দাবিটা শুধু নিরাপদ পথের নয়, জীবনেরও

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:০৮ এএম, ১২ আগস্ট ২০১৮

 

গুগলে ব্রায়ান চার্লস লারা লিখে র্সাচ দিলে অনেক কিছু চলে আসবে। কিন্তু তার সব কি গুজব! ধরুন লারা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে একটা জিনিস শেখাছেন। টিপস দিচ্ছেন। আবার সেই লারা সাউথ আফ্রিকার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার কথা শুনছেন খুব মনোযোগ দিয়ে।

এরকম গোটা কয়েক ছবির কোলাজ যদি এখন ইন্টারনেটের মাকড়সার জালে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মনে হতেই পারে; এই ত্রিনিদাদিয়ান বোধহয় ইমরান খানের মত রাজনীতিতে পা রাখতে যাচ্ছেন! আর সেটা বিশ্বাস করার মত লোকের অভাব হবে না। অন্তত বাংলাদেশে তো নয়। বাংলাদেশ এমন একটা সময় পার করছে এখন, যেখানে ‘ট্রুথিনেস’ এর প্রভাব জনমানসে প্রবল।

হ্যাঁ, ট্রুথিনেস। এটা সত্য নয়। কিন্তু মানুষ সত্য বলে মনে করে। বাস্তব ঘটনার সাথে মিল নেই। সম্পর্ক নেই। অথচ মানুষ সত্য হিসেবে গিলছে। তাই ফেসবুকে ব্রায়ান লারার একটা পোস্ট ট্রুথ না ট্রুথিনেস তা নিয়ে সত্যিই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়তে হয়েছে। কিন্তু অ্যাকাউন্টটা যখন ব্রায়ান লারার সার্টিফাইয়েড,তখন অবিশ্বাস করছি কী ভাবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশ ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি সিরিজ জেতার পর ব্রায়ান লারা যা লিখেছেন, তার প্রথম বাক্যে আপনার প্রাণেও উচ্ছ্বাসের ঢেউ লাগবে। এবং লাগাটা খুব স্বাভাবিক।

সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেন, বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের জন্য। উচ্ছ্বসিত হব না কেন? কিন্তু পরের গোটা কয়েক বাক্য আর শব্দ আপনাকে অনেকভাবে ভাবাবে। তবে তা মোটেও ক্রিকেটীয় ভাবনাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার বিষয় নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অভিনন্দন জানিয়েই পরের বাক্যে লারার প্রশ্ন; ‘তোমাদের রাস্তায় যা হচ্ছে তা সত্যিই বড় চিন্তার বিষয়। আমি দুঃখিত; ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য। প্রত্যেককে সর্তক হতে হবে। নিশ্চিত জীবন সবার দাবি।’

ঢাকার রাজপথে কিশোর-কিশোরীরা স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নেমেছিল, নিরাপদ পথের দাবিতে। তাদের সেই দাবি মিডিয়ার সৌজন্যে পৌঁছে গেলে ব্রায়ান লারা পর্যন্ত! মিডিয়ার কাজ তো তথ্য আর সত্যের মাঝে সংযোগ ঘটিয়ে দেয়া। কিন্তু সোস্যাল মিডিয়া আরো অনেক কিছু ম্যানুফেকচার করছে। সেখানে যে যার মত করে সত্য-অসত্য নিয়ে খেলছেন। উন্মুক্ত গণমাধ্যমের এই জমানায়, গণতন্ত্রের দুনিয়ায় ‘দ্য ইনফরমেশন গেম ইন ড্রেমোক্রেসি’ বলে একটা কথা বেশ চলছে। যেখানে মিডিয়াটাইজড সত্য বড় হয়ে উঠছে প্রকৃত সত্যের চেয়ে।

এখন রাজনৈতিক দল তথ্য নিয়ে খেলছে। প্রতিপক্ষ তথ্য নিয়ে খেলছে। রাজনীতিটাই এখন মিডিয়াটাইজড হয়ে গেছে। এর একটা সামাজিক রুপান্তরও ঘটেছে। কারণ, আমাদের বসবাস এখন ডিজিটাল জগতে ইন্টারনেটের মাকড়সার জালের মধ্যে। এই সমাজকে আগে বলা হতো ইনফরমেশন সোসাইটি। এখন বলা হচ্ছে নেটওয়ার্ক সোসাইটি। এই রুপান্তরের বাইরে থাকতে পারছেন না এখন আর কেউ। তাই বাংলাদেশের রাস্তায় কী ঘটছে, তা নিয়ে নিজের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা সোস্যাল মিডিয়ায় জানিয়ে দিলেন ব্রায়ান চার্লস লারা।

লারা। এক সাবেক ক্রিকেট কিংবদন্তী। অতি মানবীয় কিছু কীর্তি গড়ে রেখেছেন তিনি। আগামী কয়েক প্রজন্ম তাঁর সেই সব রেকর্ড ভাঙতে পারবে কী না সংশয় আছে। খেলোয়াড়ী জীবনে তিনি খুব মিডিয়া ফ্রেন্ডলি ছিলেন তা নয়। বরং বলা যায় মিডিয়ার সঙ্গে তার একটা গন্ডগোল লেগেই থাকত। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই লোকটাই প্রোফেশনালি মিডিয়াকে সামালতে শুরু করলেন। এখন অবশ্য সোস্যাল মিডিয়ায় নিজের কথাটা নিজের মত করেই বলতে পারছেন। কিন্তু সেখানেও তিনি কতটা নিরাপদ।

