গণতন্ত্রের চিকিৎসাও কি বিদেশে হবে!

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

দেশজ রাজনীতির রুগ্ন চেহারাটা বার বার বেরিয়ে পড়েছে। তার চিকিৎসা দরকার। সুচিকিৎসা। রাজনীতিবিদরা অসুস্থ হলেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি দেন। মন্ত্রী, এমপি, ব্যবসায়ী, তাদের পয়সা-কড়ির অভাব নেই। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবেন তাতে দোষের কী! শুধু চিকিৎসা নয়। সুচিকিৎসার জন্য তারা বিদেশে যান। সাধারণ মানুষের ধারণা তাই। স্বাস্থ্য নাগরিকের মৌলিক অধিকারের তালিকায় আছে। সুস্থ থাকার জন্য চিকিৎসা করাতে বিদেশে যাওয়ার সামর্থ্য যার আছে তিনি যেতেই পারেন।

কিন্তু চিকিৎসা নিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতিও হয়। অতীতেও হয়েছে। বর্তমানেও হচ্ছে। কারাবন্দী বিএনপি নেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী অসুস্থ। তাঁর দলের নেতারা এবং তাঁর আইনজীবীরা বারবার বলছেন বেগম জিয়ার চিকিৎসা দরকার। বেগম জিয়াকে কারা বিধি মেনে চিকিৎসা দিতে আপত্তি নেই সরকারের। সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বার বার বলা হয়েছে।

সঙ্গে বাড়তি সুবিধা হিসেবে বলা হয়েছে তিনি চাইলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সাবেক সেনা প্রধানের স্ত্রী হিসেবে বেগম জিয়া সেখানে যেতে পারেন। সেই উদারতার পরিচয় সরকার দিতে কার্পণ্য করবে না। অন্তত সেটা তারা জানিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।

দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তিনি যেতে যান না। সম্মিলিত হাসপাতালে তিনি যেতে চান না! তাঁর এবং তাঁর দলের নেতাদের পছন্দের হাসপাতাল ইউনাইটেড হাসপাতাল। সেখানেই তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা দীর্ঘ দিন ধরে। পছন্দের ডাক্তার, পছন্দের চিকিৎসক থাকতেই পারে। সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু অসুস্থ একজন মানুষ নির্দিষ্ট একটা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গোঁ ধরে বসে থাকলে মানুষের কাছে অন্যরকম একটা বার্তা যায়। সেটা যে যার মত করে ব্যাখ্যা করেন। বিএনপি নেত্রী এবং নেতারা সেই বার্তাটাই কি মানুষকে দিচ্ছেন?

চিকিৎসার জন্য নেতা-নেত্রীরা দেশের বাইরে যান। ভাল কথা। তাদের সামর্থ্য আছে তারা যাবেন। কিন্তু কারাবাস হলে তাঁকে কারা নিয়ম মেনেই চিকিৎসা নেয়ার রেওয়াজ। সেখানে সরকার তাঁর চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হলে সেই দায়টা সরকারকে নিতে হয়। তবে আসল কথা হচ্ছে নেতা-নেত্রীদের চিকিৎসা দেশ-বিদেশে হচ্ছে। আগামীতেও হয়তো হবে।

তবে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত কিছুটা হলেও এগিয়েছে। সম্প্রতি একটা আন্তর্জাতিক জরিপে সেই সূচক বেরিয়ে এসেছে। এদেশের সাধারণ মানুষ, যারা সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে যেতে পারেন না চিকিৎসার জন্য, তারা ছুটে যান প্রতিবেশী ভারতে। ভারতীয় হাই কমিশনেও লম্বা লাইন মেডিকেল ভিসার জন্য। খরচ কম। ভাল চিকিৎসা। সঙ্গে প্রতিবেশী দেশটা দেখা। খারাপ কী!

চিকিৎসার একটা জ্যামিতিক চেহারাও আছে। সুচিকিৎসা। অপচিকিৎসা। অচিকিৎসা। এই শব্দবিন্দুগুলোকে জনস্বাস্থ্যের রেখা দিয়ে যোগ করলে সেই জ্যামিতিক চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর সেই জায়গায় ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের চেহারাটা ভাল। সূচকটা ভারতের চেয়ে স্বাস্থ্যকর। একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় প্রকাশ; ভারতে অপচিকিৎসায় মৃত্যু হয় বছরে প্রায় আট লাখ আটিত্রশ হাজার মানুষের। ষোল লক্ষ মানুষ মারা যায়; কম চিকিৎসায়, মন্দ চিকিৎসায়। প্রতি বছর তেইশ লাখ লোক মারা যায় চিকিৎসা ছাড়া।

সব মিলিয়ে অপচিকিৎসা, অচিকিৎসায় ভারতে এক লাখে মারা যায় একশ বাইশ জন। চীনে মারা যায় লাখে ৪৬ জন। আর বাংলাদেশে মারা যায় সাতান্নজন। মানব উন্নয়নে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অধিকাংশ সূচকে এগিয়ে। খোদ ভারতেই আওয়াজ উঠেছে, বাংলাদেশ যদি গরীব, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা দিতে পারে, কেন ভারত পারছে না? উত্তর সে দেশের সরকার ভাল জানে।

