আমার প্রতিবাদের ভাষা গ্যের্নিকা

ইরাজ আহমেদ
ইরাজ আহমেদ ইরাজ আহমেদ
প্রকাশিত: ১০:০৩ এএম, ১৬ জুলাই ২০১৮

শিল্পবোদ্ধাদের প্রত্যেকের কাছেই পাবলো পিকাসো নিজস্ব এক অর্জন। কেউ এই অসাধারণ শিল্পীর ‘ব্লু’ পর্যায়ের জাদুকরী মায়ায় মুগ্ধ আবার কারো কাছে পিকাসো কেবলই কিউবিস্ট কাঠামোর অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই ভালোলাগা আর দৃষ্টিকোণের বাইরে রয়ে গেলো শিল্পীর আঁকা সেই গ্যের্নিকা।

গ্যের্নিকা এক মৌলিক আবেগের দলিল, মানুষের ওপর মানুষেরই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। জন্মের ৮০ বছর বয়সে পা রেখেও এই অবেগমথিত শিল্পকর্মটি তার অবেদন হারায়নি এক বিন্দুও।

গ্যের্নিকার অর্থও তো জীবনের ঘোষণা, ক্রোধ আর সমবেদনা। হতাশা আর ঘৃণার পাশাপাশি আশা আর ভালোবাসা। সেই আবেগময় চিত্রকর্মের চেতনা সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে এখনও তাই আছে বলেই ধরে নেয়া হয়।

কিন্তু গ্যের্নিকা আর তার স্রষ্টার নাম উচ্চারণের সুযোগ আজকাল সংকুচিত হয়ে আসছে।

পৃথিবীর দেশে দেশে নিঃশব্দ এক প্রক্রিয়ায় আবারো ফ্যাসিবাদের উত্থানের সূচনা ঘটলেও গোষ্ঠীগত আত্নরতিতে নিমগ্ন এই বেচাকেনার দুনিয়ার মানুষেরা নিজেদের দাসত্বের মুচলেকা ধরিয়ে দিয়েছে নতুন পৃথিবীর শাসকদের হাতে। বদলে গেছে নির্যাতনের পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রণের কৌশল, সংঘাতের ছবি। কিন্তু নির্যাতিতের মুখায়ব কি বদলেছে?

আজ এই দেশে দারিদ্র্যের সীমানায় কোনোমতে বেঁচে থাকা মানুষ, ইতিহাসের ধারাবাহিক চরিত্র কৃষক, শহরের গার্মেন্টস শিল্পে নিয়োজিত মেয়ে অথবা বেঁচে থাকার স্বাভাবিক সংস্কৃতির ধারা থেকে ছিটকে পড়া কিশোর-তারা কেউ কখনো পাবলো পিকাসোর নাম শোনেনি।

স্বয়ং পিকাসোও বেঁচে থাকতে জানতে পারেননি এই চরিত্রদের বেঁচে থাকার কৌশল। জানতে পারেননি ক্রমাগত খর্ব হতে থাকা আমাদের স্বাধীন চিন্তার অসহায় ভূমিটুকুর কথাও।

এসবের কোনোকিছু সম্পর্কে জানার সুযোগ পিকাসোর ছিলো না। কিন্তু তিনি একটি বিষয় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন শোষণের কোনো দেশ কাল নেই; দেশকালবিশেষে শোষণের পদ্ধতিটা হয়তো বদলায় কিন্তু তার বিষয়বস্তু একই থাকে। তাই মানুষ এখনো তাঁর ১১ ফুট ৬ ইঞ্চি দীর্ঘ এবং ২৬ ফুট প্রশস্ত গ্যের্নিকার সঙ্গে অনুভূতির জায়গায় একাত্নবোধ করে।

guernica_all

১৯৩৭ সালের ২৬শে এপ্রিল, স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় জাতীয়তাবাদী বাহিনীর নির্দেশে জার্মানি ও ইতালীর যুদ্ধে বিমান বাহিনী উত্তর স্পেনের বাস্ক কান্ট্রি গ্রাম গ্যের্নিকার উপর হামলা চালায়।

