প্রত্যাশা শুধু এক দলের কাছে কেন?

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ০১:৩৪ পিএম, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮

ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হতে যাচ্ছে এবারের নির্বাচন। সেখানে ভিন্ন মতটাকেও গুরুত্ব দেয়া জরুরি। এবং এই দেয়াটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। গণতন্ত্রের পথে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হলে বিভিন্ন দিক থেকে আসা মতটাকে সঙ্গী করেই চলতে হবে। কিন্তু গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক আচরণ, শিষ্টাচার, সৌজন্য সবকিছু শুধু একটা দলের কাছেই প্রত্যাশিত হবে কেন!

যুক্তির খাতিরে অনেকে বলেন; যারা ক্ষমতায় থাকেন, তাদের কাছে অনেক বেশি সহিষ্ণু হতে হয়। অনেক বেশি উদার হতে হয়। অনেক বেশি গণতান্ত্রিক আচরণ জনগণ তাদের কাছে আশা করে। হ্যাঁ, সেটাই হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশে কী শুধু একটা দলই ক্ষমতায় আছে! বা ছিল! সে কারণে শুধু তাদেরই গণতান্ত্রিক মাপকাঠিতে মাপতে হবে!

মাপা যেতেই পারে। কারণ, সেই দলটা বহু-আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক দেশটার আবির্ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে। দেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি থাকবে এটা অস্বাভাবিক কী! শুধু মুক্তিযুদ্ধ কেন, তারা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম-লড়াইয়েও নেতৃত্ব দিয়েছে। গণতন্ত্র রক্ষার দায়টা তাদের বেশি। কিন্তু দায়টা এককভাবে শুধুই তাদের এটা বলা খুব একটা ন্যায়সঙ্গত কী?

ইতিহাসের পথ ধরে খুব একটা পেছন দিকে যাওয়ার দরকার নেই। গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা শুরু যদি হয় নব্বই দশকের গোড়ায়, তখন থেকে আরো কিছু দল সরকার পরিচালনা করছে। দেশের শাসন ভার তাদের হাতে ছিল। দেশ কী সে সময় গণতন্ত্রের শিখরে অবস্থান করছিল?

গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রায় বছর দুয়েক পার হতে না হতেই এদেশে গোটা দুয়েক উপ-নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনের সময় একজন বিচারপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তিনি গণতন্ত্রকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারুন বা না পারুন একটা কাজ করেছিলেন। যা এদেশের মানুষ অনেক দিন মনে রেখেছেন। আগামীতেও রাখবেন। মাগুরা নামক একটা ছোট জেলাকে রাতারাতি ‘বিখ্যাত’ করে দিয়েছিলেন। একটি উপ-নির্বাচন কতোট অভিঘাত ফেলতে পারে জনমনে তা বোঝা যায় যে কোন নির্বাচন এলেই।

মানুষের সামনে উদাহরণ হিসেবে চলে আসে মাগুরা উপ-নির্বাচন! শুধু মাগুরা নয়। মিরপুর, তেজগাঁও এর উপ-নির্বাচনও মানুষ দেখেছিল। কিন্তু সেই নির্বাচনগুলোকে কার্পেটের নিচে আগুন চাপা দেয়ার মত অনেকে চেপে রেখে নির্বাচনী গণতন্ত্রের কথা বলেন! অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলেন! বলতেই পারেন। অন্যকে বলতে দেয়াও গণতন্ত্রের অংশ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমে বড় খবর; ‘গায়েবী মামলা’! টেলিভিশনের টক শো-তে এই মামলার কথা শুনতে শুনতে অনেকে ক্লান্ত। গায়েবী মামলা হয়েছে। সেটাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু নির্বাচনের আগে এ ধরনের মামলা কী এই প্রথম?

দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটের আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তার কী কোন হিসাব ছিল! গণপ্রেপ্তার হচ্ছে-এই কথাটা বলার লোকও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরশাদ সাহেবের সময় কী হয়েছিল সেটা লিখে শব্দ খরচ করার কোন অর্থ হয় না।

এসব নির্বাচনের আগের কথা। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অনেকে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ করেছিলেন। সেই অপারেশনে কত মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন! তখন তো খবরের কাগজ খুললেই মনে হতো বিশ্বের সব হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে বাংলাদেশে আনার প্রয়োজন আছে। কারণ, এতো লোক হৃদরোগী মারা যাচ্ছেন কেন! সেই সময়েও একটা সরকার ছিল দেশে। যারা তত্ত্বাবাধয়ক নামক আরেকটা সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়েছিলেন। সেই সরকারের কাছে কী এদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যাশিত ছিল না।

ভিন্নমতের মানুষের আশ্রয়স্থল হবে জেলখানায় এটাই কী প্রত্যাশিত ছিল সেই সরকারের কাছে? নিশ্চয়ই না। এখন গায়েবী মামলা নিয়ে অনেক লেখা হচ্ছে। অনেক কথা হচ্ছে। কিন্তু সেই সময় ভিন্ন রাজনীতিতে বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যেভাবে প্লেট চুরির মামলা দেয়া হয়েছিল, রাসেল স্কোয়ারে যেভাবে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের লাঠি-পেটা করা হয়েছিল সেটা কোন গণতন্ত্রের অংশ ছিল! এখনও পুলিশ অনেক জায়গায় অতি উৎসাহী হয়ে অনেক কিছু করছেন। কিন্তু সেদিন পুলিশ বাহিনীর মাথায় যে কোহিনূর বসিয়ে দেয়া হয়েছিল, এখনও তারই কিছু দ্যুতি হয়তো দেখা যাচ্ছে!

সেটাও কাম্য নয়। হতে পারে না। পুলিশকে মনে রাখা উচিত; তারা জনগণের জন্য। জনগণকে শত্রু ভাবার জন্য রাষ্ট্র-সরকার তাদের বেতন দেয় না। পুলিশ অতি উৎসাহী হয়ে সরকারি দলের প্রতীকে ভোট চাইতে পারেন না। কিন্তু গণমাধ্যমের খবর কেউ কেউ সেটা করছেন। এরা সরকারকে বির্তকিত করার জন্যই কাজটা করছেন কী সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা তাদের উদ্দেশ্য কী না সেই প্রশ্নও উঠেছে।

ভিন্ন দিক থেকে ভিন্ন মতের কথা আসবে। ক্ষমতাসীনদের সেটা শুনতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের রীতি। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন পথ পেরিয়ে এসে কয়েকটা গণমাধ্যমের খবর; অনেকগুলো দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কিন্তু প্রচার-প্রচারণায় এক দল! বিষয়টা উদ্বেগের। বিষয়টা ভাবনার খোরাক জোগায়।

অন্যদল, বিশেষ করে; ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে যারা নির্বাচন করছেন তাদের প্রচার-প্রচারণা তেমন দেখা যাচ্ছে না। এটাই অনেকের কাছে কৌতূহলের বিষয়। উদ্বেগের বিষয়। দুঃশ্চিন্তার কারণও বটে। ভোটের আগে মাঠে-ঘাটে কেন থাকবে না প্রধান বিরোধী জোটের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা!

উত্তরটা কিন্তু বিএনপি মহাসচিবের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত একটা বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেছেন;‘আপনারা একটা দিন আমাদের দেন। ত্রিশ ডিসেম্বর। সেই দিন আপনারা ভোট কেন্দ্রে যান। ভোট দিন। ভোট কেন্দ্র পাহারা দিন।’ কর্মীদের তো তিনি তার আগে মাঠে চাইছেন না! তাহলে প্রচার-প্রচারণাটা একপাক্ষিক হয়ে যাওয়া কী স্বাভাবিক নয়?

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস

‘ভিন্ন দিক থেকে ভিন্ন মতের কথা আসবে। ক্ষমতাসীনদের সেটা শুনতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের রীতি। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন পথ পেরিয়ে এসে কয়েকটা গণমাধ্যমের খবর; অনেকগুলো দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কিন্তু প্রচার-প্রচারণায় একদল! বিষয়টা উদ্বেগের। বিষয়টা ভাবনার খোরাক জোগায়।’