বাংলার বাজার বাড়াতে বাধা কোথায়?

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:১৪ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বাংলা চর্চায় অতি রক্ষণশীলতা বা উদারতা দুটাই বিপজ্জনক। কখনো ব্যাকরণের কঠিন বেড়াজাল, কখনো ব্যাকরণ ভেঙেচুরে স্বেচ্ছাচারিতা। দুটাই হঠকারিতা। জবরদস্তি। নাশকতা। তা শব্দ, বানান, বাক্যসহ গোটা বাংলা ভাষাটিরই সাবলীলতা নষ্ট হচ্ছে। বাধা ফেলছে বিস্তার ও অগ্রগতিতে। একসময় বানান ও বাক্যে ভুলের মহোৎসব দেখা যেত বাস-ট্রাকে। দোকানপাটের সাইন বোর্ডে।

‘ঐ দেকা জায় গুলিস্থান, ব্যভহারে বংসের পরিচয়, ১০০ বা ৫০০ টাকার বাংতি নাই, কিসু পেলে গেলেন কি’ –এর মতো বানান ও কথাবার্তা এখন ভরপুর ফেসবুকে। যার মন যা চায় স্ট্যাটাস লিখছেন। কমেন্টসও আচ্ছা রকমের। সবাই এখানে স্বাধীন, সার্বভৌম, মহাপরাক্রমশালী। বানান ও ভুল ভাষা শেখার জন্যে ফেসবুক একটি মহা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। ফেসবুকে একদিনে ভুলে ভরা যতো বাংলা যায় একজন শিক্ষক তার ইহজিন্দেগিতে তা দেখেছেন বলে মনে হয় না।

ভাষার সঠিক চর্চা নিশ্চিতে অভিধানের চেয়েও বেশি শক্তি গণমাধ্যমের। দেশের সব ঘরে অভিধান নেই। থাকলেও সেটা পড়ে থাকছে শো পিসের মতো। কিন্তু সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, ফেসবুকের মতো গণমাধ্যম রয়েছে ঘরে ঘরে। এসব গণমাধ্যমে ব্যবহৃত শব্দ, বানান, বাক্যের গতি, শক্তি অভিধানের চেয়ে অনেক বেশি। ভয়ঙ্কর এ শক্তি বাংলার চরম সর্বনাশ করে ছাড়ছে।

কখনো কখনো অর্থগতভাবে ছারখার করে ফেলা হচ্ছে রক্তার্জিত বাংলাকে। এই অনাচার রোখার কোনো লক্ষণ নেই। পত্রিকা বা রেডিও টিভির মতো ফেসবুকের সম্পাদক, প্রকাশক, সহ-সম্পাদক, প্রুফরিডারের মতো দায় নেয়ার কেউ নেই। কিন্তু সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশনগুলোতে অহরহ বাংলার যে দশা করে ছাড়া হচ্ছে এর জন্যও কাউকে দায় নিতে হচ্ছে না। ভুল স্বীকার করে শুদ্ধটা জানানোর তাগিদও চোখে পড়ে না। বানানের কথা নয় তো বাদই গেল। বাক্য গঠনেও অরাজকতার ছড়াছড়ি। এখানে টিভিসহ রেডিও এবং পত্রিকায় প্রচারিত-প্রকাশিত সাম্প্রতিক কিছু বাক্যের উল্লেখ করা যায়।

যেমন-
ডায়রিয়ায় ১৭ জন নিহত
বন্যার পানিতে ১৫ জন নিহত
অপুষ্টির অভাবে শিশুর মৃত্যু
নিহত হয়ে চারজনের মৃত্যুবরণ
দ্রব্যমূল্যের দাম আবার বেড়েছে
সাফাতের আদালতে ধর্ষণের কথা স্বীকার
সিদ্দিকের চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেছে
তাকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে
বাস না পেয়ে পায়ে হাঁটতে হয়েছে পাঁচ মাইল
এইচএসসিতে শতকরা গড় পাসের হার ৬৮.৯১ শতাংশ
প্রেস ক্লাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ
ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত
বিএনপির খালেদা জিয়ার কেক কেটে জন্মদিন পালন
পলাতক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ধরে আনার চেষ্টা চলছে

উল্লিখিত বাক্যগুলোর অর্থ-প্রয়োগে বাংলার করুণ দশা স্পষ্ট সাধারণ শিক্ষিত যে কারো কাছে। কী বলতে গিয়ে কী বলা হচ্ছে? তথ্যই বা কী দাঁড়াচ্ছে? কিন্তু কেউ তা রোখার চেষ্টা করছেন বা রুখতে সক্ষম হচ্ছেন সেই নমুনা নেই। পৃথিবীজুড়ে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে গণমাধ্যম। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের ওপর। বর্তমান আকাশ সংস্কৃতি ও মুক্তবাজার অর্থনীতি তৃতীয় বিশ্বের গণমাধ্যমের ভাষাও বদলে যেতে শুরু করেছে। নানা ভাষিক মিশ্রণ, বর্জন ও সংযোজনের মধ্য দিয়ে নিয়ত এর রূপ বদলাচ্ছে। আর বাংলার স্বকীয়তা, বিশেষত্ব, একক শুদ্ধরূপ ক্ষত-বিক্ষত করছি নিজেরাই।

