নিশ্চিত হোক শিশুর অধিকার

ফারহানা মোবিন
ফারহানা মোবিন ফারহানা মোবিন , লেখক এবং চিকিৎসক
প্রকাশিত: ১০:১৪ এএম, ৩০ নভেম্বর ২০১৮

 

প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকারের প্রথম শর্ত তার মায়ের দুধ। এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ১ আগস্ট পালন করা হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস। প্রতিটি সন্তানের জন্য মায়ের দুধ নিশ্চিত করা এবং মায়েদের স্বাস্থ্যের উন্নতিই এই দিনটির তাৎপর্য। সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো মা ও শিশু উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যকর। অথচ এখনও অনেক মা তাঁর শিশুকে ঠিকভাবে দুধ পান করাতে পারছেন না। ফলে মা ও শিশু উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এভাবে বঞ্চিত মা ও শিশুরা হয়ে পড়ছে দুর্বল। নিরক্ষরতা, অজ্ঞতা ও দারিদ্রের কারণে শিশুরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর মর্মাহত মায়েরা নীরবে ফেলছেন চোখের পানি। আবার অনেকে বিরক্তি ও অজ্ঞতার কারণে শিশুকে খাওয়ানোর অভ্যাসটা রপ্ত করতে পারছেন না। অথচ শিশুর জন্মের পরে মায়ের দুধ সবচেয়ে পুষ্টিকর খাবার। প্রিয় পাঠক, আজ আমরা উপলব্ধি করব এমন কয়েকজন মা ও শিশুর পরিস্থিতি।

দৃশ্যপট :১
নগরীর জিগাতলার রিয়া (ছদ্মনাম), একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। পাঁচ মাসের ছোট্ট ‘হাসান’কে বুয়ার কাছে রেখে অফিসে যান। আলাপচারিতায় বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে বাচ্চাটাকে দুধ খাইয়ে অফিসে যাই। অফিস শেষে বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যায়। প্রায় ১০ ঘণ্টা তাকে আমি কাছে পাই না। এ দীর্ঘ সময় তাকে কৌটার দুধ খাওয়ানো হয়। কৌটার দুধ বাচ্চাটা ঠিকমতো হজম করতে পারে না।

আর দুধ কোনো পাত্রে রেখে আসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি শারীরিক ভাবে দুর্বল। বাচ্চার ছয় মাস হয়নি বলে অন্য খাবার দেওয়া হচ্ছে না। আমার বাচ্চাটা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সংসারের অর্থনৈতিক দিকটা চিন্তা করে অন্য কোথাও চাকরির কথা ভাবতেও পারি না। খুব অল্প বয়সে তিনটা সন্তানের মা হয়েছি। কোনো বাচ্চাই দুধ ঠিকমতো পায়নি। নিজের আর সন্তানদের ভগ্নস্বাস্থ্য দেখা ছাড়া আমার কিছুই করার নেই। নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়।’

দৃশ্যপট : ২
বিসিএস ক্যাডার চিকিৎসক মনিকা আসমির কাঠগড়ায় নিজেকে দণ্ডায়মান করে বলেন, ‘আমার ধারণা সন্তানের রাতকানা রোগের জন্য আমিই দায়ী। বিসিএসের প্রথম পোস্টিং ছিল আমাদের গ্রামের বাড়ির কাছে। তখন আমার সন্তানের বয়স এক মাস। তাকে সঙ্গে নিয়ে চাকরি করার মতো পরিবেশ ছিল না। দুই বছর আমাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে। আমার সন্তান বলতে গেলে বুকের দুধ খেতেই পায়নি। কৌটার দুধ খেয়ে বড় হয়েছে।

যৌথ পরিবারের কাজের চাপ আর বিবাহিত জীবনের ব্যস্ততা নিয়ে অনেক কষ্টে বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। তাই চাকরি ছাড়ার কথা আমি ভাবতেই পারিনি। আমার উচিত ছিল সন্তানকে সঙ্গে রেখে চাকরি করা। কিন্তু পরিবারের অমতে আমি সন্তানকে নিতে পারিনি। প্রকৃতি আমাকে উপহার দিয়েছে সুন্দর এক সন্তান আর মা হয়ে আমি তাকে উপহার দিয়েছি চোখের রোগ!’

