মমতা, তিস্তা ও বাংলাদেশ

সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার
সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার , লেখক
প্রকাশিত: ১০:৩১ এএম, ০৩ জুন ২০১৮

দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান শেষে পশ্চিমবাংলায় এখন একচ্ছত্র আধিপত্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কয়েকদিন আগে স্থানীয় সরকারের যে নির্বাচন হয়ে গেল তাতে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস সারা পশ্চিমবাংলায় যে ফলাফল করেছে তাতে মনে হতে পারে সেখানে কস্মিনকালেও মানুষ অন্যকোন দলে ভোট দেয়নি। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে জেলা পরিষদের ত্রিস্তরে তৃণমূলের বিজয় রীতিমত চোখ ধাঁধানো।

পঞ্চায়েতে প্রায় ৮০ শতাংশ, পঞ্চায়েত সমিতিতে ৯০ শতাংশ এবং জিলা পরিষদের প্রায় সব জায়গায় তৃণমূল বিরোধীদের ধরাশায়ী করেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে জ্যোতি বসু কিংবা বুদ্ধদেব বসুর নাম আজ অনেকটাই জাদুঘরে রাখা বিলুপ্ত প্রাণির মতো। কাজেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবাংলায় যে শেকড়টা গেড়েছেন সেটা উপড়ানো খুব একটা সহজ হবে না। অন্তত রাজনীতি নিয়ে যারা বিশ্লেষণ করেন তাদের এটা সন্দেহাতীত মতামত।

তবে আশঙ্কা তার বামদের নিয়ে নয়। বড় ধরনের আশঙ্কা ভারতীয় জনতা পার্টি অর্থাৎ বিজেপিকে নিয়ে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতবর্ষে যে ক্রেজ তৈরি করেছেন তাতে সুদীর্ঘকালের ভারতবাসীর সঙ্গী কংগ্রেসও হারিয়ে যাওয়ার পথে। গান্ধী পরিবার ধুঁকে ধুঁকে কোনমতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। একের পর এক হাতছাড়া হয়ে চলেছে রাজ্যগুলো।

মমতা কংগ্রেসের নেত্রী ছিলেন, ১৯৭০-র পর তিনি পশ্চিমবাংলায় অতি পরিচিত রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছেন, কেন্দ্রের মন্ত্রী ছিলেন কয়েকবার, ইত্যাদি। যদিও তিনি শুরুতে বলতে গেলে তৃতীয় সারির নেতা ছিলেন কংগ্রেসে। সিদ্ধার্থ শংকর রায়, এবিএ গনি খান, প্রণব মুখপাধ্যায়, প্রিয় রঞ্জন দাস মুন্সী প্রমুখের অনেক পরে মমতা নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছেন। কংগ্রেসে তার সেরকম মূল্যায়ন না থাকায় তিনি বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসেছিলেন ১৯৯৮ সালে।

অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে নিজেকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। একের পর এক আন্দোলনে চমক দেখিয়েছেন। ফলে তার পক্ষে পশ্চিমবাংলার হাল ধরাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে বিজেপিকে নিয়ে তার ভয় ভারতবর্ষে তার বিস্ময়কর উত্থান প্রতিটি মানুষকে ভাবনায় ফেলেছে। পাছে ভারত তার গর্বের ধর্মনিরপেক্ষতা হারিয়ে বসে! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। এর ফলে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন এতটাই সহিংসতায় রূপ নিয়েছে ইতোপূর্বে পশ্চিমবাংলার মানুষ তা দেখেনি। কয়েক দফার এ নির্বাচনে প্রায় তিন ডজন মানুষ খুন হয়েছে, আহত হয়েছে হাজার হাজার।

পোড় অনেক কমিউনিস্ট ভয়ে ভিটে-বাড়ি ছেড়েছেন। সম্পদ নষ্ট হয়েছে অজস্র। তিনি জানেন যে, মানুষগুলো তাকে আজ ভোট দিচ্ছে; তারা প্রায় সাড়ে তিন দশক কাস্তে হাতুড়ির লাল ব্যানারের নিচে ছিলেন। কাজেই কোন এক সময় তারা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গেরুয়া রঙের পদ্মফুলের কাছে গিয়ে দাঁড়াবেন না, এ নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। সারা পশ্চিমবাংলায় যে বিজেপির কোন নামগন্ধ ছিল না তারা বামদের হঠিয়ে দ্বিতীয় সারিতে দাঁড়িয়ে গেছে মাত্র কয়েক বছরে। মমতার হয়তো এ আশঙ্কা ও পূর্বানুমান পরিপক্ব রাজনৈতিক ইন্ডাকশানের ফলাফল।

প্রশ্ন হলো, মমতা কেন তিস্তা চুক্তি নিয়ে এক ধরনের লুকোচুরি খেলছেন? এর উত্তর খুব সহজ। পশ্চিমবাংলার নন্দিগ্রামে বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে মমতা একাই সেখানকার কৃষকদের নিয়ে আন্দোলন করে বামদের গদিচ্যুত করেছেন। প্রায় সাড়ে তিন দশকের শেকড় উপড়েছে মাত্র একটা আন্দোলনে; কাজেই তাদের হাতে তিস্তা চুক্তির ইস্যু এতো সহজে তুলে দেবেন এটাকে বোকামি মনে করেছেন মমতা।

