ভুল মনে হলেও অন্যের কথা শুনতে হয়

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ০১:৫৮ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

 

সংসদ নির্বাচন আসছে। প্রতি পাঁচ বছর পর আসে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে সবকিছু হয় না। প্রথম যে বিষয়টি নির্বাচনের প্রধান খেলোয়াড় – অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো শুরু করে, তাহলো ঝগড়া। একের প্রতি অন্যের অবিশ্বাস চিৎকার করে প্রকাশ করতে থাকে। নির্বাচকমণ্ডলী বা ভোটারদের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাও নেই নেতাদের। ভোটাররা কিভাবে, কতটা নির্বিঘ্নে ভোট দিবে, তার ভাবনা নেই তাদের কথায়।

প্রায় প্রতিটি বড় দলের নেতাদের কথা বলার একটা নিজস্ব ভাষা এবং ভঙ্গি আছে। এমন শ্লেষ, ঘৃণা থাকে কথার ভেতর যে, তাদের কথা বলার সেই স্টাইলটা ছোট নেতা-নেত্রীদেরও উৎসাহিত করে সেভাবে শেখার। আমাদের রাজনীতিতে সংস্কৃতিটা এমন যে, এক দিকে সরকারি বয়ান তার শাসনামল ‘দারুণ চলছে’, অন্য দিকে বিবাদী স্বর: ‘কিছুই হচ্ছে না’। সত্য হয়তো দুই মেরুর মাঝামাঝি বসতি করে, কিন্তু তা দেখে কে?

এই বাজারে ভোট-চিন্তা মানেই জোট-চিন্তা। হঠাৎ করেই ড. কামাল হোসেন ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো কিছু পাকা মাথা পাঁচ বছরের কর্মহীন অবকাশ থেকে বেরিয়ে এসে ভেবে উঠতে শুরু করেছেন তারাও কিছু করতে পারেন নির্বাচনে। তারা যা বলছেন, তার সারমর্ম: ‘আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট কিছুই করতে পররেনি দশ বছরে, আমাদের হাতে ক্ষমতা দিন, আমরাই পারব দেশ ভালভাবে চালাতে’।

কথাটা কতজন বিশ্বাস করবে, সেটা গৌণ ব্যাপার, কিন্তু তারা বেশ আলোচনায় আছেন। এক দিকে নির্বাচনী পাটিগণিত আর অন্য দিকে ক্ষমতাসীন সরকারের ঠিক কাজ, ভুল কাজের বিশাল তালিকা। যারা হঠাৎ করে এসে রাষ্ট্র ক্ষমতার ভাগ চাচ্ছেন, তাদের একটা নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি আছে বলেই প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু এরা যখন জাতীয় ঐক্যের নামে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে শুধু বিএনপির সাথে ঐক্যের কথা বলে সেটি আর জাতীয় ঐক্য থাকেনা, তাদের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বিএনপির সাথে ঐক্যের প্রশ্নে এই মুরুব্বীরা জামায়াতের প্রসঙ্গ আনছেন বারবার। যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতকে ২০ দলের বাইরে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। যদিও এই দলেরই আরেক মুরুব্বী একদা বাম ও পরে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মাহমুদুর রহমান মান্না জামাতকে সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। জামায়াত ছাড়াও বেশ কিছু বিষয এই মুরুব্বীরা সামনে আনছেন না যেগুলোর সমাধান না হলে শুধু ভোট হবে, জোট হবে কিন্তু কাঙ্খিত সুশাসন আসবেনা।

বিএনপি’র সাথে ঐক্যের প্রশ্নে ১৯৭৫-এর খুনিদের তারা যেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছে, পুরস্কৃত করেছে, যেভাবে জিয়াউর রহমান পুরো শাসনকালে বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, দেশে যেভাবে পাকিস্তানপ্রীতি ও সম্প্রদায়িকতাকে সাজানো বাগান দেয়া হয়েছে সেসব প্রসঙ্গ আসবে যদি এসব ‘ভাল মানুষ’ রাজনীতিকরা সত্যি সত্যি ভাল রাজনীতি চান।

বিএনপির কাছে নিশ্চয়ই প্রশ্ন রাখবেন, কেন দুই যুদ্ধাপরাধীকে মন্ত্রী বানিয়ে তাদের বাড়িতে গাড়িতে রাষ্ট্রীয় পতাকা উড়াবার ব্যবস্থা করেছিল? প্রশ্ন করবে কেন গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে, উপ-মন্ত্রীর বাড়িতে বৈঠক করে, জঙ্গিদের দিয়ে ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল তখনকার সরকার?