দৃশ্যপট : ৩
নগরীর রায়েরবাজারের শাক ব্যবসায়ী সাজেদা বেগম বলেন, ‘আমার নয়ডা পুলাপান। ছেলে লিবো হ্যার ল্যাগি ছয়ডা মাইয়ার পর তিনডা পুলা হইছে। কিন্তু আফা হ্যাগো তো বুকের দুধ খাওয়াইতে পারি না। নিজেরাই খাইতে পাইনি তো দুধ হইবো ক্যামনে! ছোডো পুলাডারে সাগু ভিজাইয়া পানি দিয়া খাওন দিই। বুকের দুধ হ্যার ভাগ্যি (ভাগ্য) নায়। আমার পুলাডা সাদা হয়া গ্যাছে। হ্যার রক্ত কমতাছে। আমি শুধুই কান্দি গো, শুধুই কান্দি’।

দৃশ্যপট : ৪
কথা হলো রায়েরবাজার শাখার শিকদার মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্রী ও সচেতন মা রোদেলা (ছদ্মনাম) সঙ্গে। কলেজ ক্যাম্পাসের ফ্ল্যাটের একটি রুমে বুয়া আর পাঁচ বছরের মেয়ে জয়ীকে নিয়ে তাঁর ছাত্রীজীবন। তিনি বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই মেয়েকে আমার সঙ্গে রেখেছি। মেডিকেলের কঠিন পাঠ্যসূচি সত্ত্বেও সন্তানকে আমি দূরে রাখিনি। মেয়েকে কাছের একটি স্কুলে ভর্তি করিয়েছি। বেবিতে পড়ে। ছোট্ট মেয়েটা মাঝে মধ্যে খুব দুষ্টুমি করে। অনেক যুদ্ধ করে পড়ালেখা করছি। মেয়েকে বুকের দুধ আর আমার স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত করতে চাইনি। তাই মেয়ের জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছি’।

দৃশ্যপট : ৫
নগরীর স্কয়ার হাসপাতালের স্ত্রী ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগের বহ্নি ও শারমিন বিথী মেডিকেল কর্মকর্তা চিকিৎসক কর্মরত ছিলেন। সন্তান জন্মের পরে দক্ষ জনবলের অভাবে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। অথচ একই বিভাগের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. আফরোজ, ডা. জুয়েলী, ডা. মলি, ডা. নাজিয়া, ডা. জিনাত, ডা. আদিবা, ডা. রুবাইয়া পরিবারের সহযোগিতায় দক্ষতার সাথে কাজ করে চলেছেন। পরিবারের ও হাসপাতালের সহযোগিতার জন্য এই কঠিন কাজটি সম্ভব হচ্ছে।

দৃশ্যপট : ৬
আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তা তানজিলা হোসেন ইমনের ছেলে সদীপ্তকে তিনি বড় করেছেনে বুকের দুধ আর মায়া-মমতা দিয়ে। কাজের প্রতি অনুগত এই নারী বলেন, ‘আমার পরিবার বিশেষত আমার মায়ের সহযোগিতায় এটা সম্ভব হয়েছিল। কর্মজীবী মায়েদের সন্তান ছোট থাকলে কষ্ট হবেই। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় মনোবল আর সবার সহযোগিতা। ’

তানজিলা হোসেনের মতো অনেক মা আছেন যাঁরা দৃঢ় মনোবলের সঙ্গে ঘর-সংসার, কর্মজগৎ আর সন্তান সামলাচ্ছেন। কিন্তু, এমন মায়ের সংখ্যা এখনো কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) জরিপমতে, দেশে এখন পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খায় প্রতি ১০ শিশুর মাত্র চারজন। (তথ্যসূত্র : প্রথম আলো, ২৬ জুলাই ২০০৭, ২০ পৃষ্ঠা)

‘প্রতি ১০ শিশুতে মাত্র চারজন’ - এই সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অনেক কম। এ পরিসংখ্যানের মতে, দেশের অধিকাংশ মা ও শিশু বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অধিকার থেকে। মায়ের দুধ যেমন সন্তানের অধিকার, তেমনি সন্তানকে দুধ দেওয়া মায়েরও অধিকার। উভয়েই এই অধিকার পাচ্ছে না। অথচ মায়ের দুধে রয়েছে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান।

