাজে লাগে? ইভ টিজিং-এর শিকার অপমানিত কিশোরী সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না ঝুলিয়ে গলায় ফাঁস দেয়। অত্যাচারী স্বামী পিটিয়ে মেরে ফেলে ওড়নায় গলা পেঁচিয়ে গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে ঘোষণা দেয়, ইহা আত্মহত্যা। ‘ও’-তে ওড়না আর কি কি ঘটনা ঘটায়? নারীদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ব্যক্তিগত ইভেন্টে দেশসেরা সাফল্য দেখানো সোনাজয়ী সাদিয়া দুপুরের খাবার গরম করতে গিয়ে ওড়নায় (বুঝতে হবে, ঘরের ভেতরেও এমনকি রান্নাঘরে কাজ করতে গেলেও নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে ওড়না গায়ে থাকতে হয়) আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ফেললেন বুক-গলা-মুখ। মনে নেই সাদিয়ার কথা। কে আর মনে রাখতে চায় পুড়ে যাওয়া বুক-গলা-মুখের কথা? তবে এরকম পুড়ে যাওয়া নারীর সংখ্যা কিন্তু খুব কম নয়।

কোন সহৃদয় জরিপে কখনো হয়তো বা উঠে আসবে পুড়ে যাওয়া নারীর পরিসংখ্যান। আমরা শুনে উহু আহা করব, একবারও কি ভাবব, বেঁচে যাওয়া এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকাটা কেমন? না, করুণায় ভেঙে পড়ার কিছু নেই। জান্নাতুল ফেরদৌস আইভি নামের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ‘নিরবে’ চলচ্চিত্র দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশকে সম্মানিত করছেন, মানবাধিকার সংস্থা ‘ভয়েজ এন্ড ভিউজ’ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি ওড়নার আগুনে পুড়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া জীবনকে কমলা আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন। পুড়ে যাওয়া মানে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়, এ যেমন সত্য, তেমনি সত্য এই প্রশ্নটিও- কেন পুড়ে যেতে হবে? যিনি পুড়ে গিয়েও বেঁচে থাকেন, তাকে না হয় উদ্দীপ্ত করতে জান্নাতুল ফেরদৌস আইভি’র নামটি উচ্চারণ করলাম, কিন্তু যে ফাঁস লেগে মরে গেল, তাকে কি শোনাব?

ওড়না-সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হোক সাবধানতার বাণী। রিকসায় বসে সন্তানকোলে ওড়না গায়ে মা ওড়না সামলাবেন না সন্তানকে সামলাবেন ভাব যখন দেখি, তখন বুঝি নিজস্ব সাবধানতা এই মায়ের মাথায় নেই। তখন প্রশ্ন জাগে, এই মা কি সত্যিই বাধ্য ওড়না পরতে?

গত এক বছরে ১৪২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃত আজ বজ্রপাত। ‘ও’-তে ওড়না-কে ‘ম’-তে মৃত্যুদূত ঘোষণা দিতে আর কত মৃত্যুর দরকার আমাদের?

লেখক : কথাসাহিত্যিক।

এইচআর/এমএস

`পুরনো পত্রিকাগুলো দেখতে থাকুন, পেয়ে যাবেন সেই তাদের খবর, যারা ওড়নার সম্মান রেখে চলে গেছেন চিরতরে। ১২ বছরের কিশোরী পুষ্প সাহা, পুলিশ কনস্টেবল নুসরাত জাহান তানিয়া-র নাম খুঁজে পেলাম পুরনো খবরের পাতায়।‘