নিরর্থক ভালো ঘরে উটকো ঝামেলা ডেকে আনা সমীচীন বলে তিনি মনে করছেন না, যারপরনাই তিস্তা ইস্যু ঝুলে আছে দিনের পর দিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তিনিকেতনে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে সাংবাদিকদের তিস্তা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মমতা উচ্চস্বরে বিরক্ত প্রকাশ করেছেন। আদতে তিনি এ ধরনের প্রশ্নের কোন আলোচনা করতে রাজি নন।

খুব সহজ একটা প্রশ্ন মনে আসতে পারে, যে ভারত চীনের সাথে এক হাত জমি নিয়ে গণ্ডগোল করছে প্রায় পৌনে একশ বছর, পাকিস্তানের সাথে লাইন অব কন্ট্রোল নিয়ে ঝামেলা চলছে দিনের পর দিন, কারগিল নিয়ে রীতিমত সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে সেই ভারত বিনা বাক্যে তার ভূখণ্ড বিনিময় করেছে ছিটমহলের নামে বাংলাদেশের সাথে। নিজের মানচিত্র সংশোধন করেছে। সেই ভারত সামান্য একটা নদী নিয়ে কেন এতোসব কাণ্ড করবে? এর আগেও তো বাংলাদেশের সাথে গঙ্গা নিয়ে চুক্তি করেছে। আসলে সমস্যাটা চুক্তির নয়, পুরোপুরি রাজনৈতিক। যে রাজনীতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রপ্ত করেছিলেন পশ্চিমবাংলার মানুষের চরিত্র থেকে তার সাধারণ প্রবণতা থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন। কাজেই তার এই লুকোচুরির বিষয়টা সাধারণের কাছে পরিষ্কার।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সফলতার হার আকাশ ছোঁয়া। প্রায় ১৬ বছর রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা একের পর এক চমক দেখিয়েছেন বিভিন্ন সফলতার মধ্য দিয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি, গঙ্গার পানি চুক্তি, মায়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ, ভারতের সাথে ছিটমহল বিনিময়, আকাশে স্যাটেলাইট স্থাপন ইত্যাদি এতটাই দক্ষতার সাথে করতে পেরেছেন যার ফলে তার সমালোচকরাও নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। তিনি কয়েক বছর ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, বাংলাদেশ অন্তত তিস্তা নদীর ন্যায্য পানিটা পাচ্ছে না। কাজেই এর একটা সমাধানের পথে আসতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ কনভিঞ্চিড।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারত সফরে গেলে অন্যান্য বিষয়ের সাথে যেটা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তা হলো বাংলাদেশের নির্বাচন, ভারতের ভূমিকা ও তিস্তা চুক্তি। আনন্দ বাজার লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী নাকি মমতাকে হুমকি দিয়েছেন এই বলে যে, আওয়ামী লীগ সামনে ক্ষমতায় না আসতে পারলে ভারতকে তার দু’পাশে পাকিস্তান নিয়ে থাকতে হবে। এ ধরনের কথার কোন সত্যতা নেই বলে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান নিশ্চিত করেন। তবে তিনি সফরের অভিজ্ঞতা থেকে জানান শেখ হাসিনার শাসনামলেই তিস্তা চুক্তি হতে পারে।

বিশ্ব ব্যবস্থা পাল্টাচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটছে, সাথে সাথে পরিবর্তন হচ্ছে বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণ। চিরশত্রু দুই কোরিয়া আলোচনার টেবিলে এসেছে, ট্রাম্প কিম বৈঠকের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, চিনের সাথে ভারতের কমেছে বৈরিতা। তা ছাড়া ভারতের সাথে বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। মমতা যে কংগ্রেসের কাছে রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন তার নেতা সিদ্ধার্থ শংকর রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ কোটি আশ্রয়হীন মানুষকে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়েছেন, দিয়েছেন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, করেছেন শর্তহীন সহযোগিতা। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে ভারত মুক্তিযুদ্ধকে তরান্বিত করেছে।

অধিকন্তু দু’দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন এতটাই প্রগাঢ় যে, তার থেকে কিছুতেই মানুষ বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। শুধু তিস্তা নয়, ভারতের সাথে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক যোগাযোগ, সংস্কৃতি, শিক্ষা বিনিময়, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে এক অভিন্ন যোগাযোগের ভেতর দিয়ে দু’দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে এটা নিশ্চিত যে, মমতা হয়তো অচিরেই নিজের অবস্থান পরিবর্তন করবেন। কারণ তিনি আইনের ছাত্রী হিসেবে এটা জানেন, হিমালয় পর্বত থেকে বয়ে আসা কোন জলপ্রবাহ উজানে গতি পরিবর্তন করে ভাটির প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা অনৈতিক।

লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারপার্সন, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

এইচআর/জেআইএম

‘দু’দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন এতটাই প্রগাঢ় যে, তার থেকে কিছুতেই মানুষ বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। শুধু তিস্তা নয়, ভারতের সাথে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক যোগাযোগ, সংস্কৃতি, শিক্ষা বিনিময়, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে এক অভিন্ন যোগাযোগের ভেতর দিয়ে দু’দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।’