আপন মাঝে শক্তি ধর

তামান্না ইসলাম
তামান্না ইসলাম তামান্না ইসলাম , প্রবাসী লেখিকা
প্রকাশিত: ১০:০৭ এএম, ০৯ এপ্রিল ২০১৮

আমাদের প্রাচ্য দেশীয় সমাজ ব্যবস্থার যেমন অনেক ভালো দিক আছে, তেমন কিছু খারাপ দিকও আছে। আমাদের কালচারে মেয়েদেরকে অতিরিক্ত সম্মান দেখানোর নামে তাদেরকে আসলে ছোটবেলা থেকেই মানসিক এবং শারীরিক ভাবে দুর্বল করে তৈরি করা হয়। মেয়েদের শারীরিক শক্তি বাড়ানোর ব্যাপারটা তো পুরোপুরি অবহেলিত।

আমার কাছে মনে হয় এটা আসলে ইচ্ছাকৃত। মেয়েরা এমনিতেই শারীরিক শক্তিতে পুরুষের চেয়ে দুর্বল। তার উপরে যদি ছোটবেলা থেকেই তুমি এটা পারবে না, ওটা পারবে না, এগুলো মেয়েদের কাজ নয় এধরনের চিন্তা ভাবনা ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলে তো তারা আরও বেশি দুর্বল হয়ে যাবেই। এটা অনেকটা একটা অভেদ্য চক্রের মত হয়ে গেছে। মেয়েরা দুর্বল, তাই তাদের বাইরে নিরাপত্তা নেই। আবার তাদের নিরাপত্তা নেই বলেই তাদের কাজ কর্মের ক্ষেত্র গুলো সীমিত।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন মেয়েদেরকে দেওয়া বাড়তি সুবিধাগুলোকে মেয়েদের জন্য অতিরিক্ত সম্মান বলে মনে হত, তুমি মেয়ে তাই তোমার আলাদা একটা সম্মান আছে এটাই আমাদেরকে শেখানো হয়েছে। একটা ছেলের জন্য একটা মেয়ে গাড়ির দরজা খুলে দেবে, আহা কী রোমান্টিক ব্যাপার। বাসে মেয়েদের আলাদা সিট, কী সম্মান নারী জাতিকে। কোথাও বসার আসন সীমিত হলে ছেলেরা উঠে মেয়েদের জায়গা করে দেবে।

ইউনিভার্সিটিতে গাদা গাদা ফটোকপি করতে হবে, যাবে ক্লাসের ছেলেরা। বান্ধবীদের জন্য কী সহমর্মিতা। বাসায় বাজার করা, দোকানে যাওয়ার কাজ গুলো সব সময় করবে ভাইয়েরা। একটা ভারি আসবাব পত্র সরানো, মিস্ত্রী ডাকা এক কথায় শারীরিক কষ্টের কাজগুলো শুধু ছেলেরাই করবে। আপাত দৃষ্টিতে রোমান্টিকতা, সম্মান আর সহমর্মিতার মোড়কে ঢাকা এই আচরণগুলো আসলে আমাদের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের শারীরিক শক্তির কোন বিকাশ তো হচ্ছেই না বরং মানসিক ভাবেও আমরা পঙ্গু এবং নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছি। আমার ভাবতে খারাপ লাগে যে এসব আচরণে, চিন্তায় অভ্যস্ত হতে হতে এমন হয়েছে যে মনে হয় এটাই আমাদের পাওনা, এটাই নিয়ম। কোন কারণে নিয়মের বাত্যয় হলে কষ্ট পাই, এবং অবশেষে এক সময় আবিষ্কার করি আমরা কতখানি পরনির্ভরশীল এবং অসহায় হয়ে আছি সারাজীবন।