কেন বিচারের নামে জজমিয়া নাটক করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের মতো এই বিচারটিকেও প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল? এই মুরুব্বীরা নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন গ্রেনেড দিয়ে শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, মঞ্জুরুল ইমামের মতো সৎ রাজনীতিকদের হত্যা করা হয়েছিল? কেন হুমায়ুন কবির বালু, মানিক সাহা, হারুনুর রশিদসহ অসংখ্য সাংবাদিককে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে খুন করা হয়েছিল? জানতে চাইবেন নিশ্চয়ই – কেন একটি ঘটনায়ও বিচারের উদ্যোগ নেয়নি তখনকার সরকার।

মুরুব্বীরা নিশ্চয়ই বিএনপি নেতাদের বলবেন, বোঝাবেন, তাদের স্বীকার করতে বাধ্য করাবেন - ‘ একুশে আগস্টের ঘটনা, তার সাথে তখনকার সরকার প্রধান ও তার মন্ত্রী-সাংসদদের আচরণ, এদেশের রাজনীতিকে চিরতরে বিভাজিত করেছে’। বাংলাদেশের নির্বাচকমণ্ডলী তথা ভোটারদের কাছে এসব খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না নিয়ে এই মুরুব্বী দল ভোটের মাঠে নামেন, তবে তা হবে রাজনীতির বৈতরণীতে ভেসে থাকার করুণ প্রয়াস। দেশ এবং দুনিয়ার নতুন বাস্তব বিচার করে পথ খোঁজার তাগিদটুকু আশা করি তারা করবেন।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ নেতাদেরও দেখছি, শাসনক্ষমতায় যত দীর্ঘ সময় তারা থাকছেন, সমাজের সঙ্গে কথোপকথনের ক্ষমতা উত্তরোত্তর হারিয়ে ফেলছেন। নানা দিক থেকে নানা মত, নানা ক্ষোভ, নানা প্রতিবাদ শোনার এবং খোলা মনে তার উত্তর খোঁজার অনিচ্ছা ও অক্ষমতা শাসকদের উত্তরোত্তর দুর্বল করে তোলে।

নিরাপদ সড়ক চাই-এর মতো সমাজ ক্রমাগত নতুন নতুন দাবি সৃষ্টি করছে, সেই সব দাবি উত্তরোত্তর জোরদার ভাবে পেশ করছে। শাসকরা দল ও প্রশাসনের পুরনো কাঠামো দিয়ে সেই দাবি মোকাবিলার চেষ্টা করেছেন। সফল কিংবা ব্যর্থতা মাপার চেয়ে জরুরি কথা হলো প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদী, প্রতিস্পর্ধী মানুষের সঙ্গে শর্তহীন, খোলামেলা আলোচনার প্রয়োজন ছিল, সুযোগ ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি।

খোলামেলা কথোপকথনের সুযোগ নিতে গেলে দলতন্ত্রের পুরনো কাঠামো ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। সমস্যা হলো এই যুগে দল সরকারকে গ্রাস করেছে, গণতন্ত্র দলতন্ত্র হয়ে যাচ্ছে। এই ছকটা দেশবাসীর চেনা, বেশি করেই চেনা। নব্বই পরবর্তী গণতন্ত্রের যাত্রা শুরুর পর থেকে দেখছি প্রশাসনিকতার অচলায়তনে বন্দী হচ্ছে দল, আবার দলের কুক্ষিগত প্রশাসন।

এই দ্বৈতসত্যই শেষ পর্যন্ত বারবার বিপর্যয় ডেকে আনছে। কিন্তু আমরা শিখছি না। তাই দল, দলের নেতারা প্রতিবাদীদের সঙ্গে কোনও সংযোগ তৈরি করতে পারেনা, সংলাপের কোনও রাস্তা খুঁজে পায় না। ভুল মনে হলেও অন্যের কথা শুনতে হয়। কিন্তু তারা পারছে না। এই না-পারার তাৎপর্য বুঝতে হলে মানসিকতায় পরিবর্তন দরকার। কিন্তু তা কতদূর?

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/এমএস

‘দ্বৈতসত্যই শেষ পর্যন্ত বারবার বিপর্যয় ডেকে আনছে। কিন্তু আমরা শিখছি না। তাই দল, দলের নেতারা প্রতিবাদীদের সঙ্গে কোনও সংযোগ তৈরি করতে পারেনা, সংলাপের কোনও রাস্তা খুঁজে পায় না। ভুল মনে হলেও অন্যের কথা শুনতে হয়। কিন্তু তারা পারছে না। এই না-পারার তাৎপর্য বুঝতে হলে মানসিকতায় পরিবর্তন দরকার।’

আপনার মতামত লিখুন :