জঙ্গী বিমান থেকে নির্মমভাবে বোমা নিক্ষিপ্ত হয়। শত শত নির্দোষ সাধারণ মানুষ নিহত হয়। গোটা ইউরোপ জুড়ে পত্রিকার পাতায় স্পেনের এই যুদ্ধ নিয়ে শুরু হয় লেখালেখি। জেগে ওঠে প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠ।

পিকাসো সেদিনের ভয়াবহ ঘটনার ঠিক পরের দিন এই ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত হন। মানুষের ওপর মানুষেরই চালানো এই নির্মম আক্রমণ, যুদ্ধের নৃশংসতা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে এই ছবিটি আঁকার জন্য।

পিকাসোর এই শিল্পকর্মটি শান্তি আন্দোলনে ও যুদ্ধবিরোধী প্রতীক হিসেবে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে। পিকাসোর এই অসামান্য চিত্রকর্ম নিয়ে প্রশ্ন এবং ব্যাখ্যার শেষ নেই। শিল্পীর জীবদ্দশাতেই এ নিয়ে বহু প্রশ্ন তৈরি হলেও পিকাসো স্বয়ং এর বিস্তারিত কোনো বিশ্লেষণ হাজির করেননি। পিকাসো তাঁর এই চিত্রকর্ম সম্পর্কে খুব বেশি কথা বলেননি। কিন্তু তারপরেও যুগের পর যুগ গ্যের্নিকাকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।

গ্যের্নিকা বিষয়ে যত বই লেখা হয়েছে, আধুনিক যুগের অন্য কোন পেইন্টিং নিয়ে এত বিশ্লেষণী কাজ করা হয় নি। নিঃসন্দেহে এই চিত্রকর্মটি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম ।

এই খাপছাড়া শিল্পীকে নিয়ে, শিল্পে তাঁর অবদান নিয়ে পৃথিবীতে হয়তো অনেক বাকবিতণ্ডা চলতে থাকবে ভবিষ্যতেও। তর্ক-বিতর্কের পাহাড় জমা হবে। পৃথিবীর দেশে দেশে বঞ্চিত, শোষিত মানুষ সেসবের কিছুই জানতে পারবে না।

গুম হয়ে যাওয়া বাবাকে আর কোথাও খুঁজে পাবে না শিশুটি, ধর্মকে রাজনীতির নামে ব্যবহার করার পরিকল্পনার শরীর আরো পরিপুষ্ট হবে, নিজের কথা বলার স্বাধীনতা খুঁজে পাবে না মানুষ, পণ্যের দাম বেড়েই চলবে, মুনাফাবাজদের উন্নতি ঘটবে আর প্রতিবাদ করতে গেলেই মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে।

গ্যের্নিকার উত্তরাধিকার তো আসলে প্রতিবাদ। ছবি এঁকে ফ্যাসিবাদী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পাবলো পিকাসো। তৈরি করেছিলেন আন্তর্জাতিক ভ্রাতিৃত্ববোধের সোপান। তারপর তাঁর নিজের জীবন ও শিল্প আর এই ধারায় ফিরে আসার খুব একটা সুযোগ পায়নি। নারীর প্রেম আর প্রচলিত সামাজিক গণ্ডির বাইরের জীবন তাঁর শিল্পকর্মকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করেছিলো। কিন্তু গ্যের্নিকার উত্তরাধিকার যা ছিলো তাই-ই রয়ে গেছে। আমাদের নীরব প্রতিবাদ আর প্রত্যাখ্যানের ভাষাকে বিপজ্জনক বাঁকে সাহস আর শক্তি যুগিয়েছে এই চিত্রকর্মটি। পৃথিবীর বুকে গ্যের্নিকার সাফল্য হয়তো সে জায়গাটিতেই।

লেখক : সাংবাদিক, লেখক।

এইচআর/জেআইএম

‘গ্যের্নিকার উত্তরাধিকার তো আসলে প্রতিবাদ। ছবি এঁকে ফ্যাসিবাদী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পাবলো পিকাসো। তৈরি করেছিলেন আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধের সোপান।’

আপনার মতামত লিখুন :