তাঁর কথা; অন্যভাবে ভাইরাল হচ্ছে কী না কে জানেন! তবে তাঁর নিজের পেজে লেখা কথাগুলো লারার নিজের, সেটা বিশ্বাস করতেই হচ্ছে। ঢাকার রাজপথে কি হচ্ছে? এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন তিনি হয়তো সিএনএন, আল জাজিরার পর্দায় ঢাকার রাজপথের চেহারা দেখে। ঢাকা তাঁর অচেনা শহর নয়। বহুবার এসেছেন এখানে তিনি। এবং সেটা ক্রিকেটের সৌজন্যে।

এই শহরের রাস্তা মানে ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম। দিনের পর দিন লাখ লাখ মানুষের হাজার হাজার কর্ম ঘন্টা নষ্ট হয় রাস্তার যানজটে। কিন্তু লারার উদ্বেগের বিষয়টা নিশ্চয়ই রাজপথের যানজট নয়। তাঁর উদ্বেগ, যানবাহন পথে যেভাবে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। তাই পৃথিবীর অন্য এক গোলার্ধের বাসিন্দা হয়েও ব্রায়ান লারা লিখেছেন;‘নিরাপদ জীবনের দাবি সবার।’

পোর্ট অফ স্পেন থেকে একটু দূরে মিশেল স্ট্রিটে ব্রায়ান লারার বাড়ি। যানজটের সঙ্গে সেখানে কারো কোন পরিচয় আছে বলে মনে হয়নি। এগার বছর আগে লারার বাড়ি ঘুরে সেটাই মনে হয়েছিল। এখনও যে পরিবর্তন হয়ে গেছে তা নয়। তবে লারা অনেক পাল্টে গেছেন। এক সময় যিনি বিশ্বাস করতেন, মিডিয়া সেন্সেশানালইজ করতে ভালবাসে, সেই মিডিয়ায় তিনিও এখন অনেক বাস্তবতা খুঁজে পান। যা তাঁকে প্রভাবিত করে। হ্যাঁ, করে বলেই দিন কয়েক আগে ঢাকার রাজপথের ছবি দেখে তিনি লিখতে পেরেছেন; ‘ ঢাকার রাজপথে হচ্ছে কী!’

কি হয়েছে, কেন হয়েছে সেটা তাঁরও জানা। এবং বোঝা। তাই পরের বাক্যে লিখতে পারেন, ‘নিরাপদ জীবন সবার দাবি।’ এটাকে নিশ্চয়ই কেউ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখবেন না। এটা তাঁর সামাজিক এবং মানবিক জীবনবোধের দায়বদ্ধতা থেকে লেখা। ক্রিকেট মাঠের বাইশ গজে ব্যাট হাতে রাজত্ব করেছেন তিনি দীর্ঘদিন। কত বোলারের জীবন দুঃসহ করে দিয়েছেন। অনেকের ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছেন। সেই লোকটা চান না বাংলাদেশ কেন, বিশ্বের কোন প্রান্তের কোন রাজপথে কারো প্রাণ যাক। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কেউ বাস করুক।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তিনি নন। হতেও চান না। সমাজ সংস্কারকও নন। এমন কি দার্শনিকও নন। শুধু একজন সাবেক ক্রিকেটার। যার নামটা ক্রিকেট ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা কঠিন। রাজনীতির প্রতি খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও এখনও খবরের কাগজের প্রথম পাতাটা পড়েন নাকি মনোযোগ দিয়ে। বিভিন্ন চ্যানেলের নিউজ হেড লাইন তাঁর মন কাড়ে।

বাংলাদেশের রাজপথে স্কুল পড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের নিরাপদ পথের দাবি তাঁর মন কেড়েছে। যে কারণে, নিজের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট দিয়েছেন’ ‘...... রাস্তাগুলোতে কি হচ্ছে! ’ বুঝতে পেরেছেন কিশোর-কিশোরীরা রাস্তা দখল করেছিল নিরাপদ পথের দাবিতে। তাই নিজেই লিখেছেন;‘ নিরাপদ জীবনের দাবি সবার।’

ব্রায়ান লারার এই বক্তব্যকে আবার অন্যভাবে কেউ ম্যানুফেকচার করে সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করবেন না তো! নিরাপদ পথের দাবি জানিয়ে স্কুল পড়ুয়ারা ক্লাশে ফিরে গেছেন। কিন্তু সোস্যাল মিডিয়ার এই ‘গুজব’ গেলা থেকে আমরা কী আপাতত ‘ডায়েটে’ যেতে পেরেছি!

লেখক : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস

‘ব্রায়ান লারার এই বক্তব্যকে আবার অন্যভাবে কেউ ম্যানুফেকচার করে সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করবেন না তো! নিরাপদ পথের দাবি জানিয়ে স্কুল পড়ুয়ারা ক্লাশে ফিরে গেছেন। কিন্তু সোস্যাল মিডিয়ার এই ‘গুজব’ গেলা থেকে আমরা কী আপাতত ‘ডায়েটে’ যেতে পেরেছি!’