কলঙ্ক মোচনের রায়

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় সম্পাদকীয়
প্রকাশিত: ১০:০৭ এএম, ১১ অক্টোবর ২০১৮

দীর্ঘ ১৪ বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় হলো। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবনের আদেশ দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায়ে কলঙ্কমোচনের পথে এগিয়ে গেল দেশ। এ ধরনের ভয়াবহ ন্যক্কারজনক হামলার সর্বোচ্চ শাস্তিই ছিল প্রত্যাশিত।

গতকাল বুধবার (১০ অক্টোবর) সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে অবস্থিত ঢাকার ১নং অস্থায়ী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন এ রায় ঘোষণা করেন। এদিন সকালে কারাগার থেকে ৩১ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আলোচিত এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন দলের তিন শতাধিক নেতাকর্মী।

ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)।

সেদিনের সেই বর্বরতা বর্ণনারও অতীত। উপুর্যপরি শক্তিশালী গ্রেনেড হামলার ফলে রক্তের স্রোত বইয়ে যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের রাজপথে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন অনেকে। গ্রেনেডের আঘাতে নিহত-আহতদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে এক নারকীয় দৃশ্যের অবতারণা করে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে তার দেহরক্ষী প্রাণ হারান। আহত ব্যক্তিদের অনেকে এখনো শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে অত্যন্ত কষ্টকর জীবন যাপন করছেন।

বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার জনসভায় এ রকম পৈশাচিক হামলার দায় নেওয়াতো দূরের কথা সরকারি দলের অনেক নেতা-নেত্রী হামলার জন্য উল্টো আওয়ামী লীগকেই দোষারোপ করেছিলেন। শুধু তাই নয় জোট সরকার পুলিশের তদন্তপ্রক্রিয়াও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছিল। তদন্তের নামে `জজ মিয়া প্রহসন`-এর সৃষ্টি করেছিল এবং আড়াল করেছিল প্রকৃত অপরাধীদের।

ওয়ান-ইলেভেনের পর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এসে সিআইডি গ্রেনেড হামলার প্রকৃত অর্থে তদন্ত শুরু করে এবং ২০০৮ সালে জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ও তার ভাইসহ ২২ জনকে আসামি করে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তাতে হামলার জন্য মূলত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ বা হুজিকে দায়ী করা হয়। তবে এই হামলার পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান, রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ জোট সরকারের অনেকেই যে জড়িত ছিলেন মামলার রায়ে ষ্পষ্ট হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার অপরাধীদের রক্ষায় যে তোড়জোড় শুরু করে তা সভ্য সমাজে চিন্তাও করা যায় না। গ্রেনেড হামলার মূল কুশীলবদের আড়াল করতে তারা তথাকথিত জজ মিয়া নাটকেরও অবতারণা করে। এটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বেশকিছু নিরপরাধ লোককে গ্রেনেড হামলার আসামি বানিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। দেশের ইতিহাসের অন্যতম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হওয়া সত্ত্বেও জোট সরকারের কারসাজির কারণে দীর্ঘ সাত বছর এর বিচার থেমে থাকে।

অবশেষে রায় এলো। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলার কথা চিন্তাও করা যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণেও বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘রাজনীতি মানে কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? এই রাজনীতি এ দেশের জনগণ চায় না। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে, তাই বলে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হবে? রাজনীতিতে এমন ধারা চালু থাকলে মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে। গতকাল বুধবার দুপুরে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিশেষ আদালত-৫–এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন এই মন্তব্য করেছেন।

রায় এলেও আরো বেশকিছু ধাপ পাড়ি দিয়ে তবেই আসামিদের সাজা কার্যকর করা যাবে। অনেকেই দেশের বাইরে পলাতক আছেন। তাদের ফিরিয়ে এনে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। এ জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ধরনের হত্যাযঞ্জের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই দেখতে চায় দেশের মানুষ। সেটা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল।

এইচআর/আরআইপি

‘রায় এলেও আরো বেশকিছু ধাপ পাড়ি দিয়ে তবেই আসামিদের সাজা কার্যকর করা যাবে। অনেকেই দেশের বাইরে পলাতক আছেন। তাদের ফিরিয়ে এনে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। এ জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ধরনের হত্যাযঞ্জের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই দেখতে চায় দেশের মানুষ। সেটা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল। ’

আপনার মতামত লিখুন :