কিন্তু জনস্বাস্থ্য থেকে দেশের স্বাস্থ্যের দিকে তাকালে খুব হতাশ হতে হয়। সাতচল্লিশ বছর বয়সী বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চেহারাটা এত রুগ্ন কেন? এই স্বাস্থ্য ঠিক রাখার দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের রাজৈনিতক দলগুলোর। রাজনীতিবিদদের। তাঁরা রাষ্ট্র আর গণতন্ত্রের চেহারাটা ঠিক রাখতে পারলেন না কেন? রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলবেন; বারবার সামরিক শাসন, বেসামরিক স্বৈরশাসনের কারণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র হৃষ্টপুষ্ট হতে পারেনি।

হয়তো তাই। কিন্তু আধা প্রতিবন্ধীর চেহারা নিয়ে আমাদের গণতন্ত্র আর কতদিন হোঁচট খেতে খেতে সামনে চলবে। তাঁর স্বাস্থ্যও ঠিক রাখা দরকার। দেশে নামী দামী ডাক্তার-ডক্টর রাজনীতিবদ আছেন। তাঁরা কেন যেন দেশের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য পুণরুদ্ধারের জন্যও বিদেশমুখী। শুধু ডাক্তার-ডক্টর-রা কেন, আপদমস্তক রাজনীতিবিদ যারা তাঁরা বিদেশীদের দিয়ে দেশের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে চান। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য বিদেশীদের প্রেসক্রিপশন চান! এটা হচ্ছে আমাদের রাজনীতিবিদদের মানসিক স্বাস্থ্যর অবনতির লক্ষণ।

কিছুদিন আগে ক্ষমতাসীন দলের প্রায় জনাবিশেক নেতা ভারত ঘুরে এসেছেন। ভোট এসেছে। তারা ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আমন্ত্রণে দিল্লি ঘুরে এসেছেন। অবশ্য একটা রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের অন্য একটা দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য সেখানে যাওয়া দোষের কিছু নয়। তাদের পরে বিএনপির তিন সদস্যের একটা প্রতিনিধি দলও ভারত ঘুরে এসেছেন। কিন্তু এক সময় ভোট এলেই এদেশে ভারত বিরোধী ওষুধটা ভালমত গেলানো যেতো এদেশের মানুষকে। তারা গিলেছেও। আর সে কারণে বাংলাদেশ সামরিক শাসকরা ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক দল গড়ে ক্ষমতায় যাওয়ার থাকার জন্য ভারত বিরোধী আওয়াজটা জোরালো গলায় তুলেছেন।

এখন অবস্থা পাল্টে গেছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য এখন বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা ভারত যান! শুধু ভারতেই থেমে নেই তাদের এই যাওয়া -আসা। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ পর্যন্ত ছোটাছুটি শুরু হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব জাতিসংঘ পর্যন্ত গেছেন নির্বাচন, গণতন্ত্র, সুশাসন এসবের চেহারা তুলে ধরতে।

বিএনপি মহাসচিবের জাতিসংঘ গমন নিয়ে গণমাধ্যমে রাজনীতিবিদদের তর্কাতর্কি আবার আমাদের রাজনীতির অসুস্থ চেহারার কথা মনে করিয়ে দেয়। আসলেই বাংলাদেশের রাজনীতির স্বাস্থ্যকর চেহারা ফেরাতে রোগ নির্ণয় জরুরি। শুধু ভোট এলেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র রুগ্ন হয়ে পড়ে তাতো নয়। বাকি সময়টা কী আমাদের রাজনীতি খুব স্বাস্থ্যকর? মোটেও না। যদি তাই হতো, তাহলে এদেশে নির্বাচন নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বানকালীন সরকার, সহায়ক সরকার, এতো সরকার ব্যবস্থার কথা শুনতে হতো না।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই একটা সরকার আরেকটা সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। এটাই নিয়ম। এটা রীতি। কিন্তু বাংলাদেশের গত দশটা সাধারণ নির্বচানের মধ্যে কখনোই কি একটা নির্বাচিত সরকার নতুনভাবে নির্বাচিত আরেকটা সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পেরেছন? পারেনি। কারণ, আমাদের রুগ্ন গণতন্ত্র যেন নির্বাচনের আগে এবং পরের সরকারের হাতের ভার বহন করতেই সক্ষম না!

এই গণতন্ত্রের চিকিৎসা প্রয়োজন। সেই চিকিৎসা করাবেন কারা? রাজনীতিবিদরা নিজেদের চিকিৎসা করাতে বিদেশ যান। গণতন্ত্রের চিকিৎসাও কি তাঁরা বিদেশীদের দিয়ে করাতে চান? সেরকম চিন্তা আসলে দেশের রাজনীতিবিদদের চিন্তার বৈকল্য আর রাজনীতির রুগ্ন চেহারার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্যকিছু নয়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস

‘এই গণতন্ত্রের চিকিৎসা প্রয়োজন। সেই চিকিৎসা করাবেন কারা? রাজনীতিবিদরা নিজেদের চিকিৎসা করাতে বিদেশ যান। গণতন্ত্রের চিকিৎসাও কী তাঁরা বিদেশীদের দিয়ে করাতে চান? সেরকম চিন্তা আসলে দেশের রাজনীতিবিদদের চিন্তার বৈকল্য আর রাজনীতির রুগ্ন চেহারার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু নয়।’