চাইলে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করা যায়- বিশুদ্ধতা ও জাতপাত খোয়ানোর পরও ইংরেজি ভাষা কেন গোটা বিশ্বে প্রতিপত্তি বিস্তার করে চলছে? ইংরেজি জানা কেন সারা দুনিয়াতেই স্মার্টনেসের ব্যাপার? বিশ্বের অনেকে বাণিজ্যিক কারণে চীনা ভাষাও শিখছেন। আগে কেবল পণ্ডিতরা শিখতেন, এখন শিখছে অনেক সাধারণ মানুষও। জাপানিজ, কোরিয়ান ভাষা শেখার কারণও এমনই। হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্য তো চলছেই। সেই তুলনায় কেন জমছে না বাংলার বাজার।

ভাষাকে একঘরে হয়ে যেতে হয় নানা কারণে। সময়-অসময়ে বিভিন্ন ভাষা নেতিয়ে পড়া বা হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস প্রায় একই। অনেকেই মানতে চান না ভাষার সঙ্গে কর্মসংস্থানসহ কর্মজগতের বিশাল সম্পর্কের কথা। মানুষ অজস্র ভাষা সৃষ্টি করতে পারে। আবার পারে অপব্যবহারে, খামখেয়ালিতে ভাষার সর্বনাশ করতেও। কোনো ভাষাকে শক্তিধর রাখতে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক পদক্ষেপ দরকার। অথচ বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানোর কথাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে নারাজ অনেকে।

বিকৃতি আর শক্তিহীনতার কারণে পৃথিবীর একসময়ের শক্তিধর ভাষাগুলোর কিছু দুর্বল হয়েছে। কিছু হারিয়েই গেছে। বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভাষায় মেসোডোনিয়ায় আজ কজনে কথা বলে? পৃথিবীর প্রধান তিনটি ধর্মপ্রণেতার অন্যতম যিশুখ্রিস্টের ভাষাও প্রায় বিলুপ্ত। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, বিশ্ববিজয়ী চেঙ্গিস খানের ভাষা দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোনো ভাষাই শুধু আবেগ, চেতনা আর ভালোবাসার ওপর ভর করে টিকে থাকে না। মূল ভিত্তির অক্ষুণ্নতা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তি চায় সব ভাষাই।

বিশ্বের ত্রিশ কোটি লোকের ভাষাটি মোটেই ধনেজনে দুর্বল নয়। যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সামর্থ্যবান। তার ওপর বাংলার প্রতি আমাদের আবেগ, ভালোবাসা অসীম। কিন্তু খামখেয়ালি, শুধু আবেগ, ভালোবাসা, চেতনায় ভাষা বা কোনো কিছুর শেষরক্ষা হয় না। কারো আদেশ-নির্দেশেও হয় না। যদিও ভাষা প্রতিষ্ঠায় আমাদের আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। আদালত বলেছে বাংলায় সাইনবোর্ড নিশ্চিত করতে। ২০১৪ সালে ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির ১৭ তারিখে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ থেকে এ মর্মে আদেশ জারি হয়। আদেশে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, সরকারি দফতরের নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে বলেন।

এ বিষয়ে যথেষ্ট তদারকিতে সরকারি দফতরের সাইনবোর্ড বা নামফলকের বেশিরভাগ বাংলায় রূপান্তর হয়েছে। বাংলায় সরবরাহের কারণে যানবাহনের ডিজিটাল নম্বরপ্লেটও অনেকটাই বাস্তবায়ন করা গেছে। তবে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইংরেজিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ঠেকানো যায়নি। তা আরও বাড়ছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, দোকানপাট, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, নামফলক ইংরেজিতে লেখা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইংরেজির চাহিদা বেশি। ভোক্তা বা সেবাগ্রহীতাদের চাহিদার কারণেই তারা এমনটি করছেন। এ কথা তো সত্যই। প্রয়োজনেই কোনো কিছুর ব্যবহার বাড়ে। আর ব্যবহার না হলে বাড়ে না প্রেম-ভালোবাসাও। এটা মোটেই চেতনার বিষয় নয়। চাহিদাই মূল বিষয়। ভাষা হিসেবে বাংলাকে জীবন-জীবিকার সঙ্গে জোরালোভাবে সম্পর্কিত করার আবশ্যকতার ইঙ্গিত এখানে স্পষ্ট।