আশার কথা নতুন প্রজন্মের এসব ধ্যান ধারণা পাল্টাচ্ছে। মেয়েরা এখন ছোট থেকেই বুঝতে শিখছে যে কষ্ট করে হলেও নিজেদেরকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। সেদিন এক ছোট্ট ঘটনার মাঝে আমার নতুন করে বোধোদয় হল, আমি নারী, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমি মানুষের মর্যাদা চাই, আমি সহানুভূতি চাই না, বরং শ্রদ্ধা আর আমার উপরে বিশ্বাস চাই আর সেটা আমাকেই অর্জন করতে হবে, কেউ আমাকে এমনি এমনি সেটা দেবে এটা আশা করা বোকামি।

আমি, আমার স্বামী আর আমার মেয়ে একজায়গায় বেড়াতে যেয়ে সারাদিন ঘোরাঘুরি করে ভীষণ ক্লান্ত। পা টনটন করছে সবারই। টানা চার পাঁচ ঘণ্টা হাঁটা হয়েছে। শরীর আর চলছে না। আমরা হাঁটতে হাঁটতে যেখানে চলে এসেছি, গাড়ি পার্ক করা হয়েছে তার থেকে অনেক দূরের এক পার্কিং লটে। এদেশে, যেখানে সেখানে গাড়ি পার্ক করা যায় না। লাস ভেগাসের এই রাস্তাটা বানানোই হয়েছে হাঁটাহাঁটি করার উদ্দেশ্যে। কম করে হলেও আবার দেড় দুই মাইলের হাঁটা।

আমার কান্না পাচ্ছিল। তাছাড়া মেয়েটা পায়ে ব্যথা পেয়েছে ফুটবল খেলতে যেয়ে কিছুদিন আগেই। ওর পা নিয়ে আমি খুব চিন্তিত। ওর নাকি ব্যথা বেড়েছে। আমার সেই পুতুল পুতুল বাঙালি নারী মন বলছে, কষ্টের কাজ সব ছেলেরা করবে। মেয়েরা সম্ভব হলে একটু কম কষ্ট করবে, মেয়েরা তো নরম। তাই আমার স্বামীকে বলে ফেললাম 'আমরা দুই জন এখানে বসি, তিন জন হেঁটে তো আর লাভ নাই। তুমি একা যেয়ে গাড়িটা নিয়ে এসে আমাদেরকে তুলে নিয়ে যাও।'

আমার স্বামীও বাংলাদেশি পুরুষ, নরম স্ত্রীর যত্ন নিয়ে অভ্যস্ত, তাও আবার এখন মেয়েও আছে সঙ্গে। সে বিনা বাক্য ব্যয়ে হাঁটা দিল। আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার এই ছোট্ট মেয়ে মচকানো পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটা দিল বাবার সাথে। আমি চিৎকার করে ওকে থামাতে গেলাম। তার এক কথা, 'বাবা যদি হেঁটে যেতে পারে, আর আমি না পেরে এখানে বসে থাকি তাহলে আমি আমার নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাব, মনে হবে আমি বাবার তুলনায় অক্ষম।' তার জেদের কাছে হার মেনে আমিও ওদের সাথে হাঁটতে শুরু করলাম। আর মনে মনে ভাবছিলাম আমার এখনো আরও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে।

কারও কাছ থেকে পাওয়া বাড়তি স্নেহ, সুবিধার জন্য যদি নিজের কনফিডেন্স, আত্মসম্মান এগুলো কমে যায়, তাহলে সেই সুবিধা না নিয়ে বরং নিজের শক্তিকে বিকশিত কর, নিজের শক্তির বলে বলিয়ান হও, দেখবে জগত তোমাকে নিজ থেকে সম্মান করবে।

লেখক : ক্যালিফোর্নিয়াপ্রবাসী লেখিকা।

এইচআর/জেআইএম

‘তার জেদের কাছে হার মেনে আমিও ওদের সাথে হাঁটতে শুরু করলাম। আর মনে মনে ভাবছিলাম আমার এখনো আরও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে।’