সিল পড়ুক উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উপর

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১১:০৯ এএম, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮

 

গণতন্ত্র মানে কী এক দিনের ভোট উৎসব! উন্নত গণতন্ত্রের দেশে এই প্রশ্নটাই অর্থহীন। কিন্তু আমাদের মত পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সী দেশে গণতন্ত্র এখনও তার শৈশব পেরুতে পারেনি। আবার নির্বাচনের গাণিতিক হিসেবে ৪৭ বছরের বাংলাদেশ দেখেছে দশটা সংসদীয় নির্বাচন।

তবে এই সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় এই দেশ পরিচালিত হয়েছে সাতাশ বছরের মত। তাই একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সংখ্যাতত্ত্বে বিশ্লেষণ করলে মনে হবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র শুধু সামনের দিকে এগিয়ে চলেনি। বরং রীতিমত দৌঁড়েছে! তা নাহলে এতোগুলো সংসদ নির্বাচন হলো কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর বুঝিয়ে দেয় আমাদের দেশের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য খুব একটা ভাল ছিল না। তারও বড় কারণ, সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ছিল না। সেই বিবেচনায় নবম এবং দশম দুটো নির্বাচন অনেক ঝড়- ঝঞ্ঝা পেরিয়ে গণতন্ত্রকে সামনের দিকে কিছুটা হলেও এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। যদিও দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেকে অনেক প্রশ্ন তোলেন।

হ্যাঁ, সব রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ হয়তো ছিল না। অনেক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবুতো সংসদীয় পদ্ধতিটা অব্যাহত রয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রাথমিক বিজয়।

তবে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় বলে কিছু নেই। প্রতিদিনের চর্চার মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্রের উৎকর্ষ সাধিত হয়। তাই উৎসব মুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেই গণতন্ত্রের বিজয় হলো সেটা ভাবার কোন কারণ নেই। গণতন্ত্রের প্রাথমিক ধাপ অবশ্যই জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ।

কিন্তু পরবর্তীতে সেই গণতন্ত্রকে আরো সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব শুধুই সরকার, বিরোধী দল বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে অন্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা কী সেই দায়িত্ব পালন করছেন? কিংবা অতীতে করেছেন?

উত্তরটা হ্যাঁবোধক হলে ভাল হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে যারা যখন ছিলেন, তারা সেটাকে সঠিকভাবে পরিচালনার ইচ্ছা এবং যোগ্যতা দেখাতে পেরেছেন?

বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ বলে পরিচিত যারা, ভদ্র ভাষায় কেউ কেউ যাদের সুশীল সমাজ বলেন, তারাও কাগুজে বিবৃতি আর টেলিভিশনে সাধারণ মানুষকে কিছু কঠিন কঠিন শব্দের মধ্যে দিয়ে সরকারের সমালোচনা ছাড়া অন্য কিছু করেছেন। বা করার দক্ষতা ও যোগ্যতা কি দেখিয়েছেন?

হয়তো বলবেন, সেই সুযোগ তারা পাননি? কিন্তু কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, এই দেশে অস্বাভাবিক সরকারের সামনে নিজেদের 'মুরব্বী' হিসেবে উপস্থিত করেছেন। এই দেশের বহু গণমাধ্যমেও সেই মুরব্বীয়ানা তারা দেখিয়েছেন। এখনও সুযোগ পেলে দেখান।

আবার আরেক শ্রেণি ভোট-গণতন্ত্র এই সব নিয়ে এক ধরনের সচেতন উদাসীনতা দেখান! ভাবখানা এমন, এসব নিয়ে ভাবার কোন মানে হয় না! তবে তারা আবার ভাবার সুযোগ পেলে সাধারণ মানুষ নয়, বরং নিজেদের কথাই বেশি ভাবেন!

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উন্নতি সব কিছু তারা মেপে দেখতে চান উন্নত বিশ্বের মাপকাঠিতে! তারা ভুলে যান বাংলাদেশ নামক দেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল সেই সব উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ।

আজ বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের অনেকে খানিকটা ঈর্ষান্বিত। কারণ, এদেশের মানুষের দৃঢ়চেতা মানসিকতা, মেধা, শ্রম আর দক্ষতায় আগামীর পথে যেভাবে তারা এগিয়ে নিচ্ছে দেশটাকে, উন্নত গণতান্ত্রিক অনেক এদেশের এগিয়ে চলার গতির তুলনায় সেটা বেশি।

তবে একটা দেশের এগিয়ে চলার পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বড় একটা ভূমিকা রাখে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়ার ক্ষেত্রে জনগণ, রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং অংশীজনের ভূমিকা থাকে। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দেশকে এগিয়ে নেয়া একটা সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে।

গত দশ বছরে সেরকম অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উদাহরণ এদেশের মানুষের সামনে আছে। একটা পদ্মাসেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংক ঋণ দেয়া থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পর সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না থাকলে পুরো প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ে থাকত। কিন্তু সেই সেতু এখন শুধু দৃশ্যমান নয়।

পদ্মা সেতু শুধু একটা স্বপ্ন ছিল না, এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বটে। তাই নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু বাস্তবায়নের দুঃসাহস দেখানো সম্ভব হয়েছে। বাঙালি এই দুঃসাহস দেখাতে পারে। কারণ, তার পেছনে আছে তার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। একাত্তরের চেতনা।

সেদিন, পাকিস্তানের মত একটা সামরিক শক্তিকে বাংলার সাধারণ মানুষ পরাজিত করেছিল নিজেদের অদম্য ইচ্ছা, দুঃসাহস আর একটা স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের স্বপ্নকে সঙ্গী করে। সেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় আজ এক বিশেষ দিন। যেদিন নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ শুধু উন্নয়নশীল দেশের সরণি দিয়ে চলবে না। সেই চলার পথে 'অ্যারো মার্ক' দেয়া স্টিকারে লেখা থাকবে 'উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ'!

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস

‘সেদিন, পাকিস্তানের মত একটা সামরিক শক্তিকে বাংলার সাধারণ মানুষ পরাজিত করেছিল নিজেদের অদম্য ইচ্ছা, দুঃসাহস আর একটা স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের স্বপ্নকে সঙ্গী করে। সেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় আজ এক বিশেষ দিন।’