বাংলার মধ্যে হরদম ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে কিছুটা প্রয়োজনে। কিছু অবচেতনে-অজান্তে। কর্মসংস্থানসহ বিভিন্নক্ষেত্রে লীগ, পার্টি, ফেডারেশন, ফোরাম, ফ্রন্ট, কমিটি, কমিশন, ইলেকশন, সিলেকশন, ভোট, মিটিং ইত্যাদি মানের বাংলা শব্দ আজও প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি আমরা। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়সহ দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাসের বাংলা বইগুলো এখনো মানে অনেক পিছিয়ে। পেরে উঠছে না ইংরেজি বইয়ের সঙ্গে। এ কাজে যাদের সব’চে বেশি দায়িত্ব সেই শিক্ষকরাও লেখাজোখায় ইংরেজিসহ বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করছেন।

আপ-ডাউন ছাড়া দেশে এখন উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমসহ প্রায় সবদিকের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংকের ছড়াছড়ি। এদিক, সেদিক, অন্যদিক কোনো দিকই আর বাদ নেই। আবার রয়েছে দুইদিক মিলানো নামও। নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট, সাউথ ইস্ট, নর্দার্ন, সাউদার্ন, ইস্টার্ন নাম টেনে আনা কি জরুরি? তাছাড়া, বাংলা প্রতিশব্দ সৃষ্টি করতে গিয়ে তারা কখনো কখনো জন্ম দিয়েছেন ভুল প্রতিশব্দের। মূল বাংলা ব্যবহারে ভুলের ছড়াছড়িতো আছেই। প্রয়োজনের বাইরে আমাদের মানসিক সমস্যাও পিছু ছাড়ছে না।

বক্তৃতা, ভাষণ, টিভির টকশোর আলোচনায় পর্যন্ত ইংরেজি-বাংলার উদ্ভট মিশ্রভাষা বুঝিয়ে দেয় মাতৃভাষা বাংলাকে আমরা কী চোখে দেখি। সম্প্রতি রেডিওসহ লোকসমাজে আধুনিকতাচ্ছলে ‘জটিল, অস্থির, সেরাম, ফাটাফাটি’ ধরনের শব্দ ছড়ছে অবাধে। এগুলোর অর্থ ও প্রয়োগের হাল ভয়াবহ। সমসাময়িক তরুণ প্রজন্ম এর প্রয়োগ করতে গিয়ে লিখিত-মৌখিক দু’ভাবেই এমন সব উদ্ভট শব্দ ছড়াচ্ছে যা বাংলার জন্য রীতিমতো আতঙ্কের।

আমাদের এতো সুন্দর ভাষাটির সৌন্দর্য্য, শুদ্ধতা ও বিস্তারের মূল দায়িত্ব আমাদেরই। তাই দাবি করার আগে দাবির পক্ষে নিজের বোধ-বিশ্বাস নিশ্চিৎ হওয়া জরুরি। গায়ের বা থোতার জোরে নয়, দাবির যৌক্তিকতা ও ন্যায্যতা থাকলে নল চাইলে অন্তত নোলক মেলে। বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবিটি সুপরিণতির দিকে নিতে চাইলে দেশে বাংলার চর্চা কোন স্তরে, কোন পর্যায়ে তা ভাবা জরুরি। বাংলার ব্যবহার-অপব্যবহার নিয়ে কথাবার্তা যে একদম হচ্ছে না-এমনও নয়। আবার নিত্য ব্যবহার ও প্রচলনে বাংলার ভুল-শুদ্ধও অনেকটা আপেক্ষিক হয়ে গেছে। কোনটা বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ রূপ এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

যার জেরে একুশ শতকে এসে বাংলা ভাষায় বিধিবিধানের প্রশ্নে কেউ চরম কঠোর। আবার কেউ সেগুলো ভেঙে চুরমারে আক্রমণাত্মক। পরিণতিতে বাংলাকে মোটামুটি একটা স্থির জায়গায় এনেও আনা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ভাষার স্বীকৃতির পরও এর আন্তর্জাতিক বিস্তৃতির কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না। টান পড়ছে না ভুল বাংলা চর্চার লাগামে। বাঙালি বাংলা ভাষার জন্য রক্ত ঢেলেছে। সেই আন্দোলনকে স্বাধীনতা আন্দোলন ও যুদ্ধে নিয়ে ভাষাভিত্তিক নতুন রাষ্ট্রও গড়েছে। কিন্তু ভাষাটিকে একীভূত সর্বজনগ্রাহ্য করে তোলার জায়গায় ঘাটতি দুঃখজনক।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/এমএস

বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবিটি সুপরিণতির দিকে নিতে চাইলে দেশে বাংলার চর্চা কোন স্তরে, কোন পর্যায়ে তা ভাবা জরুরি। বাংলার ব্যবহার-অপব্যবহার নিয়ে কথাবার্তা যে একদম হচ্ছে না-এমনও নয়। আবার নিত্য ব্যবহার ও প্রচলনে বাংলার ভুল-শুদ্ধও অনেকটা আপেক্ষিক হয়ে গেছে। কোনটা বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ রূপ এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :