অনেক বাউন্সার সামলাতে হবে ইমরানকে

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল
প্রকাশিত: ১০:১৫ এএম, ১৯ আগস্ট ২০১৮

 

বাইশ। এই সংখ্যাটা কেন বার বার বের হয়ে আসছে ইমরান খানের অনেক কিছুর স্ক্যান রিপোর্টে! ইমরান খান। ক্রিকেটার। তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার বলা যায় বাইশ বছরের। গত শতাব্দীর ৭১ এ শুরু। আর ৯২ এ বিশ্বকাপ জিতে শেষ। বলা যায় বাইশ গজে বাইশ বছরই তিনি পার করেছেন। বিশ্বকাপ জিতে দাঁড়ি টানলেন ক্যারিয়ারে।

ক্রিকেটার ইমরান খানের পরিচয়কে সাবেক করে দিয়ে রাজনীতির বাইশগজে তাঁর আবির্ভাব ’৯৬এ। পাক রাজনীতির স্যাঁতসেঁতে উইকেটে স্ট্যান্স নিলেন; তেহরিক-ই ইনসাফের ওপেনার হিসেবে। ধীরে ধীরে ইনিংস গড়ে তুললেন। সেখানেও উইনিং শট খেলতে সময় নিলেন বাইশ বছর!

পাকিস্তানের পার্লামেন্টে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলো তাঁর দল পিটিআই। সংসদ নেতা নির্বাচিত হলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার দেখা গেলো সেই বাইশ এসে হাজির হলো ইমরান খানের সামনে! হ্যাঁ, ৭২ বছর বয়সী পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হলেন ইমরান খান! সংখ্যাতত্ত্বে ২২ এর মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছেন ইমরান খান।

সাবেক ক্রিকেটার ইমরান। হতে চেয়েছিলেন রাজনীতিবিদ। হয়েছেন। রাজনীতিতে এসে বার বার তিনি বলেছেন; তার রাজনীতির তিন স্টাম্প হচ্ছে; গণতন্ত্র ফেরানো। শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা প্রবর্তন। এবং দুনীর্তিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা।

পাকিস্তানের বাহাত্তর বছরের ইতিহাসে ইমরান খানের এই কথাগুলোকে দূরবীণ দিয়ে খুঁজে পাননি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পাবেন সেই আশা করা যায় না। কারণ, দেশটা পাকিস্তান। ইমরান খান পারবেন, এটা ভাবা যাচ্ছে না। পারলে বলতে হবে সাবেক ক্রিকেটার কাম ইমরান খান রাজনীতিবিদ নন। তিনি হবেন পাকিস্তানের ইতিহাসে সেরা সমাজ সংস্কারক!

ভোট যদি হয় গণতন্ত্র তাহলে পাকিস্তানে ইমরান গণতন্ত্র ফেরালেন! তবে সেটা জলপাই রঙের হেলমেট পরা গণতন্ত্র। পার্লামেন্টের লিডার তিনি হলেন। তবে অন্যে দলের সমর্থনে। ক্যাপ্টেন ইমরান খান ক্রিকেট মাঠে এককভাবে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। নিয়েছেন। দলকে জিতিয়েছেন। পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ জেতার পর সংবাদ সম্মেলনে ছোট একটা বাক্য বলেছিলেন।

‘ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলায় আমি বিশ্বকাপ জিতলাম।’ এই বাক্যের এই ‘আমি’ শব্দটা কী রকম নীরব বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল সেটা অনেকে জানেন। আবার জানেন না। ইমরানের সেই পাকিস্তান দলের একাধিক ক্রিকেটারের মুখে শুনেছি; ‘আমি বিশ্বকাপ জিতলাম’ বাক্যটাকে তাঁরা ঠিক পছন্দ করতে পারেননি।

অধিনায়কের প্রতি অনুগত ছিল। কিন্তু তার কাছ থেকে ওটা এক ধরনের উপেক্ষা আর অবজ্ঞাই মনে করেছিলেন তাঁরা। যে কারণে, পরবর্তীতে ইমরানের ক্যান্সার হাসপাতালের জন্য তহবিল সংগ্রহের চ্যারিটিতে বড় তারকারা কেউ হাজির হননি। আর তাতেই ইমরানের বুঝতে বাকি ছিল না; ইংল্যান্ড সফরে তাঁর যাওয়া আর ঠিক হবে না। তিনি যেতে পারেননি। বা যাননি।

রাজনীতিতে, পার্লামেন্টে, বা ক্যাবিনেটে আমি পাক ক্যাপ্টেন সুলভ মনোভাব কিংবা বক্তব্য দিলে ধাক্কা খেতে হতে পারে। রান আউটের সম্ভাবনাও থেকে যাবে। তাছাড়া ইমরানের রাজনীতির ময়দানে আম্পায়ার কিন্তু জনগণ নন। এখানে অদৃশ্য থার্ড আম্পায়ারের মত থাকবেন যারা তাদের স্বার্থ পরিপন্থী কোন রান নিতে গেলে খান সাহেবকে রান আউট ঘোষণা করতে লাল বাটন টিপতে দ্বিধা করবেন না তারা।

রাজনীতিবিদ হিসেবে ক্ষমতার বাইরে থেকে অনেক কথা বলতে পেরেছেন ইমরান গণতন্ত্র নিয়ে। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসে গণতন্ত্রের চর্চা টেস্ট ক্রিকেটে বাইশ বলে সেঞ্চুরি করার মত অবিশ্বাস্য বিষয় হবে ইমরান খানের জন্য।

পাকিস্তানে নিরপেক্ষ শক্তিশালী স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করার চেয়ে ইমরান খানের জন্য সহজ কাজ মার্কিনিদের ক্রিকেট প্রেমে বুঁদ করে রাখা। ইমরান খান অবশ্য বহুবার বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন; পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মত বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে। যেখানে দেশের জনগণ, বিভিন্ন সংস্থা বিচার ব্যবস্থা থেকে নিরাপত্তা পায় বলে সরকারের হস্তক্ষেপকে পাত্তা দেয় না। ঠিক তাই। কিন্তু ওটা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশে।

পাকিস্তান নামক দেশটায় বিশুদ্ধ গণতন্ত্র কবে ছিল? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা সেখানে আশা করা রীতিমত স্বপ্নের মধ্যে বসবাস। বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন আর বিশ্বাসযোগ্য করার কথা রাজপথে বলা যত সহজ ক্ষমতায় গিয়ে সেই কণ্ঠ খুব নিচু হয়ে যায় এই উপদেশে। ইমরান খান আপনি ব্যতিক্রম হবেন, ভাবতে ভাল লাগে। কিন্তু বিশ্বাস করা কঠিন। সেটা আরো কঠিন মনে হয়, কারণ, আপনি পাকিস্তান নামক দেশটার প্রধানমন্ত্রী।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার কথা শ্লোগান হিসেবে ভাল। যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া আর ক্ষমতায় থাকতে আপনি চান না। সেটা রাজনীতির মাঠে পা দিয়েই বহুবার বলেছেন। বেনজির ভুট্টো, মুশাররফ, নাওয়াজ শরীফ সব সরকারের সময় খুব উচ্চকণ্ঠে আপনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। আপনি বলেছেন, সরকার যদি দুর্নীতিবাজ আর ঠকবাজে ভরা থাকে, তাহলে গণতন্ত্র, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ কোন কিছু সম্ভব নয়।

একদম সত্যি কথা। কিন্তু আপনার ক্যাবিনেটের মুখগুলো কারা, তাদের পেছনের ইতিহাস এগুলো সামনে টেনে আনার লোকের অভাব হবে না। আপনি শিল্পখাত নিয়েও অনেক পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ক্ষুদ্রচাষ শিল্পে সরকারি বিনিয়োগে জোর দেয়া উচিত এটা আপনি মনে করতেন। পারবেন সেটা করতে? করতে গেলে আপনাকে সমাজতান্ত্রিক ইমরান খান হিসেবে ছুঁড়ে ফেলতে বেশি সময় লাগবে না।

ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে লাল ফিতাজনিত সমস্যা উপড়ে ফেলতে হবে। এটা আপনার প্রচারণার অংশ ছিল। কিন্তু শিল্প খাত কেন, পাকিস্তানে আর্মি আর আমলা বাদ দিয়ে কোন খাত আছে? শিক্ষা-স্বাস্থ্য অনেক খাত নিয়ে আপনি অনেক পরিকল্পনার কথা শুনিয়েছেন।

অনেকের কাছ থেকে শুনেছেন। কিন্তু সেগুলোর চেয়ে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ আপনার জন্য সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, মৌলবাদ। এগুলোকে বোল্ড আউট করা ইমরান খানের পক্ষে সম্ভব; আপাত বিশ্বাস করার কোন কারণ দেখা যায় না। আঁতাত নাকি আলোচনার মাধ্যমে এই সব সমস্যার সমাধান , সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।

নির্বাচনে জিতে উঠেই আপনি প্রতিবেশি ভারতের সাথে সমস্যা নিয়ে একটা কথা বলেছেন; ভারত এক পা এগুলে পাকিস্তান দু’ পা এগুবে। ভাল কথা। কিন্তু শুধু পাক-ভারত সম্পর্কেও উন্নতি হলেই কী এই উপমহাদেশে শান্তির বাতাবরণ তৈরি হবে। এই উপমহাদেশে বাংলাদেশ নামক একটা ভূখণ্ডও আছে। যা এক সময় পাকিস্তান নামক প্রায় অকার্যকর একটা দেশের অংশ হয়েছিল।

অনেক রক্ত-ত্যাগ আর প্রাণের বিনিময়ে সেই দেশটা আজ স্বাধীন। তারা আজ সমৃদ্ধের পথে হাঁটছে। সমুদ্র- মহাকাশ-স্থল সব জায়গায় বাংলাদেশের গর্বের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ে। সেই দেশটার জন্ম ইতিহাস আপনি বই পড়ে, বন্ধুদের মুখে শুনে ভালভাবেই জেনেছিলেন। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার ধারণা কতোটা পাল্টেছে, তাঁর প্রমাণ রাখার একটা সুযোগ আপনার সামনে।

ক্রিকেট মাঠে বাংলাদেশকে আপনি ছোট চোখে দেখেছেন। কিন্তু রাজনীতির মাঠে দাঁড়িয়ে, ক্ষমতার অলিন্দে বসে বাংলাদেশকে ‘সেই পূর্ব পাকিস্তান’ ভাববেন না। কারণ, ৪৭ বছরের বাংলাদেশ অনেক সূচকে আপনাদের ৭২ বছরের পাকিস্তানের চেয়ে অনেকদূর এগিয়েছে।

আর হ্যাঁ, বাংলাদেশের মাটিতে এখনো আপনার পাকিস্তানের স্বাধীনতা, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী আটকে পড়া বিহারীদের পাকিস্তানে কীভাবে প্রত্যাবর্তন ঘটাবেন, সেই আলোচনা দিয়ে শুরু হতে পারে আপনার সরকারের বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ।

২২ নয়। ৪৪ নয়। ৪৭ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দেশে আটকে পড়া বিহারীরা বাংলাদেশের কাঁধে বোঝা হয়ে পড়ে আছে। আপনি কাশ্মীরিদের সমস্যা সমাধানের কথা বলতে গিয়ে বার বার বলেন তাদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে। বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারীরা প্রত্যাবর্তন না পুর্নবাসন কি চায় সেটা তাদের সাথে আলোচনা করলে বুঝতে পারবেন। মনে-প্রাণে-নিঃশ্বাসে –বিশ্বাসে যাদের পাকিস্তান, তাদের আর কতদিন বাংলাদেশে ফেলে রাখবেন আপনারা?

আটকে পড়া বিহারীদের সমস্যা বাংলাদেশের নয়। এটা বাংলাদেশের বুকে পাকিস্তানের জিইয়ে রাখা এক বড় সমস্যা। বাংলাদেশ কিন্তু এই সমস্যা নিয়ে বার বার আপিল করছে, হাউ’জ দ্যাট? পাক আম্পায়াররা আনমুভড থেকেছেন। এবার ক্রিকেটীয় শিষ্টাচারে বিশ্বাসী এক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে; আপনি একটু মুভ করুন। আলোচনা করুন। কারণ, বিষয়টা মানবিক।

ক্রিকেটার ইমরান খানকে বাংলাদেশের মানুষ খুব একটা অপছন্দ করেন না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পছন্দ করার মত একটা ক্ষেত্র অন্তত তৈরি করুন। পাকিস্তানের মিস্টার ক্রিকেটার থেকে এখন আপনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস

‘ক্রিকেটার ইমরান খানকে বাংলাদেশের মানুষ খুব একটা অপছন্দ করেন না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পছন্দ করার মত একটা ক্ষেত্র অন্তত তৈরি করুন। পাকিস্তানের মিস্টার ক্রিকেটার থেকে এখন আপনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।’

আপনার মতামত লিখুন :