শিশুর জন্মের পরই মায়ের প্রথম দুধকে বলে কলোস্ট্রাম বা শালদুধ। শালদুধ প্রতিটি শিশুর জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর। এখনো অনেক মা শালদুধ সম্পর্কে অজ্ঞ। পরিণতিতে রোগশোকে মা ও শিশু দুর্বল জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠছে। শিশুরা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, বিভিন্ন জটির রোগের জীবাণু দেহে বয়ে বেড়াচ্ছে এবং এসব জীবাণু আশপাশের মানুষকে আক্রান্ত করছে। মায়ের দুধ কৌটার দুধের চেয়ে নয় গুন বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ। তাই প্রতিটি মায়ের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার।

এ বিষয়ে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক ডা. রওশন আরা খানম বলেন, ‘চাকরি করেও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো সম্ভব। যেকোনো পরিষ্কার পাত্রে বুকের দুধ রাখলে তা আট থেকে ১০ ঘণ্টা ভালো থাকে। কর্মজীবী মায়েরা এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন। প্রতিটি শিশুকে দুই বছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত আর ছয় মাস থেকে ওয়েনিং করাতে হবে (ওয়েনিং মানে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্য কোনো খাবার দেওয়া যেমন- চটকানো সবজি, ফল, নরম খিচুড়ি ইত্যাদি)।

এক বছর বয়স থেকে বুকের দুধের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কমিয়ে ওয়েনিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য মায়ের অতিরিক্ত প্রায় ৪৫০ ক্যালরি প্রয়োজন। এই ক্যালরির জন্য প্রচুর শাকসবচি, মৌসুমি ফল আর প্রতিদিনি এক গ্লাস দুধ খাওয়া দরকার। দুধ খাওয়ালে মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে এবং গর্ভনিরোধক হিসেবেও তা কাজ করে।’ বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি মায়ের সুস্বাস্থ্য আর শিশুর জন্য বুকের দুধ নিশ্চিতে আমাদের করণীয়-

১. সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত তৃণমূল থেকে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত।
২. প্রচারমাধ্যমগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
৩. মায়ের দুধের গুরুত্ব ও পদ্ধতি সম্পর্কে শৈশব থেকেই সবাইকে সচেতন করা উচিত। এ জন্য পাঠ্যসূচিতে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য।
৪. বাল্যবিবাহ ও অধিক সন্তানের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অতীব জরুরি।
৫. ‘কম সন্তান নিতে হবে (সর্বোচ্চ দুটি) এবং সন্তানদের শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে’ - এই মূল্যবোধ সবার মধ্যে গড়ে তোলা।
৬. মা ও শিশুর প্রতি পরিবারের সবার মানবিক দৃষ্টি দেওয়া উচিত।
৭. মেয়াদোত্তীর্ণ দুধের কৌটা ও শিশুদের ব্যবহার্য জিনিজপত্রের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার।

মায়ের দুধের প্রতি বিন্দু বিন্দু ভালোবাসা শিশুকে করে বিকশিত। মূলধন হিসেবে যা শিশুর রক্তে জমা হয় সারা জীবনের জন্য। আজকের হামাগুড়ি দেওয়া শিশুই জাতির মেরুদণ্ড, আগামী দিনের আলো। পুষ্টিহীনতায় আমরা কোনো মা ও শিশুকে হারাতে চাই না। প্রতিটি মা ও শিশুর মুখের হাসি হোক আগামী সূর্যোদয়ের মতো উজ্জ্বল। আর প্রতিটি শিশুই এগিয়ে যাক জাতির সাফল্যের পতাকা নিয়ে।

এইচআর/এমএস

‘মায়ের দুধের প্রতি বিন্দু বিন্দু ভালোবাসা শিশুকে করে বিকশিত। মূলধন হিসেবে যা শিশুর রক্তে জমা হয় সারা জীবনের জন্য। আজকের হামাগুড়ি দেওয়া শিশুই জাতির মেরুদণ্ড, আগামী দিনের আলো। পুষ্টিহীনতায় আমরা কোনো মা ও শিশুকে হারাতে চাই না। প্রতিটি মা ও শিশুর মুখের হাসি হোক আগামী সূর্যোদয়ের মতো উজ্জ্বল। আর প্রতিটি শিশুই এগিয়ে যাক জাতির সাফল্যের পতাকা নিয়ে।’

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]